রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিত্রকলা প্রতিভা;
‘রবীন্দ্র চিত্রকলা জগতের অভিনব সৃষ্টি- অনন্য সাধারণ। তাঁর চিত্রকলা একান্তরূপে তাঁর নিজস্ব, তাঁর ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্যের দ্বারা চিহ্নিত। এ চিত্রকলার হুবহু অনুকরণ কারো পক্ষেই যেমন সম্ভবপর নয়, তেমনি মনের মতো করে সমুচিত ব্যাখ্যা দেওয়াও অসম্ভব। কোনো কলা সমালোচক যে একে কোনো বিশিষ্ট কলারীতির অন্তর্ভুক্ত করে দেখাবেন কিংবা তাঁর নিজস্ব কোনো ধরাবাধা তত্ত্বের সঙ্গে মিলিয়ে এর ব্যাখ্যা দেবেন তারও কোনো সম্ভাবনা নেই।’-(অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর)
বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী আমাদের বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কবিতা-গান নিয়েই বেশি আলোচনা হয়। ছোটগল্প নিয়েও আলোচনা হয়। তাঁর প্রবন্ধ-উপন্যাস বা নাটক-ভ্রমণকাহিনি নিয়ে আলোচনা হয়। তবে কবির একটি সত্তা আছে, সেটা হচ্ছে শিল্পী বা ‘চিত্রকর’। এটা আড়ালেই থেকে যায়। আলোচনা খুব কমই হয়। কবি হিসাবে সমধিক পরিচিত হলেও সাহিত্যের সব বিষয়ে তিনি পা রেখেছেন। যেখানে তাঁর পদচারণা সেখানেই সোনা ফলেছে।
চিত্রকর রবীন্দ্রনাথ এবং তাঁর বর্ণান্ধতা প্রসঙ্গ
চিত্র:রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিচিত্র কাটাকুটি: এই কাটাকুটি থেকে বেরিয়ে আসতো নানা রকমের মুখ, প্রাগৈতিহাসিক দানব, সরীসৃপ অথবা নানা আবোলতাবোল।
তবে এটি উল্লেখ্য যে, পূরবীর পাণ্ডুলিপিতে এ ধরণের বিচিত্র কাটাকুটি হঠাৎ করেই তিনি শুরু করেননি। আর্জেন্টিনা আসার আগেই ১৯২৩ সালে রক্তকরবীর পাণ্ডুলিপির খসড়ার পাতায় তাঁর কাটাকুটি থেকে ছবি তৈরির উদাহরণ আছে। এমনকি তারও আগে রবীন্দ্রনাথ ছবি এঁকেছেন, তবে হয়তো লাগাতার ভাবে নয়। ১৮৭৮-৮২ এই সময়কালে রবীন্দ্রনাথ ‘মালতী’ নামে একটি পুঁথির পাতায় ছবি আঁকতেন। ১৮৮৯ সালের দিকে তিনি একটি পকেটবুক রাখতেন, তাতে যখন যা মনে হত, তাই আঁকতেন । আসলে রবীন্দ্রনাথ পুরাদস্তুর ছবি আঁকা শুরু করেন ১৯২৮ সাল থেকে। আজ আমরা ‘রবীন্দ্র চিত্রকলা’ বলতে যা বুঝি তা হল সেই সময় থেকে পরবর্তী দশ বারো বছরে আঁকা তাঁর আড়াই হাজারের ওপর ছবি। তবে ওকাম্পোর ব্যাপারে এটুকু অন্তত বলা যায় – শেষ বয়সে সাহিত্য ছেড়ে চিত্রকলায় মনোনিবেশের পেছনে রবীন্দ্রনাথের আর্জেন্টিনা উপাখ্যান এবং ওকাম্পোর উৎসাহের ব্যাপারটি নিঃসন্দেহে খুব বড় ভূমিকা রেখেছে।
‘আমাদের অন্তরে প্রবেশ করে সেইভাবে; এই মহান সৃষ্টিকর্মের সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে যেতে হয় – কারণ এই মহত্ত্ব – তুচ্ছ ও বিশাল – উভয়ের মধ্য দিয়ে সমভাবে প্রকাশিত হয়েছে …’।
সরগরম করে তুলেচে। আজ বিকেলে দ্বারোদঘাটন হবে – তারপরে কি হয় সেটাই দ্রষ্টব্য…’
পরে যেটা হল, সেটা সামান্য নয়। চিত্রকর আঁদ্রে কার্পেলেস কিংবা পল ভেলেরি এবং আঁদ্রে জিদের মতোন কলা-বিশেষজ্ঞরা ছবিগুলোকে চিহ্নিত করলেন ‘আগামী যুগের আর্ট’ হিসেবে11 , দেশে অবনীন্দ্রনাথ কিংবা শিল্পাচার্য নন্দলাল বসুর মত চিত্রকররা সেগুলোকে ‘অনন্যসাধারণ’ বলে রায় দিলেন। শুরু হল রবীন্দ্রচিত্রকলা নিয়ে নানা ধরনের গবেষণা এবং আলোচনা। এ নিয়ে দেশের বাইরে রজার ফ্রাই, স্টেলা ক্রামরিশ, আর্চার থেকে শুরু করে এণ্ড্রু রবিনসন যেমন মূল্যবান অভিমত দিয়েছেন, তেমনি বাংলাদেশে এবং ভারতে আনন্দকুমারস্বামী, মুলকরাজ আনন্দ, জয়া আপ্পাস্বামী, পৃথ্বীস নিয়োগী, অশোক মিত্র, রতন পারিমু, গীতা কাপুর, শোভন সোম, প্রণবরঞ্জন রায়, দেবরাজ গোস্বামী, কেতকী কুশারী ডাইসন, সুশোভন অধিকারী, ও.সি গাঙ্গুলি, শুভো ঠাকুর, বিষ্ণু দে ,রবিন্দ্র জীবনিকার, কৃষ্ণ কৃপালনি, সত্যজিৎ রায়, দিনকর কৌশিক, কে.জি. সুব্রামনিয়াম, অশোকমিত্র, শিবনারায়ণ রায়, কানাই সামন্ত, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, বুলবন ওসমান, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম এবং আনিসুজ্জামান প্রমুখ বিভিন্ন সময়ে এ নিয়ে আলোচনা করেছেন। অবশ্য ক্ষেত্রবিশেষে কিছু সমালোচনা যে হয়নি তা নয়। প্যারিসে প্রথম প্রদার্শনীর সময় রবীন্দ্রনাথের কাছের বন্ধু-বান্ধবদের অনেকেই মুখটিপে হেসেছিলেন1।তা সত্ত্বেও প্রদর্শনী থেমে থাকেনি। ১৯৩০ সালের মে মাসে প্যারিসের পিগ্যালে প্রদর্শনীর পর রবিঠাকুরের চিত্র-প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করতে হল জুন মাসে বার্মিংহ্যাম ও ইন্ডিয়া সোসাইটি, লণ্ডনে। জুলাই মাসে বার্লিন, ড্রেসডেন, মিউনিখে। আগস্ট মাসে কবিগুরুর ছবি প্রদর্শনী হয় কোপেনহেগেন ও জেনেভায়। সেপ্টেম্বরে মস্কোয়, অক্টোবর মাসে আমেরিকার বোস্টনে এবং ডিসেম্বর মাসে নিউইয়র্ক এবং ফিলাডেলফিয়ায়। জার্মানিতে সফল চিত্রপ্রদর্শনীর পর কবিগুরু প্রায় শিশুর মতো উৎফুল্ল হয়ে সে সময়কার আরেক ‘গুণমুগ্ধা’ রানী মহলানবিশকে (ভারতের বিখ্যাত পরিসংখ্যানবিদ প্রশান্ত মহলানবিশের স্ত্রী যিনি নির্মলকুমারী নামে সমধিক পরিচিত) লিখলেন
‘আজ আমার জার্মানির পালা সাঙ্গ হল, কাল যাব জেনিভায়।এ পত্র পাবার অনেক আগেই জানতে পেরেছ যে, জার্মানিতে আমার ছবির আদর যথেষ্ট হয়েছে। বার্লিন ন্যাশনাল গ্যালারি থেকে আমার পাঁচখানা ছবি নিয়েছে। এই খবরটার দৌড় কতকটা আশা করি তোমরা বোঝো। ইন্দ্রদেব যদি হঠাৎ তাঁর উচ্চৈঃশ্রবাঃ ঘোড়া পাঠিয়ে দিতেন আমাকে স্বর্গে নিয়ে যাবার জন্য তা হলে আমার নিজের ছবির সঙ্গে পাল্লা দিতে পারতুম’।
যেমন রমানন্দ চট্টোপাধ্যায়কে লেখা একটি চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন1, “আমি কোন বিষয় ভেবে আঁকিনে – দৈবক্রমে একটা অজ্ঞাতকুলশীল চেহারা চলতি কলমের মুখে খাড়া হয়ে ওঠে।”এখন ‘কবির বচন’ যেহেতু,অতএব এটিকে ‘বেদবাক্য’ হিসেবে নিয়ে অন্য সবকিছু খণ্ডন করার একটা প্রবণতা বেশ কিছুদিন ধরেই চালু ছিল। সেজন্য রবীন্দ্রনাথের ছবি প্রসঙ্গে বলতে গেলেই বিশেষজ্ঞরা ‘childlike’ এবং ‘naive’ শব্দদুটি ব্যবহার করতেন। রবীন্দ্রনাথের ছবি নয়, তার ছেলেমানুষির দিকটিই যে গুরুত্বপূর্ণ তা অনেকের উক্তিতে উঠে এসেছে। কুমারস্বামী বলেছেন, ‘childlike, but not childish’। অর্থাৎ ‘শিশুদের মতো, কিন্তু শিশুসুলভ নয়’। শব্দদুটোর ব্যঞ্জনা নিয়ে দার্শনিকভাবে হয়তো তর্ককরা যায়, কিন্তু চিত্রকর দেবরাজ গোস্বামী যেমনটি বলেছেন, ‘কথাটি শুনতে ভালই, কিন্তু সারাৎসার বিশেষ কিছু নেই’। ও.সি গাঙ্গুলি আবার বলেছেন, ‘রবীন্দ্রনাথের প্রাপ্তবয়স্ক কবিমন যখন ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে বা বিশ্রাম নেয়, তখন তাঁর শিশুমন জেগে উঠে ও খেলা করে’। তার চেয়েও বড় কথা -কুমারস্বামী থেকে শুরু করে সত্যজিৎ রায় পর্যন্ত অনেকেই রবীন্দ্রনাথের ছবির মধ্যে কোন প্রভাব খুঁজে পাননি। তারা অভিমত দিয়েছেন তার ছবিগুলো ‘সম্পূর্ণ অরিজিন্যাল’।
সম্প্রতি অবশ্য এই ‘অরিজিন্যালিটি’র ধারণা বৌদ্ধিক সমাজে বেশ ভালভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। শুরুটা হয়েছিলো মূলত গবেষক কেতকী কুশারী ডাইসন এবং শিল্পী সুশোভন অধিকারীর যুগ্ম প্রয়াসে বেরুনো ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’-গ্রন্থটি বেরুনোর পর থেকেই। তারা দেখিয়েছেন রবীন্দ্র-চিত্রকলাকে সারা পৃথিবীব্যাপী তদানীন্তন চিত্রকর্মের ধারার বলয়ের বাইরে বলে যে ভাবা হয় তা ঠিক নয়। বইটি থেকে কিছু উদাহরণ হাজির করি। যেমন, ‘রঠ’ নামক তার স্বরচিত মনোগ্রামটির কথা বলা যায়। এতে যে উত্তর আমেরিকার ‘haida’ শিল্পকলার সরাসরি প্রভাব রয়েছে তা দুটো ছবি পাশাপাশি রেখে দেখিয়েছেন কেতকী কুশারী ডাইসন এবং সুশোভন অধিকারী।
চিত্রকর রবীন্দ্রনাথ এবং তাঁর বর্ণান্ধতা প্রসঙ্গ
কেবল রঠ মনোগ্রাম নয়, রবীন্দ্রনাথের আঁকা সে সময়কার বেশ কিছু ছবিতে আফ্রিকান, মালাঙ্গান, চৈনিক (ব্রোঞ্জ), পেরুভিয়ান, হাইদা এবং তিলিঙ্গিত আর্টওয়ার্কের প্রভাব উজ্জ্বলভাবে লক্ষণীয়। যেমন নীচে রবীন্দ্রনাথের আঁকা ডানপাশের ছবিটির (রবীন্দ্রভবন সংগ্রহ নং ২১৫৫) সাথে বাঁ-পাশের নিউ আয়ারল্যান্ডের মালাঙ্গান আর্টওয়ার্কের তুলনা করলেই দেখা যায় এদের মধ্যে ব্যাপক সাদৃশ্য রয়েছে।
চিত্রকর রবীন্দ্রনাথ এবং তাঁর বর্ণান্ধতা প্রসঙ্গ
কেতকী কুশারী ডাইসন এবং সুশোভন অধিকারীর বইটি নিয়ে অনুষ্টুপের একটি সংখ্যায় আলোচনা করেছেন চিত্রকর দেবরাজ গোস্বামী, অবশ্যই নিজস্ব অভিমত সহযোগেল। প্রবন্ধে তিনি কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন, যা অনেকেরই ভাবনার খোরাক যোগাবে –
‘আদিম শিল্পীদের কাজ বাদ দিয়ে আর কোনো শিল্পকেই ঠিক পুরোপুরি অরিজ্যিনাল বলা চলে না। বিশেষ করে আধুনিক যুগে এটা হওয়া সম্ভব ও নয়। সব শিল্পীকেই তাঁদের পূর্ববর্তীদের কাজ থেকে কিছু না কিছু গ্রহণ করতেই হয়, আর এর মধ্যে দোষেরও কিছু নেই। শিল্পকলায় অরিজিন্যালিটির মাপকাঠি হল, শিল্পী শেষ পর্যন্ত এইসব উপাদান ব্যবহার করেও পূর্ববর্তী শিল্পকলাকে অতিক্রম করতে পেরেছেন কিনা। এমন কথা কল্পনা করাও কঠিন যে, বিংশ শতাব্দীতে বসে একজন চিত্রকর (বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথের মতো মানুষ) এমন একটা কিছু সৃষ্টি করেছেন যার সঙ্গে পৃথিবীর কোন শিল্পকলার কোথাও মিল নেই। যা সম্পূর্ণরূপে অরিজিন্যাল, একমেবাদ্বিতীয়ম্। রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রেও এটা হয়নি। তিনি তাঁর দেখার অভিজ্ঞতা থেকে প্রচুর নিয়েছেন। নিজের মতো করেই নিয়েছেন এবং সাফল্যের সঙ্গে নিজের কাজের ক্ষেত্রে তা ব্যবহার করেছেন’।
১৮৭৮ সালে রবীন্দ্রনাথ যখন প্রথমবার ইউরোপে যান, তখন সেখানকার শিল্পকলার মূলধারা ছিল ইম্প্রেশনিজম (১৮৬৯-১৮৯০)। এরপর এলো পোস্ট-ইম্প্রেশনিজম (১৮৮৫-১৮৯০), জার্মান এক্সপ্রেশনিজম (১৯০০), কিউবিজম (১৯০৮-১৯১৪), ডাডাইজম (১৯১৬-১৯২৪), ফিউচ্যারিজম (১৯০৯-১৯১৫), কন্সট্রাকটিভিজম (১৯১৭-১৯২১), বাওহাউস (১৯১৯-১৯৩৩), স্যুরিয়ালিজম (১৯২০) হয়ে ১৯২৮ এ রাশিয়ায় সোশ্যাল রিয়ালিজম পর্যন্ত চিত্রশিল্পের ধারাগুলো স্বচক্ষেই দেখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ঠাকুর পরিবারে প্রথম থেকেই শিল্পচর্চার পরিবেশ ছিল। ৬নং জোড়াসাঁকোর ‘দক্ষিণের বারান্দায় ‘শিল্পচর্চায় মগ্ন গগনেন্দ্রনাথ ও অবনীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেশবিদেশ থেকে বিখ্যাত শিল্পীরা মোলাকাত করতে আসতেন। এসেছিলেন ওকাকুরা, রদেনস্টাইনসহ অনেকেই। আর রবীন্দ্রনাথ নিজের বাড়িতে এবং শান্তিনিকেতনে বসেই অবলোকন করেছিলেন অবনীন্দ্রনাথ, গগনেন্দ্রনাথ, যামিনী রায়, অসিত হালদার, নন্দলাল বসু এবং রামকিঙ্কর বেইজ প্রমুখের কাজ। কাজেই রবীন্দ্রনাথের চিত্রকর্মগুলো নেহাতই ‘শেষ বয়সের ছেলেমানুষি'(এটা রবীন্দ্রনাথও হয়তো কখনো সখনো হাস্যরসে বলতেন, কিংবা কেউ বললে প্রশ্রয় দিতেন), এই ধারণা খুব ব্যাপকভাবে প্রচারিত হলেও মোটের উপর সঠিক নয় বলেই মনে হয়। যদিও রবীন্দ্রনাথের চিত্রকর হবার ব্যাপারটা অনেকটাই তিনতোরেত্তো, ভ্যান গঘ, আঁরি রুশো প্রমুখের মতো স্বপ্রশিক্ষিত, কিন্তু তিনি নিঃসন্দেহে ছিলেন তাঁর সময়ের অন্যতম ‘well-informed’ শিল্পী, তার কাজের উপর বিবিধ সংস্কৃতির শিল্পকর্মের প্রভাব প্রথম থেকেই ছিল।