কৃষকদের মতে, এবার ঘরে ধান তোলার সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল প্রবল শ্রমিকসংকট। আগে ফসল কাটার মৌসুমে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে শ্রমিকরা হাওর এলাকায় এসে কাজ করতেন। কিন্তু এ বছর তাঁদের উপস্থিতি অনেক কমে যায়। স্থানীয়ভাবেও পর্যাপ্ত শ্রমিক পাওয়া যায়নি। ফলে শ্রমিকের মজুরি বাড়িয়েও অনেক ক্ষেত্রে সময়মতো ধান কাটা সম্ভব হয়নি।
রফিকুল ইসলাম নামে সুনামগঞ্জের এক কৃষক জানান, বাইরে থেকে আসা শ্রমিকরা সাধারণত বছরের অন্য সময় বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকেন। বোরো ধান কাটার সময় তাঁরা হাওরে এসে কাজ করেন। কিন্তু এবার আগাম বৃষ্টির কারণে তাঁদের অনেকে আসতে পারেননি। ফলে নির্ধারিত সময়ে ধান কাটা সম্ভব হয়নি।
তিনি আরো জানান, আবহাওয়ার পূর্বাভাসে আগাম বৃষ্টির কথা জানা ছিল। যেসব শ্রমিক অন্য পেশায় যুক্ত, যেমন অটোরিকশা চালানো, তাঁদের আবহাওয়ার পূর্বাভাসের খবর আগেই জানানো হয়েছিল। কিন্তু সময়মতো তাঁরা পৌঁছতে পারেননি। শ্রমিকের অভাবে শেষ পর্যন্ত সব ধান ঘরে তোলা যায়নি।
এই সংকটকে আরো তীব্র করেছে ধান কাটার যন্ত্রের অভাব। সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ কর্মসূচির মাধ্যমে হাওরাঞ্চলে কম্বাইন হার্ভেস্টার সরবরাহ করা হলেও এবার চাহিদার তুলনায় তা কম ছিল।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কৃষি কর্মকর্তা বেলায়েত হোসেন জানান, ধান কাটার যন্ত্র ছিল সাড়ে তিন থেকে চার হাজার। গত বছরের তুলনায় এ বছর অন্তত ১০ শতাংশ কম যন্ত্র মাঠে রয়েছে। কিছু যন্ত্র নষ্ট হয়ে গেছে, আবার কিছু যন্ত্র মেরামত বা রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। তিনি আরো জানান, আগাম বৃষ্টির কারণে জমি ভিজে যায়। এ কারণে ভেজা জমিতে হার্ভেস্টার ব্যবহারও অসম্ভব হয়ে পড়ে। এ সময় হাতে কাটা শ্রমিকের বিকল্প নেই। কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ জানায়, হাওরের বিস্তীর্ণ এলাকার ধান একসঙ্গে পাকতে শুরু করে। ফলে অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণ ধান কাটতে হয়। হাতে ধান কাটা শ্রমিক দিয়ে এই বিশাল কাজ শেষ করা প্রায় অসম্ভব।
কৃষকরা বলছেন, যন্ত্র থাকলেও তা সবার জন্য সহজলভ্য নয়। অনেক সময় একটি হার্ভেস্টার বুকিং দিতে কয়েক দিন অপেক্ষা করতে হয়। এর মধ্যে আবহাওয়া খারাপ হলে বড় ক্ষতি হয়ে যায়। অনেক এলাকায় স্থানীয় প্রভাবশালীরা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যন্ত্র ব্যবহার করেন, ফলে সাধারণ কৃষকরা বঞ্চিত হন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা বাড়ছে, ফলে আগাম বৃষ্টির ঝুঁকিও বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ ও দ্রুত সেবা নিশ্চিতের বিকল্প নেই।
তাঁরা বলছেন, হাওরাঞ্চলে পরিকল্পিতভাবে পর্যাপ্ত কম্বাইন হার্ভেস্টার সরবরাহ করা না হলে প্রতিবছর একই ধরনের ক্ষতির পুনরাবৃত্তি হবে। পাশাপাশি শ্রমিকসংকট মোকাবেলায় স্থানীয়ভাবে মৌসুমি শ্রমিক তৈরি বা বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করাও জরুরি।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, হাওরাঞ্চলে এখনো ২৮ হাজার ২০১ হেক্টর জমির ধান পানির নিচে। প্রতি হেক্টরে গড়ে সাড়ে চার টন হিসাবে এই পরিমাণ জমিতে এক লাখ ২৬ হাজার ৯০৪ টন ধান উৎপাদনের কথা ছিল। কিন্তু ধান পানিতে ডুবে যাওয়ায় মোট উৎপাদন নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খান জানান, এ পরিস্থিতিতে জরুরি কাজ হলো সর্বোচ্চ চেষ্টা করে হাওর এলাকার অবশিষ্ট ধান দ্রুত কেটে ফেলা এবং সেগুলো ঠিকভাবে শুকানোর ব্যবস্থা করা।
সাবেক কৃষিসচিব আনোয়ার ফারুক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আগাম বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের মতো পরিস্থিতি মোকাবেলায় কৃষি বিভাগের কার্যকর ও সমন্বিত পরিকল্পনার ঘাটতি স্পষ্ট হয়েছে। হাওরাঞ্চল নিয়ে বিভিন্ন দপ্তরের পরিকল্পনার মধ্যে সমন্বয় না থাকায় সংকট আরো বেড়েছে।’