সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১১:২২ পূর্বাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

শিশু ধর্ষণ, হত্যা ও নির্যাতনের শেষ কোথায়

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: রবিবার, ২৪ মে, ২০২৬
  • ২৬ বার পড়া হয়েছে
বহুল আলোচিত মাগুরায় আট বছরের এক শিশু ধর্ষণের ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই সম্প্রতি ঢাকার পল্লবীতে সাত বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনা প্রত্যক্ষ করল দেশবাসী। এ ঘটনার প্রতিবাদে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ সারা দেশ ফুঁসে উঠেছে।

শুধু মাগুরা কিংবা পল্লবীর ঘটনাই নয়, বরং সারা দেশে আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে চলছে শিশু ধর্ষণ, ধর্ষণ-পরবর্তী হত্যা ও নির্যাতন। শিশু ধর্ষণ, হত্যা ও নির্যাতন বেড়ে যাওয়ার ঘটনায় সচেতন দেশবাসী ও অভিভাবকমহল আজ রীতিমতো উদ্বিগ্ন। স্কুল, মাদরাসা, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, বাসে-লঞ্চে, পথে-ঘাটে, মাঠে আজ কোথাও আজ যেন শিশুরা নিরাপদ নয়। যেন কোথাও তাদের সুনিশ্চিত নিরাপত্তা নেই।
এই অবস্থা নিঃসন্দেহে একটি জাতির জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক। পাশাপাশি তা ওই জাতির জন্য অশনিসংকেত। আশঙ্কাজনক হারে শিশু ধর্ষণ, নির্যাতন ও হত্যার ঘটনার কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হচ্ছে। বলা বাহুল্য, কোনো সমাজে ধর্ষণ বিস্তৃত হলে এবং ধর্ষকদের কঠোর সাজার ব্যবস্থা করা না হলে সেই সমাজে নীতি-নৈতিকতা ও মূল্যবোধ বলে কিছুই থাকে না।
এ ধরনের ঘটনা পুরো সমাজ, দেশ ও জাতিকে বিশৃঙ্খলা ও পাপাচারের দিকে ধাবিত করে, যা কখনোই ভালো কোনো বিষয় হতে পারে না। এমতাবস্থায় শিশু ধর্ষণ, নির্যাতন ও হত্যা বন্ধে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতে এই অবস্থা আরো ভয়ানক পর্যায়ে গিয়ে ঠেকবে। 

বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে দেশে অন্তত ছয় হাজার ৩০৫ জন নারী-শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে তিন হাজার ৪৭১ জন ১৮ শিশু ধর্ষণ, হত্যা ও নির্যাতনের শেষ কোথায়বছরের কম বয়সী শিশু রয়েছে। আর গত বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত দেশে ধর্ষণের শিকার হয়েছে কমপক্ষে ১০৭ জন, যাদের মধ্যে ৬৬ জন ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু রয়েছে।

এ সময় ২২৪ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানা যায়, দেশে প্রতিবছর এক হাজারেরও বেশি নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন নামক বেসরকারি সংস্থা কর্তৃক সম্প্রতি প্রকাশিত এক রিপোর্টে বলা হয়, শিশুরা প্রতিবেশী, উত্ত্যক্তকারী, বন্ধু, আত্মীয়-স্বজন, শিক্ষক বা অপরিচিত ব্যক্তির দ্বারা ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। এসব তথ্য ও পরিসংখ্যান থেকে এটি স্পষ্ট যে আমরা যেন কোনোভাবেই শিশু ধর্ষণের লাগাম টেনে ধরতে পারছি না। দ্রুত এই অবস্থার ইতিবাচক পরিবর্তন না ঘটালে বিভিন্ন সভা–সেমিনার আর বক্তৃতায় ‘আজকের শিশুরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ’, ‘আজকের শিশুরাই আগামীতে জাতির কর্ণধার’, ‘ভবিষ্যতে আজকের শিশুরাই দেশ-জাতির নেতৃত্ব দেবে’—এমন সব কথাবার্তা বাস্তবিক অর্থে অপপ্রলাপে পরিণত হবে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, শিশু ধর্ষণ, হত্যা ও নির্যাতন যেকোনো মূল্যে বন্ধ করা এখন জরুরি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশে প্রতিনিয়ত শিশু হত্যা, শিশু নির্যাতন এবং শিশু অপহরণের মতো বেদনাদায়ক ও জঘন্য ঘটনা ঘটলেও যেন কারো টনক নড়ছে না। পাশাপাশি এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত অপরাধীরা রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় কিংবা পেশিশক্তির জোরে অনেক সময় পার পেয়ে যাচ্ছে। অনেক সময় দেখা যায়, অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছে। এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন সামাজিক অবক্ষয়ের পরিচয় পাওয়া যায়, তেমনি সমাজব্যবস্থার ব্যর্থতা প্রকাশ পায়। শিশু হত্যা, শিশু নির্যাতন এবং শিশু অপহরণের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে না পারলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি যে আরো ভয়াবহ হবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। 

শিশু ধর্ষণ তথা ধর্ষণের কারণগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—১. ধর্ষণকারীদের মধ্যে বিন্দুমাত্র অপরাধবোধ না থাকার কারণে নির্দ্বিধায় ধর্ষণ করতে উদ্যোগী হচ্ছে। ২. যে সমাজে আইনের শাসন নেই কিংবা থাকলেও তা দুর্বল বা ভঙ্গুর, সেই সমাজের লোকেরা ধর্ষণ উপযোগী পরিবেশ পায় এবং ধর্ষণ করে। সুতরাং সামাজিক প্রতিরোধ ও আইনের শাসনের অভাব ধর্ষণের জন্য দায়ী। ৩. পর্নোগ্রাফি, সেসব দেখে অনেক পুরুষ ধর্ষণে উৎসাহিত হয়। ৪. মেয়েদের ওপর আধিপত্য বিস্তার ও ভয়ভীতি দেখিয়ে নিয়ন্ত্রণ করার মানসিকতাও ধর্ষণের অন্যতম কারণ। ৫. ক্ষমতাশালী ব্যক্তি সুযোগ পেয়ে কোনো দুর্বল মেয়ে, শিশু বা ছেলের ওপর ক্ষমতার প্রয়োগ ঘটায় ধর্ষণের মাধ্যমে। এ ছাড়া বর্তমানে ইন্টারনেটসহ নানা ধরনের তথ্য-প্রযুক্তির অবাধ ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়াসহ পারিপার্শ্বিক আরো অনেক কারণে ধর্ষণ হতে পারে। তবে যেভাবেই ধর্ষণ, হত্যা ও নির্যাতন হোক না কেন, তা গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০-এর ৯ ধারা মোতাবেক ধর্ষণের অপরাধের যেসব শাস্তির বিধান রয়েছে তা হচ্ছে, ধর্ষণের ফলে কোনো নারী বা শিশুর মৃত্যু হলে ধর্ষণকারীর জন্য রয়েছে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড এবং এর অতিরিক্ত কমপক্ষে এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড। একাধিক ব্যক্তি দলবদ্ধভাবে কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করলে ধর্ষণকালে বা ধর্ষণের পর যদি তার মৃত্যু ঘটে, তবে ওই দলের সবার জন্যই এই শাস্তি প্রযোজ্য হবে। ধর্ষণের চেষ্টা করলে ধর্ষণকারীর সর্বোচ্চ ১০ বছর ও সর্বনিম্ন পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং এর অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেরও বিধান রয়েছে। কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করে মৃত্যু ঘটানো বা আহত করার চেষ্টা করলে ধর্ষণকারী যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবে এবং এর অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হবে।

তবে শিশু ধর্ষণ বা নির্যাতন বা হত্যা বিষয়ে মামলা করে বিচার পাওয়ার চেয়ে সমাজে যেন এ ধরনের ঘটনা কোনোভাবেই না ঘটে সে ব্যবস্থা করা অধিকতর মঙ্গলজনক। কারণ Prevention is batter than cure। ধর্ষণের হাত থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে আমাদের দর্শন ও নৈতিকতার উন্নয়ন করতে হবে, আমাদের মনের অশুভ চিন্তা বা দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করতে হবে। বর্তমান বাস্তবতায় সমাজে ধর্ষণের বিরুদ্ধে সম্মিলিত কণ্ঠে প্রতিবাদ হওয়াটা খুবই জরুরি। ধর্ষকরা অনেক সময় শাস্তি পায় না বলেই পরবর্তীকালে তারা আবারও বীরদর্পে ধর্ষণ করে। আর তাদের দেখে অন্যরাও ধর্ষণ করতে উৎসাহিত হয়। এভাবে চলতে থাকলে এই সমাজ, দেশ ও জাতি কলুষিত হবে। দেশ পরিণত হবে মগের মুল্লুকে। তাই ধর্ষণ রোধে প্রতিটি পরিবার থেকে প্রতিটি শিশুকে ছোটবেলা থেকেই নৈতিক শিক্ষা প্রদান করা প্রয়োজন, যেন বড় হয়ে সে কোনোভাবেই এই পথে পা না বাড়ায়। পরিবারই শিশুর আচরণ, মূল্যবোধ, নৈতিকতা ইত্যাদির ভিত্তি তৈরি করে দেয়। সর্বোপরি ধর্ষণ প্রতিরোধে সরকারসহ বিভিন্ন সরকারি–বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, সুধীসমাজসহ সবার একযোগে এগিয়ে আসা প্রয়োজন। প্রয়োজন ধর্ষণকে যেকোনো মূল্যে প্রতিহত করা। দেশ ও জাতির উন্নয়ন, অগ্রগতি ঘটানোসহ সামাজিক শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার স্বার্থে এবং একটি সুখী, সুন্দর ও সাফল্যময় দেশ গঠনে ধর্ষণকে কঠোর হস্তে দমন করা এখন অপরিহার্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

লেখক : অধ্যাপক, আইন বিভাগ

ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com