সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০৪:২৩ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

বিনামূল্যে আড়াই হাজার অস্ত্রোপচার

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: মঙ্গলবার, ৫ মে, ২০২৬
  • ২২ বার পড়া হয়েছে
 লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার সন্তান আমি। শৈশব থেকেই স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হব। প্রধান শিক্ষক বাবার সরকারি চাকরির সুবাদে আমার শিক্ষাজীবন শুরু হয় ঢাকার গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুলে। এসএসসির পর ভর্তি হলাম ঢাকা কলেজে।

এইচএসসির পরের ঠিকানা ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ। এমবিবিএস পাস করার পর ২০০৩ সালে চিকিৎসক হিসেবে পেশাদার জীবন শুরু হয় আমার। 

২০০২ সাল থেকে আমি জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যুক্ত। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাজনীতিকে শুধু মিছিল-মিটিংয়ের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না রেখে জনগণের জন্য কাজ করার একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে এটি প্রতিষ্ঠা করেন।

ফাউন্ডেশনটি বছরের পর বছর ধরে বিনামূল্যে চিকিৎসা এবং বড় বড় অস্ত্রোপচারসেবা দিয়ে আসছে। যা হোক, পরে আহত নেতাকর্মীদের চিকিৎসার জন্য জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের রিহ্যাবিলিটেশন কমিটি গঠন করা হয়। আমি এর আহ্বায়ক আর সদস্যসচিব ডা. পারভেজ রেজা কাকন। 

এ পর্যন্ত আমরা প্রায় আড়াই হাজার আহত রোগীর অস্ত্রোপচার করেছি।

সবই বিনা পারিশ্রমিকে। আমাদের টিমে আরো ছিলেন অর্থোপেডিকস সার্জন অধ্যাপক ডা. সিরাজুস সালেহীন, চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. সায়ীদ মেহবুব উল কাদির, ডা. এম আর হাসান, ডা. সাজিদ, ডা. শাওন রহমান, ডা. রাকিবুজ্জামান, ডা. আয়াজ প্রমুখ। 

প্রথম দিকে কলাবাগানের একটি হাসপাতালে অস্ত্রোপচার করতাম। এটি ধানমণ্ডি-৩২-এর কাছাকাছি। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর তৎপরতাও বেশি।

ফলে সেখান থেকে সরে শ্যামলীতে গেলাম। বেশির ভাগ অস্ত্রোপচার হতো সেখানকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে। হাসপাতালের মালিক রফিক সাহেব আমাদের সুযোগ দিয়েছিলেন। তবে শর্ত ছিল, যখন অন্য রোগীর ভিড় থাকবে না, তখনই অস্ত্রোপাচার করতে হবে। আমরা হয় গভীর রাতে, নয়তো খুব ভোরে অপারেশন করতাম। আমরা খুবই সাধারণভাবে হাসপাতালে ঢুকতাম। মোবাইল অন্য জায়গায় রেখে আসতাম। কাজ শেষে একেকজন একেকভাবে বেরিয়ে যেতাম। 

আমাদের টিমের অনেকেই সরকারি চাকুরে। ফলে পুলিশ বা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর কাছে ধরা পড়লে মামলা, বিভাগীয় তদন্ত কিংবা শাস্তিমূলক পোস্টিং—যেকোনো কিছুই হতে পারত। তাই বেশ সতর্কতার সঙ্গে চলতে হতো।

বাঁ থেকে—ডা. শাওন বিন রহমান, ডা. শাহ মুহাম্মদ আমান উল্লাহ ও ডা. এম আর হাসান

বাঁ থেকে—ডা. শাওন বিন রহমান, ডা. শাহ মুহাম্মদ আমান উল্লাহ ও ডা. এম আর হাসান


এখানে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজের ইনডোর মেডিক্যাল অফিসার ডা. এম আর হাসানের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়। আমি ঢাকা মেডিক্যালে কাজ করতাম। তখন ডা. হাসানের পোস্টিং ছিল খুলনার কয়রায়। যখনই ঢাকায় একটি গণ্ডগোল হতো, সেও ছটফট করত ওখানে বসে। আমাকে ফোন করত, ‘ভাই, আমি আসব?’ সে চলে আসত। শোকজ, চাকরি চলে যাওয়ার হুমকিসহ বহু কিছুর মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে।

বিনামূল্যে আড়াই হাজার অস্ত্রোপচারতার কাছে এখনো হাজারখানেক স্প্রিন্টার ও রাবার বুলেটের খোসা আছে। গুলির খোসাগুলো সংগ্রহের পেছনে এক মজার ঘটনা আছে। প্রথম দিকে এগুলো হাসপাতালে রেখেই চলে আসতাম। কিন্তু খেয়াল করলাম, এসব নিয়ে হাসপাতালের স্টাফদের মধ্যে কানাঘুষা চলত। এটি যেন না হয় সে জন্য অপারেশনের পর গুলির খোসা পকেটে ভরে নিয়ে যেত হাসান। ২০২৪ সালের আগস্টের আগেও আমরা কাজ করেছি পরিচয় লুকিয়ে। ৫ তারিখের পর প্রকাশ্যে কাজ করছি। সারা দেশ থেকে আহত রোগীরা আমাদের কাছে আসত। গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় আসামির তালিকায় একেবারে প্রথম দিকে থাকত তাদের নাম। স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে তাদের ঢাকায় এনে চিকিৎসা দেওয়াটা বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা কিছু কৌশল অবলম্বন করে আহতদের ঢাকায়  আনতাম। চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে তারা ফিরে যেত। এমনও হয়েছে, রোজার মাসে আমরা অস্ত্রোপচার শেষ করতে করতে সাহরির সময় হয়েছে। সাহরি খেয়ে আবার অস্ত্রোপচার শেষ করে আমি ঢাকা মেডিক্যালের উদ্দেশে রওনা দিয়েছি, আর ডা. হাসান খুলনায়।

তখন বিএনপির কোনো রাজনৈতিক প্রোগ্রাম মানেই ধরে নিতাম, আহত হতে পারে অনেকে। তখন সংশ্লিষ্ট জেলা বা উপজেলা বিএনপির নেতারা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন। আমি আহতদের নম্বর দিয়ে দিতাম হাসানকে। আমি পুরো ঘটনা শুনে আহতের ধরন অনুযায়ী তালিকা করে তাঁকে জানাতাম। এরপর রাত জেগে কার কী ধরনের চিকিৎসা সহায়তা লাগবে, তার একটি ম্যাপিং করে গোপনে হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা শুরু করতাম। অর্থের বিষয়টি ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার ম্যানেজ করতেন। তখন হাতে গোনা দু-তিনটি বেসরকারি হাসপাতালই শুধু চিকিৎসায় রাজি হয়েছিল। এমনও হয়েছে, রাত ২টার সময় আহত রোগীকে হাসপাতাল থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর ভয় দেখিয়ে। অনেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেও হাতে গোনা দু-একটি বেসরকারি হাসপাতাল আহতদের পাশে দাঁড়িয়েছে। পুলিশি হয়রানির ভয়ে চাইলেই যেকোনো হাসপাতালে এসব আহত লোকের চিকিৎসা করা সম্ভব ছিল না। তবু আমরা হাল ছাড়িনি। আহতরা সুস্থ হয়ে আবার মাঠে নামত। ফলে তারা কোথায় চিকিৎসা পায়?—গোয়েন্দাদের মনে এমন প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছিল।

বেশ কয়েকবার ধরা পড়ার মতো অবস্থা হয়েছিল, কিন্তু হাসপাতালের স্টাফরা বিশ্বস্ত ছিলেন। তাঁরা আমাদের সাহায্য করেছেন।

জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে আমরা গুলিবিদ্ধ লোকের শরীরে যে অস্ত্রোপচার করতাম, হাসপাতাল মালিকরা আমাদের কাছ থেকে পয়সা নিতেন না। এখনো সেসব রোগী ও তাদের স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। ভবিষ্যতেও আমাদের এই সেবা অব্যাহত থাকবে।

অনুলিখন : পিন্টু রঞ্জন অর্ক

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com