ইসলামি বর্ষপঞ্জির দ্বাদশ ও শেষ মাস জিলহজ মুসলিম উম্মাহর জন্য এক অনন্য মহিমাময় সময়। এটি শুধু হজ ও কোরবানির মাসই নয়; বরং ঈমান, আত্মত্যাগ, তাকওয়া, আনুগত্য, ভ্রাতৃত্ব, তাওবা ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের মহাসুযোগের মাস। এ মাসে সংঘটিত হয়েছে মানব ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আত্মত্যাগের ঘটনা, হজরত ইবরাহিম (আ.) ও হজরত ইসমাইল (আ.)-এর অবিস্মরণীয় কোরবানির পরীক্ষা। জিলহজ আমাদের শিক্ষা দেয়- আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের প্রিয় বস্তু, স্বার্থ, অহংকার ও নফসের কোপ্রবৃত্তিকে বিসর্জন দেওয়ার নামই প্রকৃত কোরবানি।
হারাম মাস হিসেবে জিলহজের মর্যাদা : পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন : নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে মাসসমূহের সংখ্যা বারোৃ তন্মধ্যে চারটি সম্মানিত (হারাম) মাস। (সুরা আত-তাওবা : ৩৬)। এই চার হারাম মাসের অন্যতম হলো জিলহজ। হারাম মাসে অন্যায়, জুলুম, যুদ্ধ-বিগ্রহ ও পাপাচার থেকে বিরত থাকার নির্দেশ রয়েছে। ইসলামের পূর্ব যুগেও এ মাস সম্মানিত ছিল; ইসলাম এসে এর মর্যাদা আরও সুদৃঢ় করেছে।
জিলহজের প্রথম দশক : বছরের শ্রেষ্ঠ দিনসমূহ : জিলহজের প্রথম দশ দিনকে ইসলামে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন : শপথ ফজরের, এবং শপথ দশ রাতের। (সুরা আল-ফজর : ১-২)। মুফাসসিরগণের বড় অংশের মতে, এখানে ‘দশ রাত’ বলতে জিলহজের প্রথম দশককে বোঝানো হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন : আল্লাহর কাছে জিলহজের প্রথম দশ দিনের আমলের চেয়ে অধিক প্রিয় অন্য কোনো দিনের আমল নেই। সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, আল্লাহর পথে জিহাদও নয়? তিনি বললেন, জিহাদও নয়; তবে সে ব্যক্তি ছাড়া, যে জান-মাল নিয়ে বের হয়ে কিছুই নিয়ে ফেরেনি। (সহিহ বুখারি : ৯৬৯)। এ হাদিস প্রমাণ করে, এ সময়ের ইবাদত নামাজ, রোজা, জিকির, সদকা, কোরআন তেলাওয়াত ইত্যাদি অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ।
হজ ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের অন্যতম : জিলহজের সবচেয়ে বড় ইবাদত হলো হজ। আল্লাহ বলেন:মানুষের উপর আল্লাহর জন্য এ ঘরের (কাবা) হজ করা ফরজ, যে সেখানে পৌঁছার সামর্থ্য রাখে। (সুরা আলে ইমরান : ৯৭)। হজ শুধু সফর নয়; এটি আত্মশুদ্ধি, সমতা, ধৈর্য, ত্যাগ ও উম্মাহর ঐক্যের প্রতীক। বিশ্বের নানা প্রান্তের মুসলমান এক পোশাকে, এক কিবলায়, এক রবের ডাকে সাড়া দেন।রাসুল (সা.) বলেন:যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হজ করল এবং অশ্লীলতা ও পাপ থেকে বেঁচে থাকল, সে নবজাত শিশুর মতো নিষ্পাপ হয়ে ফিরে আসে। (সহিহ বুখারি : ১৫২১; সহিহ মুসলিম)।
কোরবানি : শুধু পশু জবাই নয়, তাকওয়ার পরীক্ষা : কোরবানির মূল শিক্ষা হলো আল্লাহর আনুগত্য। কোরআনে বলা হয়েছে : আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না তাদের গোশত ও রক্ত; বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া। (সুরা আল-হজ : ৩৭)। অর্থাৎ কোরবানির আসল উদ্দেশ্য লোকদেখানো নয়; বরং অন্তরের খালেস নিয়ত। হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর স্বপ্নে প্রাপ্ত নির্দেশ ও পুত্র ইসমাইল (আ.)-এর আত্মসমর্পণ মুসলিম জীবনের জন্য চিরন্তন দৃষ্টান্ত। (সুরা আস-সাফফাত : ১০২-১০৭)।
আরাফার দিন : ক্ষমা ও মুক্তির দিন। ৯ জিলহজ, অর্থাৎ ইয়াওমে আরাফা, হজের প্রাণ। রাসুল (সা.) বলেন : হজ হলো আরাফা। (সুনান তিরমিজি : ৮৮৯; আবু দাউদ)। আর যারা হজে নেই, তাদের জন্য আরাফার রোজা বিশেষ ফজিলতপূর্ণ: আমি আল্লাহর কাছে আশা করি, আরাফার দিনের রোজা বিগত এক বছর ও আগামী এক বছরের গুনাহ মাফের কারণ হবে। (সহিহ মুসলিম : ১১৬২)।
তাকবিরে তাশরিক : ঈমানের ধ্বনি। ৯ জিলহজ ফজর থেকে ১৩ জিলহজ আসর পর্যন্ত প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর তাকবিরে তাশরিক পড়া ওয়াজিব। ‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল হামদ’।এ তাকবির মুসলিমের অন্তরে আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্বকে জাগ্রত করে।
কোরবানিদাতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন : তোমাদের কেউ যখন জিলহজের চাঁদ দেখে এবং কোরবানি করার ইচ্ছা করে, তখন সে যেন চুল ও নখ কাটা থেকে বিরত থাকে। (সহিহ মুসলিম : ১৯৭৭)। এ আমল আত্মসংযম ও ইবাদতের প্রস্তুতির প্রতীক।
জিলহজে করণীয় আমল : ১. পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ও নফল ইবাদত বৃদ্ধি। ২. প্রথম ৯ দিন (বিশেষত আরাফা) রোজা রাখা
৩. বেশি বেশি তাসবিহ, তাহলিল, তাহমিদ ও তাকবির। রাসুল (সা.) বলেন: এই দিনগুলোতে তোমরা বেশি বেশি ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’, ‘আল্লাহু আকবার’ ও ‘আলহামদুলিল্লাহ’ পড়ো। (মুসনাদ আহমদ)। ৪. সদকা ও দরিদ্রদের সহযোগিতা। ৫. কোরআন তেলাওয়াত ও তাওবা। ৬. সামর্থ্যবানদের হজ ও কোরবানি।
সামাজিক ও মানবিক শিক্ষা : জিলহজ আমাদের শেখায়, আত্মকেন্দ্রিকতা নয়, আত্মত্যাগ। ভোগ নয়, সংযম। বিভেদ নয়, ভ্রাতৃত্ব। অহংকার নয়, আনুগত্য। কুরবানির গোশত আত্মীয়, প্রতিবেশী ও দরিদ্রদের মাঝে বণ্টনের মাধ্যমে সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠিত হয়।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে জিলহজের বার্তা : আজকের বিশ্বে ভোগবাদ,আত্মকেন্দ্রিকতা, বৈষম্য ও নৈতিক অবক্ষয়ের বিপরীতে জিলহজ মুসলিম উম্মাহকে নতুনভাবে আত্মশুদ্ধির আহ্বান জানায়। প্রকৃত কোরবানি শুধু পশুতে সীমাবদ্ধ নয়; হারাম আয়, অন্যায়, হিংসা, অহংকার ও গুনাহ পরিত্যাগও কোরবানি।
পরিশেষে বলতে চাই, জিলহজ মুসলিম জীবনের জন্য নবজাগরণের মাস। এ মাসে হজ আমাদের ঐক্য শেখায়, আর কোরবানি শেখায় তাকওয়া ও আত্মত্যাগ। তাই আসুন, আমরা জিলহজের প্রথম দশককে ইবাদত, তাওবা, জিকির, সদকা, কোরবানি ও মানবকল্যাণে কাজে লাগাই। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে জিলহজের প্রকৃত শিক্ষা গ্রহণ, হজের মর্যাদা উপলব্ধি, কোরবানির আত্মত্যাগ বাস্তবায়ন এবং তাকওয়াপূর্ণ জীবন গঠনের তাওফিক দান করুন। আমিন।