নজরুল সেই সময়ে নানা পত্রপত্রিকায় লিখতেন, নিজে সম্পদনা করতেন। পত্রিকাগুলো স্বাভাবিকভাবেই কিছুদিন পর পর বন্ধ হয়ে যেত। তবু নজরুল থামেননি। নজরুল একসময় ভেবেছিলেন, লেখালেখির চেয়ে রাজনীতিটা আরো গুরুত্বপূর্ণ। তিনি নির্বাচনে দাঁড়ালেন, স্বাভাবিকভাবেই পরাজিত হলেন। যাঁদের নির্বাচনী খরচ দেওয়ার কথা ছিল, তাঁরা কেউ কথা রাখলেন না, একমাত্র চিকিৎসক বিধান রায় ছাড়া। প্রবল অসুস্থতা নিয়ে তিনি ফিরে আসেন; এবং দেখা যায়, নজরুল জীবনে বেশ কয়েকবার অসুস্থ হয়েছেন বড় ধরনের অসুস্থ হওয়ার আগে। কিন্তু তাঁর ঝাঁকড়া চুল অসুস্থতা মানেনি। তিনি লিখেই গেছেন কবিতা, উপন্যাস, নাটক, চলচ্চিত্রে অভিনয়, চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনা, এমনকি তখনকার বিখ্যাত নাটকগুলোর জন্য গান রচনাও করেছেন। এসবের কোনোটাই তিনি বাদ রাখেননি। আবার দেখা যায়, কোনো রাজনৈতিক সম্মেলনে তিনি স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে ফিল্ড মার্শাল নাম ধারণ করে সামরিক পোশাক পরছেন। হাবিলদার কাজী নজরুল ইসলাম থেকে কাজী নজরুল ইসলামে রূপান্তরিতও হন। তাঁর অফুরন্ত প্রাণশক্তি এবং যেকোনো বৈঠক তিনি মাতিয়ে তুলতে পারতেন। একটা পর্যায়ে সংগীত তাঁর জীবিকা হয়ে দাঁড়ায়। গ্রামোফোন কম্পানিগুলো তাঁর গানের জন্য উন্মুখ হয়ে থাকত।
নজরুল তাঁর এই ঝাঁকড়া চুল নিয়ে ভারতবর্ষের দারিদ্র্যপীড়িত, লাঞ্ছিত মানুষের জীবনকে তাঁর আয়ত্তের মধ্যে নিয়ে আসেন। ধর্মীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধেও তাঁর কলম ছিল সব সময় সোচ্চার। বেশ একটু অবাক হতে হয়, যখন তিনি তাঁর কাব্যে ও সংগীতে প্রবলভাবে বিদ্রোহের অগ্নস্ফুিলিঙ্গ ছড়াচ্ছিলেন, তার পাশাপাশি তিনি আবার প্রেমের গানেও একই রকম শক্তি নিয়ে দিনের পর দিন কাজ করে যাচ্ছেন। কী করে সম্ভব? তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সঙ্গে পবিত্র ধর্মগ্রন্থগুলো, মিথ ও পুরাণ যুক্ত হয়েছে। নজরুল এত সময় কোথায় পেলেন? এটি একটি বড় প্রশ্ন। এত সংক্ষিপ্ত সৃজনশীল সময় যাঁর জীবনে, তিনি কী করে সম্ভব করলেন অনেক অসম্ভবকে! তাঁর সৃজনশীলতা ও মানবপ্রেম বহু মানুষকে আকর্ষণ করেছে, তার মধ্যে আছেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন ও নেতাজি সুভাষচন্দ্রসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী। আবার হিন্দু-মুসলিম মিশ্র সমাজের মধ্যে তিনি নানা আক্রমণেরও সম্মুখীন হয়েছেন, তার জবাব দিতেও তিনি কুণ্ঠা বোধ করেননি। ১৯২৯ সালে কলকাতার আলবার্ট হলে তাঁকে যে সংবধর্না দেওয়া হয়, সেই সময়ে মুসলিম সমাজে ছিল প্রবল মতবিরোধ। সেই অনুষ্ঠানে হাজির হয়েছিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। তিনি বলেছেন, আমাদের কোনো রণসংগীত ছিল না, নজরুল আমাদের রণসংগীত দিয়েছেন। আমাদের কারাগারের কোনো গান ছিল না, তিনি আমাদের কারাগারের গান দিয়েছেন। আমরা যখন রণাঙ্গনে থাকব, তখন তাঁর গান গাইতে গাইতে যুদ্ধ করব। আমরা যখন কারাগারে থাকব, বন্দিরা নজরুলের গান গাইতে গাইতে বিদ্রোহ করবে। নজরুল ইন্টারন্যাশনাল গানের বাংলা করেছিলেন, ‘জাগো সর্বহারা অনশন বন্দী’ সেটি তখন কমিউনিস্ট পার্টির বিভিন্ন সভা-সমাবেশে গাওয়া হতো। তিনি করাচিতে যুদ্ধাবস্থায়ই রাশিয়ায় বিপ্লবের খবর পেলেন। একটি শ্রমিক শ্রেণির রাষ্ট্র নির্মিত হতে যাচ্ছে, যেটি ছিল তাঁর প্রথম কৌতূহলের বিষয়। এটা আমাদের জন্য আশীর্বাদ যে ওই সময়টাতে নজরুল জন্ম নেওয়ার ফলে আমরা গণসংগীত নামে এক ধরনের সংগীতের উদ্ভব দেখতে পাই, যা ভারতবর্ষের মানুষের জন্য এক অনন্য অবদান। তাঁর অসুস্থ হওয়ার সময়ই ভারতীয় গণনাট্য সংঘ প্রতিষ্ঠা হয়। ভারতীয় গণনাট্য সংঘে সংগীত আয়োজনে তাঁর ভূমিকা অসাধারণ শুধু নয়, অনুসরণের দিক থেকেও তিনি তখন অনন্য।
নজরুলের প্রতিভার সূচনা হয়েছিল লেটো গানের দলে গিয়েই। তাই লোকগানের দল থেকে তিনি উচ্চাঙ্গসংগীত শেখেন। তাঁর গানে রাগসংগীতের প্রভাব সর্বব্যাপী। তিনি নিজেও ২০টি রাগ নির্মাণ করেন। উচ্চাঙ্গসংগীত শেখা এবং তাকে আত্মস্থ করার সময় তিনি কখন পেলেন? দু-চারজন ওস্তাদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতার কথা জানা যায়। কিন্তু উচ্চাঙ্গসংগীতকে আত্মস্থ করতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন। গানের ওস্তাদরা দীর্ঘ সময় ব্যয় করেই একটা জায়গায় উপস্থিত হয়েছেন। কিন্তু নজরুলের জীবনে সেই সময়টা ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত। এই সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে তিনি শুধু যে রাগসংগীত রচনা করেছেন তা নয়, তার যথার্থ প্রয়োগে বাংলা গানে একটা নতুন ধারা প্রবর্তিত হয়েছে। তিনি জীবনে বাঙালির কুৎসাপ্রিয়তার নির্মম বলি। নজরুল যখন অসুস্থ হন, তখন তাঁর সম্পর্কে নানা গুজব ছড়িয়ে পড়ে; যদিও অবশেষে তা মিথ্যা প্রমাণিত হয়। তাঁকে নিয়ে যে মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হয়, তাদের ভুল সিদ্ধান্তের কারণে অসুখের সঠিক চিকিৎসা হলো না। কিন্তু তাঁর এক ভক্ত যখন তাঁকে অস্ট্রিয়া ও লন্ডনে নিয়ে যান, তখন কলকাতার চিকিৎসকদের চিকিৎসা ভুল প্রমাণিত হয়। তাঁর মৃত্যুর পর সঠিক রোগ নির্ণয় করা হয়।
নজরুলের সঠিক চিকিৎসার কোনো উপায় তখনো বের হয়নি। বিষয়টি আমাদের জন্য বড় ধরনের দুর্ভাগ্য। নজরুলের মৃত্যুর পরও তাঁর সঠিক মূল্যায়ন হয়নি। বহুদিন পর্যন্ত তাঁর গান আধুনিক বাংলা গান বলে প্রচলিত ছিল। ১৯৬৬ সালে মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায় আকাশবাণীতে দাবি তোলেন, নজরুলের গানকে নজরুলগীতি বলতে হবে। তাঁর দাবি মানার পরই নজরুলগীতি বাংলা গানে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিতভাবে রূপান্তরিত হয়। দুই বাংলায়ই চর্চা ও গবেষণার ক্ষেত্রে নজরুল এখনো অবহেলিত। বাংলাদেশে তিনি জাতীয় কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেলেও তাঁকে নিয়ে যে গবেষণা বা চর্চা হওয়া উচিত ছিল, তা হয়নি; বরং জন্ম ও মৃত্যুর দিনগুলোতে তিনি শুধু সরকারি আনুষ্ঠানিকতায় স্থান পেয়েছেন। অনেক সময় দেখা গেছে, সরকারি আনুষ্ঠানিকতা চর্চাকে সীমাবদ্ধ করে দেয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অন্তত তা-ই হয়েছে। পশ্চিম বাংলায় নজরুলচর্চা আরো সংকুচিত। কিন্তু মানুষ নজরুল, শিল্পী নজরুল, প্রাতিষ্ঠানিকতার বেড়াজাল ভাঙা নজরুল তাঁর পরিচয় কবি শামসুর রাহমানের কবিতায় অসাধারণ এক অভিধা সৃষ্টি করেছে। তাই ‘স্বাধীনতা তুমি কাজী নজরুল ঝাঁকড়া চুলের বাবরি দোলানো’। মানুষের কাছে তাই তিনি চিরকালের চিরবিদ্রোহী।