দেশের গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও ন্যায়বিচার সুপ্রতিষ্ঠিত করতে হলে স্বাধীন সাংবাদিকতার কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করেন বিভিন্ন গণমাধ্যমের সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকেরা। এছাড়া গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনে সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা আরও কার্যকর করতে সরকার ও সাংবাদিকদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সংলাপ জোরদারের আহ্বান জানানো হয়েছে।
বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস ২০২৬ উপলক্ষে গতকাল রবিবার (৩ মে) বিকেলে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে সংবাদপত্র মালিকদের সংগঠন নোয়াব এবং সম্পাদকদের সংগঠন সম্পাদক পরিষদের অনুষ্ঠানে এসব বিষয় উঠে আসে।
সম্পাদক পরিষদের সভাপতি নূরুল কবীরের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি ছিলেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন।
সম্পাদক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক বণিক বার্তার সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন নোয়াব সভাপতি মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম, ইনকিলাব সম্পাদক এ এম এম বাহাউদ্দিন, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও কালের কণ্ঠের সম্পাদক হাসান হাফিজ, সমকাল সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী, ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের সম্পাদক শামসুল হক জাহিদ, ঢাকা ট্রিবিউনের সম্পাদক রিয়াজ আহমেদ, সংবাদের নির্বাহী সম্পাদক শাহরিয়ার করিম, সময়ের আলোর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের গণমাধ্যম কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদ প্রমুখ।
আলোচনা সভায় তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বিস্তার এবং প্রচলিত গণমাধ্যমের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি সমন্বিত কাঠামো জরুরি। গণমাধ্যম কমিশন এই দুই ক্ষেত্রেই নীতিগত দিকনির্দেশনা দিতে পারবে।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরে তথ্যমন্ত্রী বলেন, এই খাতে নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা মূলত বৈশ্বিক প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর হাতে।
ফলে জাতীয় পর্যায়ে সমাধান খোঁজা জটিল। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে কীভাবে দায়বদ্ধতার আওতায় আনা যায়, তা নিয়ে কাজ চলছে।
গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনে সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা আরও কার্যকর করতে সরকার ও সাংবাদিকদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সংলাপ জোরদারের আহ্বান জানান সম্পাদক পরিষদের সভাপতি নূরুল কবীর।
তিনি বলেন, বিশ্বব্যাপী সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে তা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
সংবাদমাধ্যম গণতান্ত্রিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে—এ বিষয়টি সমাজে আরও সুস্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।
ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, যেসব দেশে স্বাধীন সাংবাদিকতা শক্তিশালী, সেসব দেশেই গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও ন্যায়বিচার সুপ্রতিষ্ঠিত।
তিনি বলেন, স্বাধীন সাংবাদিকতার দাবি শুধু সরকারের হস্তক্ষেপ প্রতিরোধে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; বরং নিজেরাও কতটা দায়িত্বশীল ও মূল্যবোধভিত্তিক সাংবাদিকতা করছেন—সে প্রশ্ন তোলার সময় এসেছে।
নোয়াব সভাপতি মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, অপতথ্য ও ভুয়া তথ্য এখন প্রায় মহামারির আকার ধারণ করেছে এবং তা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে সম্মিলিত উদ্যোগ ও সামাজিক আন্দোলন প্রয়োজন।
মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—বিশেষ করে ফেসবুক ও ইউটিউবভিত্তিক তথ্যে প্রতিযোগিতা বেড়ে গেছে।
ফলে যাচাইহীন খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। ভুয়া তথ্যের কারণে সমাজে বিভক্তি তৈরি হচ্ছে, এমনকি ব্যক্তি, পরিবার বা গোষ্ঠীগত সংঘাতের ঘটনাও ঘটছে। পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলেও শঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ বলেন, আন্তর্জাতিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থানের অবনতি ঘটেছে, বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গণমাধ্যমের ওপর চাপ ও হামলার ঘটনা এ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস সম্পাদক শামসুল হক জাহিদ বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সীমাহীন স্বাধীনতা ভোগ করে। ফলে এর অপব্যবহারও বাড়ছে। আইন কিংবা অন্য কোনো ব্যবস্থা দিয়ে অপব্যবহার রোধে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে।