কিন্তু সবকিছু উলোটপালট হয়ে যায় ২০২৪ সালের এপ্রিল থেকে। সেদিন থেকে চাকরিহারা অবস্থায় আছি।’ বন্ধ হয়ে যাওয়া শ্রীপুরের রাজেন্দ্রপুর এলাকার ডার্ড কম্পোজিটের সুপারভাইজার সিজাউদ্দিন বলেন, ‘চাকরি হারিয়ে নিদারুণ অর্থকষ্টে আছি। তিন ছেলেমেয়ে, বৃদ্ধ মাসহ ছয়জনের সংসার। বাসা ভাড়া, সংসার খরচ, সন্তানদের লেখাপড়া ও মায়ের চিকিৎসার খরচ জোগাতে পারতাম চকরির আয় থেকে। অনেক ঘুরেও নতুন করে চাকরি জোগাড় করতে পারিনি। কিছুদিন রাজমিস্ত্রির কাজ করেছি। কিন্তু প্রয়োজনের অর্ধেক আয়ও হয় না। বাধ্য হয়ে ভাড়ায় অটোরিকশা চালাই।’
চাকরি হারানো টঙ্গীর খাঁপাড়ার সিজন ড্রেসেসের অপারেটর শাহীন আক্তার বলেন, ‘মানবেতর জীবনযাপন করছি। কিছুদিন সবজি বিক্রি করে সংসার চালিয়েছি। অথচ কারখানা চালু থাকাকালে বেতনের টাকায় সংসারের খরচ চালানোর পর কিছু টাকা থাকত।’
সাভার-আশুলিয়ায় বন্ধ ১২৩ কারখানা : শিল্প পুলিশ-১ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের পর থেকে সাভার-আশুলিয়ায় ১২৩টি শিল্প-কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ রয়েছে এবং ১৭টি কারখানা অস্থায়ীভাবে বন্ধ রয়েছে। এসব কারখানায় অন্তত ৩০ থেকে ৩৫ হাজার শ্রমিকের বেশির ভাগই বেকার হয়ে পড়েছেন। শিল্পাঞ্চল আশুলিয়ায় গত কয়েক দিন ধরে তিন মাসের বকেয়া বেতনের দাবিতে নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করে আসছেন আলিফ মেনুফ্যাকচারিং কম্পানি লিমিটেড কারখানার শ্রমিকরা। কারখানাটির নারী শ্রমিক সেলিনা আক্তার বলেন, ফেব্রুয়ারি থেকে কারখানার প্রায় ৬০০ শ্রমিকের বেতন দিচ্ছে না কর্তৃপক্ষ। অনেক শ্রমিকদের আবার তিন-চার মাসের বেতন আটকা পড়েছে। একাধিকবার সময় নিয়েও কর্তৃপক্ষ বেতন পরিশোধ না করায় শ্রমিকরা বকেয়া বেতনের দাবিতে সড়ক
অবরোধ করেছেন।
কারখানাটির অপারেটর সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘সারা মাস খেয়ে-না খেয়ে পরিশ্রম করেও মাস শেষে বেতনের জন্য মালিকপক্ষের দয়ার জন্য তাকিয়ে থাকতে হয়। বকেয়া বেতনের জন্য রাস্তায় নামলে পুলিশ লাঠিপেটা করে ধাওয়া দিয়ে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এ সময় আহত হয়ে টাকার অভাবে চিকিৎসা পাওয়ায়ও কষ্টকর হয়ে যায় বলে জানান তিনি।
আশুলিয়ার জামগড়ায় ইউফোরিয়া অ্যাপারেলস কারখানাটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হাজার হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছেন। চাকরি হারিয়ে তিন মাস ধরে অনেকেই মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এই অবস্থায় শ্রমিকরা বারবার মালিক ও শিল্প পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করে উল্টো ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন বলে তাঁরা জানিয়েছেন। কারখানার শ্রমিক আয়েশা আক্তার বলেন, ‘মালিকপক্ষ শ্রমিকদের সঙ্গে প্রতারণা করে চাকরিচ্যুত করেছে। এখন আমরা নতুন চাকরির জন্য বিভিন্ন কারখানায় ঘুরে জুতার শুকতলা ক্ষয় করছি। কিন্তু কোথাও চাকরি না পেয়ে দোকান বাকি ও বাসাভাড়া দিতে না পেরে প্রতিনিয়ত হেনস্তার শিকার হচ্ছি। এ ছাড়া ছেলেমেয়ের লেখাপড়াও বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।’
নাসা গ্রুপের শ্রমিক মো. হাসান বলেন, ‘একটা কারখানায় ৯ বছর কাজ কাজ করেছি কিন্তু কোনো ক্ষতিপূরণ পাইনি। কারখানা বন্ধ হওয়ার পর দুবার বেতন দেওয়ার কথা থাকলেও একবার পেয়েছি আর একবার পাইনি। এক বছর ধরে ঘুরে চাকরি পাচ্ছি না। সাড়ে চার হাজার টাকা ঘরভাড়া, দুটি ছেলেমেয়ের পড়ালেখা, বাজার সদাই সব মিলিয়ে অনেক খরচ লাগে। কাজ না পেয়ে কামলা দিই। কিন্তু এক দিন কাজ থাকে তো দুই দিন থাকে না। ছেলেমেয়ে নিয়ে চলতে পারছি না, বড়ই কষ্টে আছি।’
নীরব খুলনার শিল্পাঞ্চল : শিল্পাঞ্চলখ্যাত খুলনার রূপসা থেকে খালিশপুর, দৌলতপুর, দিঘলিয়া, খানজাহান আলীতে কারখানার ‘সাইরেন’ আর বাজে না। রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোর সঙ্গে বন্ধ হয়েছে একাধিক ব্যক্তিমালিকাধীন জুট মিল। এক দশকে শিল্পহীন নগরীতে পরিণত হয়েছে খুলনা। ২০২০ সালের ১ জুলাই এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ জুট মিল করপোরেশনের (বিজেএমসি) অধীন খুলনার ৯টিসহ রাষ্ট্রায়ত্ত ২৬টি পাটকল বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এরপর দিঘলিয়ার স্টার, খালিশপুরে প্লাটিনাম, ক্রিসেন্ট, খালিশপুর (পিপলস), দৌলতপুর, ইস্টার্ন, আলিম, যশোরের জেজেআই, কার্পেটিং জুট মিলের শ্রমিকরা কলোনি ছেড়ে যেতে বাধ্য হন। কথা ছিল এসব কারখানা আবার চালু করা হবে। এখনো কোনো কারখানা চালু হয়নি।
অন্যদিকে খুলনার দাদা ম্যাচ ফ্যাক্টরি, টেক্সটাইল মিল, নিউজপ্রিন্ট মিলস, হার্ডবোর্ড মিল দুই দশকের বেশি সময় ধরে বন্ধ রয়েছে। বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত মহসেন, সোনালী ও এজাক্স জুট মিলের চাকাও ঘুরছে না।
প্লাটিনাম জুট মিলের সিবিএ নেতা মো. খলিলুর রহমান বলেন, ‘আমরা মৃত হয়ে বেঁচে আছি। মহান মে দিবস করে কী হবে? ইজারা নিয়েও শ্রমিকদের ঠকানো হচ্ছে। দৌলতপুর লে-অফ করার পরও শ্রমিকদের মজুরি দেওয়া হচ্ছে না। দৈনিক মজুরি সব মিলিয়ে ২৬০ টাকাও নিয়মিত পরিশোধ করা হচ্ছে না। বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় নয়, সরকারি উদ্যোগে মিলগুলো চালু করতে হবে।’