লোকসংগীত মূলত জনগণের সংগীত।
লোকসংগীত মূলত জনগণের সংগীত।
সমর দাসের সুরে নয়ীম গহরের লেখা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে পরিবেশিত গান ‘নোঙ্গর তোল তোল/সময় যে হলো হলো/নোঙ্গর তোল তোল’। গানে শ্রমজীবী মাঝির প্রতীকের জনগণকে সচেতন হওয়া এবং কর্মপন্থা ঠিক করার আহবান জানানো হয়েছে। কিন্তু একই প্রতীকে একই বিষয়কে উপজীব্য করে গিরীন চক্রবর্তীর কথা ও সুরে আব্বাসউদ্দীন আহমদের গাওয়া, ‘নাও ছাড়িয়া দে পাল উড়াইয়া দে/ছল ছলাইয়া চলুক রে নাও মাঝ দইরা দিয়া’—গানটি লোকসংগীত হিসেবে মর্যাদা পেয়েছে। যে গানের গীতিকার ও সুরকারের নাম জানা যায়, সে গান তো তাঁরই গান। এই গানটি যেমন গিরীন চক্রবর্তীর একক সৃষ্টি। তাই একে লোকসংগীত বলা যায় কি না, তা নিয়ে তর্ক রয়েছে। সেই বিচারে লালন সাঁই, রাধারমণ দত্ত, হাছন রাজা, শাহ আব্দুল করিম, বিজয় সরকারের গানকে লোকসংগীত বলার সুযোগ নেই। যে গানের গীতিকার-সুরকারের নাম জানা যায় না, অর্থাৎ যা লোকমানুষের রচনা, লোকমানুষেরই সুরারোপ এবং লোককণ্ঠেই গীত ও পরিবেশিত হয়, সেগুলোই লোকসংগীত। সেইসব গানেও শ্রমজীবী মানুষের কথা রয়েছে, অধিকারচেতনার কথা রয়েছে। কিন্তু ব্যক্তি-কবির লেখা ও সুর করা গানে, যেখানে লোকজীবনের কথা, লোকায়ত সুর ও দর্শন প্রতিফলিত, আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্য-সমন্বিত সেসব গানকেও আমরা লোকসংগীতের অঙ্গনে ঠাঁই দিয়েছি।
লালনের গানেও আমরা শ্রমজীবী পাটনি সম্প্রদায়ের প্রতীকের মানুষের জীবনের কথা পাই—‘কী করি ভেবে মরি মন-মাঝি ঠাওর দেখিনে।/ব্রহ্মা আদি খাইছে খাবি, সেই নদী-পার যাই কেমনে’। গ্রামবাংলায় প্রচলিত ধান কাটার গান ‘ধান কাটিব কচাকচ’ গানটি প্রথম চার লাইন নিয়ে কবি জসীমউদ্দীন লিখেছেন ধানকাটার গান—‘ধান কাটিব কচাকচ।/ও ধান মাথায় লয়ে নাচি নাচি/ফিরব বাড়ি মচামচ\/সোনা ধানের গয়না গড়ে/পরবে বউ আদর করে/চলবে যখন দুলে দুলে/ঘুচবে মোদের খচাখচ\’ বেদে, মাঝি, কৃষক প্রভৃতি শ্রমজীবীর জীবনসংগ্রাম উঠে এসেছে জসীমউদ্দীনের গানে।
সারিগান এক ধরনের লোকসংগীত। একে কর্মসংগীত কিংবা শ্রমসংগীতও বলা হয়। নৌকাবাইচের গান কিংবা ছাদ পেটানোর গান, এমনকি সারিবদ্ধ হয়ে গাওয়া ধান কাটার গানও সারিগানের অন্তর্ভুক্ত। ক্লান্তি মোচনের উপায় হিসেবে এই গানের জন্ম ও বিস্তার। ফোকলোরবিদ মোমেন চৌধুরীর ভাষায়, ‘সারিগান প্রধানত সমবেত কণ্ঠে পুরুষের গান, এককভাবে তা গাওয়া হয় না। তবে ছাদ পেটানোর কাজে মেয়েদের অংশগ্রহণ থাকায় এ ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ একত্রে সারিগান গায়। সারিগানে একজন বয়াতি থাকে, সে মূল গান গায় এবং ফাঁকে ফাঁকে দোহারদের ‘দিশা’ ধরিয়ে দেয়। দোহাররা সমবেত কণ্ঠে তা গেয়ে বয়াতিকে ক্ষণিক বিশ্রামের সুযোগ করে দেয়।’ কেরানীগঞ্জের প্রখ্যাত শিল্পী খালেক দেওয়ানের লেখা ‘মালো মা ঝিলো ঝি/বইন লো বইন করলাম কি/রঙ্গে ভাঙ্গা নৌকা বাইতে আইলাম গাঙ্গে’ গানটি বেশ জনপ্রিয়। এটি নৌকাবাইচের অনুষঙ্গ নিয়ে রচিত। ‘মৈমনসিংহগীতিকা’র অনেক গানও সারিগান হিসেবে গীত হয়; যেমন—মহুয়া পালার ‘ছাইড়া দে কলসি আমার যায় বেলা’। ‘মৈমনসিংহগীতিকা’য় অজস্র গান রয়েছে, যাকে শ্রমসংগীত হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। ছাদ পেটানোর গান তো এখন হারিয়ে যেতে বসেছে। কারণ যান্ত্রিক সভ্যতায় এখন আগের মতো দিনের পর দিন বসে ছাদ পেটাতে হয় না। তবু ঐতিহ্য হিসেবে এই গানের গুরুত্বকে অস্বীকার করার উপায় নেই। কাজী নজরুল ইসলামের একটি গান অনেকেরই স্মরণে থাকতে পারে—
‘সারাদিন পিটি কার দালানের ছাদ গো
সারাদিন পিটি কার দালানের ছাদ।
পাত ভরে ভাত পাই না, ধরে আসে হাত গো।
সারাদিন পিটি কার দালানের ছাদ…।’
এটি ‘চৌরঙ্গী’ চলচ্চিত্রের জন্য রচিত একটি ছাদ পেটানোর গান, যা শ্রমসংগীত হিসেবে গণ্য। এই গানে দিনমজুর, রাজমিস্ত্রি বা নির্মাণ শ্রমিকের জীবনের বাস্তবতা উঠে আসে। এখানে দালানের ছাদ নির্মাণকাজে যুক্ত শ্রমিকের কঠোর পরিশ্রমের ইঙ্গিত দেয়। সারা দিন পরিশ্রম করার পরও ‘পাত ভরে ভাত পাই না’—এই লাইনটি শ্রমের যথাযথ মূল্য না পাওয়া, দারিদ্র্য ও বঞ্চনার প্রতীক। ‘ধরে আসে হাত’ কথাটি শারীরিক ক্লান্তি ও অবসাদের শক্তিশালী চিত্র। এর পরের চরণগুলোতে রয়েছে আরো করুণ বিবরণ—
‘১ম : তোর ঘরে আজ কী রান্না হয়েছে?
২য় : ছেলে দুটো ভাত পায়নি, পথ চেয়ে রয়েছে।
৩য় : আমিও ভাত রাঁধিনি, দেখ না চুল বাঁধিনি
শাশুড়ি মান্ধাতার বুড়ি মন্দ কথা কয়েছে।
৪র্থ : আমার ননদ বড় দজ্জাল বজ্জাত গো।’
সংলাপধর্মী লোকগানটি গ্রামীণ নারীর দৈনন্দিন জীবনের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। এখানে এক নারীর সঙ্গে আরেক নারীর কথোপকথনের মাধ্যমে অভাব-অনটনের কথা প্রকাশ পেয়েছে। প্রথমেই দেখা যায়, ঘরে কী রান্না হয়েছে—এই সাধারণ প্রশ্নের ভেতরেই দারিদ্র্যের ইঙ্গিত লুকিয়ে আছে। উত্তরে বলা হয়, সন্তানরা ভাত পায়নি এবং অপেক্ষা করছে, যা মায়ের অসহায়ত্বের পরিচয় দেয়। পরবর্তী অংশে নারী জানায়, সে এখনো রান্না করতে পারেনি এবং নিজের যত্ন নেওয়ার সময়ও পায়নি। এতে বোঝা যায়, সংসারের চাপ ও অর্থনৈতিক সংকট তার জীবনকে কঠিন করে তুলেছে। শাশুড়ির বকাঝকা ও ননদের সঙ্গে বিরোধ পারিবারিক টানাপোড়েনকে আরো প্রকট করেছে। এইভাবে গানটি নারীর শারীরিক পরিশ্রম, মানসিক ক্লান্তি ও সামাজিক অবস্থানকে ফুটিয়ে তোলে। সর্বোপরি, এটি গ্রামীণ নারীর দুঃখ-কষ্টের একটি জীবন্ত দলিল। গানটির শেষ অন্তরায় রয়েছে—
‘১ম : এত খায় তবু ওদের বউগুলো শুঁটেকা
২য় : ছেলেগুলো প্যাঁকাটি, বাবুগুলো মুটেকা।
৩য় : এরা কাগজের ফুল, এরা চোখে চাঁদ দেখে না।
৪র্থ : ইটের ভিতরে কীটের মত কাটায় এরা রাত গো।’
এই সংলাপধর্মী পঙক্তিগুলো সমাজের শ্রেণিবৈষম্য ও জীবনযাত্রার বৈপরীত্য তুলে ধরে। এখানে বলা হয়েছে, অনেক খাওয়ার পরও গরিব ঘরের বউরা রোগা থাকে, যা অপুষ্টি ও কষ্টের ইঙ্গিত। অন্যদিকে ছেলেরা দুর্বল হলেও ‘বাবু’ শ্রেণির লোকজন মোটা—এতে ধনী-দরিদ্র বৈষম্য প্রকাশ পেয়েছে। ‘কাগজের ফুল’ উপমা দিয়ে তাদের জীবনকে কৃত্রিম ও প্রাণহীন হিসেবে দেখানো হয়েছে। ‘চোখে চাঁদ দেখে না’ বাক্যটি বোঝায়, তারা জীবনের সৌন্দর্য ও স্বাভাবিক আনন্দ থেকে বঞ্চিত। ‘ইটের ভিতরে কীটের মত রাত কাটানো’ চিত্রকল্প শ্রমজীবী মানুষের অমানবিক বসবাস ও দুঃখ-কষ্টের প্রতীক। সামগ্রিকভাবে, এটি দরিদ্র মানুষের বঞ্চনা ও সামাজিক অবিচারের একটি তীব্র প্রতিবাদ।
মে দিবসের চেতনা—শ্রমের মর্যাদা, ন্যায্য মজুরি ও মানবিক অধিকার—লোকসংগীতের ভেতরেও প্রতিফলিত হয়। যদিও লোকগান সরাসরি রাজনৈতিক ভাষায় কথা বলে না, তবু এর অন্তর্নিহিত বক্তব্যে শ্রমিকের বেদনা ও প্রতিবাদের সুর স্পষ্ট। অনেক গানে দেখা যায় শ্রমিকের দুঃখ, ক্ষুধা, সামাজিক অবহেলা এবং মালিক শ্রেণির প্রতি অসন্তোষ। এইভাবে লোকসংগীত হয়ে ওঠে নিপীড়িত মানুষের নীরব কণ্ঠস্বর। বিশেষত বাউল ও মরমি গানে শ্রমজীবী মানুষের জীবনদর্শন ও আত্মিক মুক্তির আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পায়। এখানে মানুষ তার দারিদ্র্য ও কষ্টের মধ্যেও মানবতাবাদী চেতনা ও সমতার স্বপ্ন দেখে। এই দৃষ্টিভঙ্গি মে দিবসের মূল আদর্শের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
বর্তমান সময়ে আধুনিক প্রযুক্তি ও নগরায়ণের ফলে লোকসংগীতের চর্চা কিছুটা কমে গেলেও এর গুরুত্ব কমেনি। বরং শ্রমিকের অধিকার ও মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে লোকসংগীত একটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক মাধ্যম হিসেবে কাজ করতে পারে। মে দিবসের চেতনায় লোকসংগীত শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি শ্রমজীবী মানুষের জীবনসংগ্রামের দলিল। এই সংগীতের মাধ্যমে লোকসমাজের অধিকার আদায়ের ধ্বনি উচ্চারিত হয়।