মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০৬:০৩ পূর্বাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

গণিতের সংজ্ঞা বদলে গেল রাতারাতি

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: বুধবার, ২০ মে, ২০২৬
  • ৩৬ বার পড়া হয়েছে
প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে একসময় দুজনকে প্রায়ই পাশাপাশি হাঁটতে দেখা যেত। একজন উষ্কখুষ্ক সাদা চুলের আলবার্ট আইনস্টাইন, আর অন্যজন রোগা-পাতলা, গম্ভীর ও চশমা পরা কুর্ট গ্যোডেল।

আইনস্টাইন তখন খ্যাতির তুঙ্গে, বিশ্বজুড়ে তাঁর নামডাক। অথচ তিনি তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের বলতেন, ‘আমি প্রতিদিন নিজের কাজ শেষে ইনস্টিটিউটে আসি শুধু গ্যোডেলের সঙ্গে কথা বলতে বলতে বাড়ি ফেরার লোভে।’ আইনস্টাইন যাঁকে নিজের সমান কিংবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিজের চেয়েও প্রখর বুদ্ধিমান মনে করতেন, সেই মানুষটিই ছিলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ যুক্তিবিদ কুর্ট গ্যোডেল। ১৯০৬ সালে বর্তমান চেক প্রজাতন্ত্রের ব্রুনো শহরে এক সচ্ছল জার্মান পরিবারে তাঁর জন্ম।
ছোটবেলা থেকেই তাঁর অদম্য কৌতূহল ছিল লক্ষ করার মতো। সবকিছুতেই তাঁর প্রশ্ন ছিল ‘কেন?’ গ্যোডেলের এই প্রশ্নবাণে অতিষ্ঠ হয়ে বাড়িতে তাঁর নামই হয়ে গিয়েছিল ‘মিস্টার হোয়াই’ বা ‘সবজান্তা’। এই অজানাকে জানার তীব্র নেশা থেকেই ১৯২৪ সালে গ্যোডেল ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখানে পদার্থবিজ্ঞান দিয়ে পড়াশোনা শুরু করলেও খুব দ্রুতই বিশুদ্ধ গণিত আর দর্শনের মায়ায় পড়ে যান তিনি।
বিশেষ করে গাণিতিক যুক্তিবিদ্যার যে অতল জগৎ, সেখানে গ্যোডেল নিজের এক অনন্য পৃথিবী তৈরি করে নিতে থাকেন। 

গণিতের সংজ্ঞা বদলে গেল রাতারাতি

কুর্ট গ্যোডেল ও আলবার্ট আইনস্টাইন

সেই সময়কার গণিতবিশ্বে এক বিশাল তোলপাড় চলছিল। বিখ্যাত গণিতবিদ ডেভিড হিলবার্ট স্বপ্ন দেখতেন এমন একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ গাণিতিক ব্যবস্থার, যেখানে জগতের প্রতিটি সত্যকে লজিক দিয়ে অকাট্যভাবে প্রমাণ করা যাবে। গণিত যে নিখুঁত, সেই বিশ্বাসে তখন কারো কোনো সন্দেহ ছিল না। কিন্তু ১৯৩১ সালে মাত্র ২৫ বছর বয়সী গ্যোডেল যেন সেই দুর্ভেদ্য দুর্গে এক গাণিতিক বোমা ফাটালেন।

তিনি তাঁর বিখ্যাত ‘অসম্পূর্ণতা উপপাদ্য’ (ইনকমপ্লিটনেস থিওরেম)-এর মাধ্যমে প্রমাণ করলেন, গণিতের এমন কিছু ধ্রুব সত্য আছে, যা ওই সিস্টেমের ভেতর থেকে কোনো দিন প্রমাণ করা সম্ভব নয়। সহজ উদাহরণ দিয়ে বললে, গণিত একটি বিশাল সমুদ্রের মতো। আপনি লজিকের যত নিখুঁত আর সূক্ষ্ম জালই তৈরি করুন, কিছু সত্য সেই জালের ফুটো দিয়ে চিরকাল বেরিয়ে যাবেই। এই একটি আবিষ্কার রাতারাতি গণিতের সংজ্ঞা ও ভিত্তি বদলে দিল। বিজ্ঞানীরা স্তম্ভিত হয়ে বুঝতে পারলেন, মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক সামর্থ্যের এমন কিছু সীমা আছে, যা হয়তো কোনো দিনই অতিক্রম করা সম্ভব নয়। 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মেঘ যখন ইউরোপের আকাশে ঘনিয়ে এলো এবং নািসদের তাণ্ডব শুরু হলো, গ্যোডেল তখন অস্ট্রিয়া ছেড়ে আমেরিকায় পাড়ি জমান। প্রিন্সটনের ইনস্টিটিউট ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজে শুরু হয় তাঁর জীবনের দ্বিতীয় এবং অন্যতম শ্রেষ্ঠ অধ্যায়। সেখানে আইনস্টাইনের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব শুধু সন্ধ্যাকালীন আড্ডায় সীমাবদ্ধ ছিল না। আইনস্টাইন যখন মহাবিশ্বের সমীকরণ নিয়ে কাজ করছিলেন, গ্যোডেল তখন খাতা-কলম নিয়ে বসে তাঁর বন্ধুর সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব ব্যবহার করেই প্রমাণ করে দিলেন তাত্ত্বিকভাবে মহাবিশ্বে এমন এক গাণিতিক পথ বা কাঠামো সম্ভব, যা দিয়ে অতীতে ফিরে যাওয়া যায়। অর্থাৎ টাইম ট্রাভেলের যে রোমাঞ্চকর ধারণা আজ আমাদের বিজ্ঞান কল্পকাহিনিতে উদ্বুদ্ধ করে, তার বিশুদ্ধ গাণিতিক সম্ভাবনার কথা তিনিই প্রথম জোরালোভাবে তুলে ধরেছিলেন। তবে এই অতিমানবিক প্রখর মেধার আড়ালে মানুষটি ছিলেন ভীষণ নিভৃতচারী এবং মানসিকভাবে কিছুটা বিষাদগ্রস্ত। জীবনের শেষ দিকে তিনি এক অদ্ভুত প্যারানোয়ায় আক্রান্ত হন। তাঁর সব সময় মনে হতো, চারপাশের মানুষ তাঁকে খাবারে বিষ মিশিয়ে মারতে চায়। এই অহেতুক ভীতি তাঁর প্রতিদিনের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছিল। তিনি নিজের স্ত্রী অ্যাডেল ছাড়া অন্য কারো হাতের তৈরি খাবার এমনকি পানিও স্পর্শ করতেন না। দুর্ভাগ্যবশত, যখন তাঁর স্ত্রী অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলেন, গ্যোডেলও ভয়ে খাবার খাওয়া পুরোপুরি বন্ধ করে দিলেন। তিল তিল করে শুকিয়ে যাওয়া এই শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ ১৯৭৮ সালের ১৪ জানুয়ারি প্রিন্সটনের এক হাসপাতালে অনাহারজনিত শারীরিক জটিলতায় নিঃশব্দে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর সময় তাঁর ওজন ছিল মাত্র ৩০ কেজির মতো। গণিতের যে অসীম সীমানা তিনি জয় করেছিলেন, নিজের মনের গহিনের ভয়কে হয়তো সেভাবে জয় করা হয়ে ওঠেনি তাঁর।

 

 

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com