প্রাথমিক স্তরের শিশুরা শেখার একেবারে সূচনালগ্নে থাকে। এই সময় তাদের মনোজগৎ গড়ে ওঠে, কৌতূহল জন্মায়, ভাষা ও সামাজিক দক্ষতা বিকাশ পেতে শুরু করে। এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার মধ্যে একটি আনুষ্ঠানিক পরীক্ষা যুক্ত হলে তা অনেক ক্ষেত্রেই এই বিকাশের গতিকে প্রভাবিত করে।
বিগত কয়েক বছর ভর্তি পরীক্ষা বন্ধ থাকার অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে দেখা গেছে, বিকল্প পদ্ধতিতে ভর্তি কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব এবং তা তুলনামূলকভাবে কম চাপপূর্ণ। অনেক প্রতিষ্ঠানে লটারি পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে, যা অন্তত শিশুদের মানসিক চাপ কমাতে সহায়ক হয়েছে। অভিভাবকদের মধ্যেও অযথা প্রতিযোগিতার প্রবণতা কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। এতে পরিবারে অপ্রয়োজনীয় উদ্বেগ কমেছে এবং শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশের জন্য একটি সহায়ক পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
আবাসিক এলাকা ভিত্তিক স্কুলব্যবস্থার গুরুত্ব এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অনেক অভিভাবক তাঁদের সন্তানকে দূরের নামি স্কুলে ভর্তি করাতে চান। কারণ কাছাকাছি মানসম্মত প্রতিষ্ঠানের অভাব রয়েছে। এর ফলে প্রতিদিন দীর্ঘ সময় যাতায়াত করতে হয়, যা শিশুদের জন্য শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্লান্তিকর। যানজটের কারণে সময় নষ্ট হয়, নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ তৈরি হয় এবং পরিবারে অতিরিক্ত খরচ বাড়ে। বিশেষ করে বড় শহরগুলোতে এই সমস্যা আরো প্রকট। যদি নিজ নিজ এলাকায় মানসম্মত স্কুল নিশ্চিত করা যায়, তাহলে এই সমস্যাগুলোর বড় অংশই কমে যাবে এবং শিশুদের দৈনন্দিন জীবন অনেক সহজ হবে।
কাছাকাছি স্কুলে পড়াশোনা করলে অভিভাবকদের জন্য তদারকি সহজ হয়। তাঁরা সহজেই স্কুলে যেতে পারেন, শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলতে পারেন এবং সন্তানের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে পারেন। এতে শিক্ষা একটি যৌথ দায়িত্বে পরিণত হয়, যেখানে পরিবার ও স্কুল একসঙ্গে কাজ করে। এ ধরনের সমন্বয় শিশুদের শেখার পরিবেশকে আরো শক্তিশালী করে এবং তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। পাশাপাশি শিশুরাও নিজেদের পরিচিত পরিবেশে বেড়ে ওঠে, যা তাদের মানসিক স্থিতি বজায় রাখতে সাহায্য করে।
অন্যদিকে ভর্তি পরীক্ষার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা শিক্ষাব্যবস্থার একটি মৌলিক সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, ভর্তি পরীক্ষায় ভালো ফল করলেও শিক্ষার্থীরা পরবর্তী সময়ে একই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারে না। কারণ শিক্ষা একটি চলমান প্রক্রিয়া, যা কেবল শুরুতেই যাচাই করে শেষ করা যায় না। ভর্তির পর যদি নিয়মিত ও কার্যকর মূল্যায়নের ব্যবস্থা না থাকে, তাহলে শিক্ষার প্রকৃত মান নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে এবং প্রাথমিক নির্বাচনের গুরুত্বও কমে যায়।
বাংলাদেশে ধারাবাহিক মূল্যায়ন পদ্ধতি এখনো পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। কিছু স্কুলে সৃজনশীল পদ্ধতি, প্রকল্পভিত্তিক কাজ এবং সহশিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নের চেষ্টা করা হলেও তা সীমিত। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পরীক্ষার নম্বরই প্রধান সূচক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এতে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা এবং সামাজিক দক্ষতা যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না। ফলে শিক্ষা অনেকাংশে মুখস্থনির্ভর হয়ে পড়ে, যা আধুনিক শিক্ষার লক্ষ্য পূরণে যথেষ্ট নয়।
শহর ও গ্রামের মধ্যে শিক্ষার মান এবং মূল্যায়ন পদ্ধতির এই পার্থক্য আরো গভীর সমস্যা তৈরি করে। শহরের কিছু প্রতিষ্ঠানে আধুনিক পদ্ধতি চালু থাকলেও গ্রামীণ এলাকার অনেক স্কুল এখনো প্রথাগত পরীক্ষানির্ভর ব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ। এতে শিক্ষার্থীদের শেখার অভিজ্ঞতায় বৈষম্য তৈরি হয় এবং ভবিষ্যতে সুযোগের ক্ষেত্রেও পার্থক্য দেখা দেয়। এই বাস্তবতা বিবেচনায় এনে একটি সমন্বিত ও ভারসাম্যপূর্ণ নীতি গ্রহণ করা জরুরি।
শিশুদের ক্ষেত্রে মেধা যাচাই গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কিন্তু তা এককালীন পরীক্ষার মাধ্যমে নির্ধারণ করা যথেষ্ট নয়, বরং ধারাবাহিক মূল্যায়নের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি বোঝা বেশি কার্যকর। নিয়মিত ক্লাস পারফরম্যান্স, অংশগ্রহণ, সৃজনশীল কাজ এবং আচরণগত দিক বিবেচনায় নিলে একটি শিক্ষার্থীর পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যায়। এই পদ্ধতি শিশুদের আত্মবিশ্বাস বাড়ায়, তাদের শেখার আগ্রহ ধরে রাখে এবং প্রতিযোগিতার চাপ কমায়।
এই প্রক্রিয়ায় শিক্ষকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষক যদি কেবল পাঠদান নয়, বরং শিক্ষার্থীদের শেখার প্রক্রিয়া বোঝার দিকে মনোযোগ দেন, তাহলে মূল্যায়ন আরো অর্থবহ হয়ে উঠতে পারে। সহানুভূতিশীল ও সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়ে উঠলে শিক্ষার্থীরা নিজেদের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে উৎসাহ পায়। এতে শিক্ষা একটি আনন্দময়, মানবিক এবং দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব সৃষ্টিকারী অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়।
নীতিনির্ধারকদের জন্য এই বিষয়টি একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। ভর্তি পরীক্ষার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আবাসিক এলাকা ভিত্তিক মানসম্মত স্কুলব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং ধারাবাহিক মূল্যায়ন পদ্ধতি শক্তিশালী করা জরুরি। সরকার যদি পরিকল্পিতভাবে এই দিকগুলোতে বিনিয়োগ করে, তাহলে শিক্ষাব্যবস্থার ওপর চাপ কমবে, পরিবারগুলোর ভোগান্তি হ্রাস পাবে এবং শিক্ষার সুযোগ আরো সমতাভিত্তিক হবে।
এই প্রেক্ষাপটে শিক্ষানীতির একটি দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। শুধু অস্থায়ী সমাধান হিসেবে ভর্তি পরীক্ষা চালু করা সমস্যার মূল কারণ দূর করতে পারে না, বরং শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করা জরুরি। প্রতিটি এলাকায় পর্যাপ্ত অবকাঠামো, প্রশিক্ষিত শিক্ষক এবং মানসম্মত পাঠ্যক্রম নিশ্চিত করা গেলে শিক্ষার গুণগত মান স্বাভাবিকভাবেই উন্নত হবে এবং ভর্তিকে কেন্দ্র করে যে অস্থিরতা তৈরি হয়, তা অনেকাংশে কমে যাবে।
শিশুদের ভর্তির সময় মেধা যাচাই পুনরায় চালু করা একটি সহজ সমাধান মনে হলেও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব গভীর। এর পরিবর্তে যদি আবাসিক এলাকা ভিত্তিক মানসম্মত স্কুলব্যবস্থা গড়ে তোলা যায় এবং ধারাবাহিক মূল্যায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়, তাহলে সেটিই হবে অধিক কার্যকর ও মানবিক পথ। এতে কিছু সময় ও বিনোয়োগ দরকার হবে, তবে স্থায়ী সমাধান মিলবে, নানামুখী সমস্যার সমাধান হবে। ফলস্বরূপ, শিশুদের মানসিক বিকাশ সুরক্ষিত থাকবে, পরিবারগুলোর চাপ কমবে এবং শিক্ষাব্যবস্থা আরো অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই রূপ পাবে।
লেখক : অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়