সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০৫:৩১ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

মানুষের প্রথম পৃথিবী ‘মা’

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: রবিবার, ১০ মে, ২০২৬
  • ১৪ বার পড়া হয়েছে

‘মা’ শব্দের ভেতর জড়িয়ে আছে জন্ম, নিরাপত্তা, আত্মত্যাগ, মমতা, শিকড় আর অস্তিত্বের গল্প। একজন মানুষের জীবনে প্রথম যে আশ্রয়, স্পর্শ ও ভাষা, তার অনেকটাই শুরু হয় মায়ের মধ্য দিয়ে। তাই যুগে যুগে, সভ্যতা থেকে সভ্যতায়, ভাষা থেকে ভাষায় মায়ের প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা আর কৃতজ্ঞতা প্রকাশের নানা রীতি তৈরি হয়েছে। আধুনিক বিশ্বে সেই অনুভূতিরই একটি বৈশ্বিক প্রকাশ– বিশ্ব মা দিবস।

প্রতিবছর মে মাসের দ্বিতীয় রোববার বিশ্বের অধিকাংশ দেশে পালিত হয় মা দিবস। বাংলাদেশেও দিনটি এখন পারিবারিক এবং সাংস্কৃতিক নানা আয়োজনে পালিত হয়। তবে মা দিবসের গল্প শুধু আবেগের নয়। এর ভেতরে আছে সামাজিক আন্দোলন, ইতিহাস, প্রতিবাদ এবং একজন নারীর দীর্ঘ সংগ্রামের কাহিনি।

মাতৃত্বকে সম্মান জানানোর ইতিহাস আধুনিক সময়ের অনেক আগের। প্রাচীন গ্রিসে মাতৃদেবী রিয়ার সম্মানে উৎসবের আয়োজন করা হতো। রোমান সভ্যতায় দেবী সাইবেলি ঘিরেও ছিল মাতৃত্বের উৎসব। পরে ইংল্যান্ডে ‘মাদারিং সানডে’ নামে একটি ঐতিহ্য গড়ে ওঠে। যেখানে সন্তানরা বছরের একটি নির্দিষ্ট দিনে নিজেদের পরিবার ও মায়ের কাছে ফিরে আসত। তবে আধুনিক মা দিবসের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্রে।

উনিশ শতকের আমেরিকায় সামাজিক অস্থিরতার সময় নারীদের স্বাস্থ্য, শিশু পরিচর্যা এবং পারিবারিক পুনর্গঠনে কাজ করতেন সমাজকর্মী জুলিয়া ওয়ার্ড হো এবং অ্যান রিভস জার্ভিস। ১৮৭০ সালে শান্তি ও মানবতার পক্ষে ‘মাদারস ডে প্রোক্লেমেশন’ প্রকাশ করেন জুলিয়া ওয়ার্ড হো। একই সময়ে অ্যান রিভস জার্ভিস নারীদের সংগঠিত করে
শিশুস্বাস্থ্য, পরিচ্ছন্নতা ও সামাজিক সচেতনতা নিয়ে কাজ করছিলেন। অ্যান রিভস জার্ভিস বিশ্বাস করতেন, পরিবার ও সমাজের জন্য মায়ের অবদানকে সম্মান জানাতে একটি দিন থাকা প্রয়োজন। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ হওয়ার আগেই ১৯০৫ সালের ৫ মে তিনি মারা যান। মায়ের মৃত্যু বদলে দেয় তাঁর মেয়ে জার্ভিসকে। মায়ের সমাধির সামনে দাঁড়িয়ে তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, মায়ের স্বপ্ন তিনি পূরণ করবেন। এরপর শুরু হয় তাঁর সংগ্রাম। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের গভর্নর, রাজনীতিবিদ, সামাজিক সংগঠন, সংবাদমাধ্যম– সবার কাছে তিনি চিঠি লিখতে শুরু করেন। তাঁর আহ্বান ছিল একটাই– মায়েদের সম্মানে একটি জাতীয় দিবস ঘোষণা করতে হবে।

১৯০৮ সালে পশ্চিম ভার্জিনিয়ার গ্রাফটনের সেন্ট অ্যান্ড্রুস মেথডিস্ট এপিস্কোপাল চার্চে আনা জার্ভিস প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে মা দিবস পালন করেন। সেদিন তিনি অংশগ্রহণকারীদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন ‘সাদা কার্নেশন’; তাঁর মায়ের প্রিয় ফুল। এরপর ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে দিবসটি ছড়িয়ে পড়ে। অবশেষে ১৯১৪ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন মে মাসের দ্বিতীয় রোববারকে জাতীয় মা দিবস হিসেবে ঘোষণা করেন। সরকারি ছুটিও দেওয়া হয় দিনটিতে। এর পর থেকে বিশ্বের নানা দেশ এই দিনকে নিজেদের মতো গ্রহণ করে।

তবে যে নারী মা দিবস প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করেছিলেন, তিনিই পরে এর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যান। কারণ আনা জার্ভিসের কাছে মা দিবস ছিল হৃদয়ের, সম্পর্কের; ব্যক্তিগত ভালোবাসার দিন। তিনি চেয়েছিলেনম সন্তানরা নিজের হাতে মাকে চিঠি লিখুক, সময় দিক, কৃতজ্ঞতা জানাক। কিন্তু খুব দ্রুত ফুলের দোকান, শুভেচ্ছা কার্ড প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান, উপহার ব্যবসায়ী এবং বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠান মা দিবসকে বাণিজ্যিক উৎসবে পরিণত করে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন আনা জার্ভিস। তিনি প্রকাশ্যে বলেন, ‘আমি এই দিনটি ভালোবাসার জন্য চেয়েছিলাম; ব্যবসার জন্য নয়।’ এরপর তিনি ফুল ব্যবসায়ী, কার্ড কোম্পানি এবং নানা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু করেন। জীবনের সঞ্চয় পর্যন্ত ব্যয় করেন এই লড়াইয়ে। প্রায় নিঃস্ব অবস্থায় ১৯৪৮ সালে তিনি মারা যান।

এক শতাব্দীর বেশি সময় পর আজ মা দিবস বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়। তবে শুধু এর ইতিহাস দিয়েই মা দিবসের গল্প পূর্ণ হয় না। একসময় ভাবা হতো, মায়ের ভূমিকা পরিবার ও সন্তান লালন-পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ। কিন্তু বর্তমান সমাজে মায়ের পরিচয় বহুমাত্রিক। তিনি একই সঙ্গে সন্তানের প্রথম শিক্ষক, পরিবারের মানসিক শক্তি, কর্মজীবী নারী, উদ্যোক্তা, সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী এবং সমাজ গঠনের অন্যতম চালিকাশক্তি।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় একজন মা ভোরে উঠে পরিবারের জন্য রান্না করেন, সন্তানকে স্কুলে পাঠান, আবার অফিসে যান বা নিজের ব্যবসা পরিচালনা করেন। গ্রামে একজন মা সংসার সামলে কৃষিকাজে অংশ নেন। শহরে একজন মা করপোরেট অফিস, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন। অনেক পরিবারে মা এখন প্রধান উপার্জনকারীও।

তবুও বাস্তবতা হলো, পরিবারের অদৃশ্য শ্রমের বড় অংশের ভার এখনও মায়ের কাঁধেই। কর্মজীবনের চাপ, সংসারের দায়িত্ব, সন্তানের পড়াশোনা, ডিজিটাল যুগের নানা চ্যালেঞ্জ, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা– সব মিলিয়ে আজকের মা প্রতিদিন এক নীরব সংগ্রামের ভেতর দিয়ে যান। অনেক মা আছেন, যাদের সন্তান দূরে থাকে; ভিডিও কলে কথা বলেই দিন কাটে। অনেক মা বৃদ্ধ বয়সে একা থাকেন, অথচ একসময় সন্তানের প্রতিটি স্বপ্ন পূরণে নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়েছেন। আবার অনেক একক মা (সিঙ্গেল মাদার) সমাজের চাপ উপেক্ষা করে সন্তানকে মানুষ করছেন। তবু মা থেমে থাকেন না।

উদযাপন যে দিনেই হোক; ফুল কিংবা উপহার যা-ই থাকুক; মা দিবসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা এটিই– পৃথিবীতে অনেক সম্পর্কের ভাষা বদলায়; সংজ্ঞা পাল্টায়। কিন্তু একজন মা তাঁর সন্তানের জন্য কখনও বদলে যান না। কারণ মা শুধু একজন মানুষ নন; একজন মানুষের প্রথম পৃথিবী।

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com