পরের দিন থেকেই শুরু হয় শহর দেখা। সিএন টাওয়ার থেকে পুরো টরন্টো শহরটিকে একনজরে দেখার অভিজ্ঞতা ছিল অসাধারণ। আধুনিক ভবন আর সবুজের মিশ্রণে শহরটি খুবই সুশৃঙ্খল ও সুন্দর।
পরের দিন আমরা গেলাম ইউনিভার্সিটি অব টরেন্টোতে। চারপাশের সবুজ গাছপালা, খোলা মাঠ আর সবুজ ঘাসে বসে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা করতে দেখা সত্যিই দারুণ লাগছিল। এমন পরিবেশে পড়াশোনা করাও নিশ্চয়ই আনন্দের! পরে জানলাম, এটি বিশ্বের সবচেয়ে টেকসই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি।
টরন্টোর পর আমাদের যাত্রা মন্ট্রিয়লে। শহরটিতে পৌঁছেই মনে হয়েছিল, যেন কানাডার ভেতরে ছোট্ট এক ইউরোপে চলে এসেছি! পুরনো ধাঁচের ভবন, পাথরের রাস্তা আর শরতের হালকা ঠাণ্ডা আবহ পুরো শহরটিকে অন্য রকম সৌন্দর্য এনে দিয়েছিল। আমরা প্রথমে ওল্ড পোর্ট মন্ট্রিয়ল ঘুরে দেখি। এরপর নটর ডেম ব্যাসিলিকা চার্চের নীলাভ কারুকার্যশোভিত অভ্যন্তর দেখে মুগ্ধ হলাম। পরে বায়োডোমে গিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন বায়োম এক জায়গায় দেখার অভিজ্ঞতা ছিল ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণীয় অংশ। কোথাও পেঙ্গুইন, কোথাও রেইনফরেস্ট, আবার কোথাও অচেনা প্রাণী ও রঙিন পাখি—সবকিছুই অবিশ্বাস্য লাগছিল। শহরজুড়ে শরতের কমলা-হলুদ পাতাগুলো পুরো পরিবেশ আরো মনোরম করে তুলল। আমরা জার্ডিন বোটানিক ও মন্ট্রিয়ল ললিতকলা জাদুঘরও ঘুরে দেখি। সবচেয়ে মজার বিষয় ছিল এখানকার ফরাসি ভাষার ব্যবহার। সামান্য ফরাসি জানি বলে বিভিন্ন জায়গায় ‘বনজার’ কিংবা ‘মার্সি’ বলার ছোট ছোট মুহূর্তগুলোও বিশেষ হয়ে রয়ে গিয়েছিল।
টরন্টো থেকে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য অটোয়ায় যাই। সেখানে পার্লামেন্ট অব কানাডা দেখি। এরপর কেমব্রিজে কয়েকটি দিন কাটে একেবারে পারিবারিক পরিবেশে। শহর বা দর্শনীয় স্থানের চেয়ে এখানে সময়টা ছিল অনেক বেশি নিরিবিলি। শান্ত দুপুর, পার্কে হাঁটা আর পরিবারের সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলো পুরো যাত্রার ব্যস্ততার মধ্যে এক ধরনের প্রশান্তি এনে দিয়েছিল।
এরপর নায়াগ্রা জলপ্রপাত। সেখানে প্রতিটি মুহূর্তই ছিল অনন্য। বিশাল জলপ্রপাতের গর্জন, আকাশের দিকে উঠে যাওয়া কুয়াশা আর নীলচে পানির প্রবাহ একসঙ্গে এমন এক অনুভূতি তৈরি করেছিল, যা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। মনে হলো, প্রকৃতির শক্তিকে খুব কাছ থেকে অনুভব করতে পারছি! পরের দিন আমরা ঝরনার ওপর রংধনু দেখতে পাই। কুয়াশার ভেতর দিয়ে আলো ভেঙে রঙের এক অপূর্ব দৃশ্য তৈরি হয়েছিল। রাতের বেলা আলোকসজ্জায় পুরো জলপ্রপাত যেন সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছিল, আর আলো-ছায়ার সেই খেলা পুরো পরিবেশ আরো স্বপ্নিল করে তুলেছিল। এরপর জলপ্রপাতের পেছন দিকে গিয়ে পানির ঠিক পেছন থেকে সেই বিশাল প্রবাহ দেখা ছিল একেবারেই ভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতা।
নায়াগ্রা থেকে আমরা যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করি। দীর্ঘ ১০ ঘণ্টার বাসযাত্রা শেষে পৌঁছি ফিলাডেলফিয়ায়। সেখানে আমিশ কান্ট্রি দেখার সুযোগ হয়, যেখানে আধুনিক জীবনের বাইরে একেবারে সহজ, ধীর আর প্রকৃতির কাছাকাছি এক জীবনধারা দেখা যায়। যেদিকে তাকাই, সেদিকেই শুধু নীল আকাশ আর বিস্তীর্ণ সবুজ মাঠ।
এরপর নিউইয়র্কে। শহরটিকে আগে দেখলেও এবারের অভিজ্ঞতা ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। জানা ছিল, পুরো সময় বৃষ্টি হবে। বৃষ্টি যেন শহরটিকে আরো স্বপ্নিল করে তুলেছিল।
টাইমস স্কয়ারের বৃষ্টিভেজা রাস্তায় নিয়ন আলোর প্রতিফলন এক অবাস্তব সুন্দর দৃশ্য তৈরি করেছিল। সামিট ওয়ান ভ্যান্ডারবিল্টের ৯১তম তলায় গিয়ে একনজরে শহরটাকে দেখলাম। কাচের গায়ে বৃষ্টির ফোঁটার মধ্য দিয়ে আকাশচুম্বী ভবনগুলো—যেন কোনো সিনেমার দৃশ্য দেখছিলাম। এরপর আধুনিক শিল্পকলা জাদুঘরে গিয়ে ‘দ্য স্টেরি নাইট’-এর সামনে দাঁড়িয়ে মনে হয়েছিল, বাস্তব আর কল্পনার দূরত্ব যেন একমুহূর্তে মুছে গেছে। ছবিটি বাস্তবে দেখার অনুভূতি ছিল অনেক বেশি গভীর ও আবেগপূর্ণ।
শেষ দিনে নিউইয়র্ক ছাড়ার সময় মনে হলো, যেন শহরটি নীরবে বিদায় জানাচ্ছে, আর প্রতিটি আলো, প্রতিটি রাস্তা ধীরে ধীরে স্মৃতিতে পরিণত হচ্ছে। টরন্টোর শান্ত সূর্যাস্ত, মন্ট্রিয়লের ইউরোপীয় আবহ, নায়াগ্রার গর্জন, কেমব্রিজের নিরিবিলি সময় আর নিউইয়র্কের বৃষ্টিভেজা আলো—সব মিলিয়ে এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা ছিল এই ভ্রমণ।