দেশের নদ-নদীতে ইলিশ মাছের উৎপাদনে আবারও ভাটা পড়েছে। সাম্প্রতিক গবেষণা ও মাঠ পর্যায়ের তথ্য বলছে, মেঘনা নদীতে লবণাক্ততার অস্বাভাবিক বৃদ্ধি, প্লাংকটন কমে যাওয়া, পানির গুণগত মানের অবনতি এবং জাটকা নিধনের কারণে ইলিশের স্বাভাবিক জীবনচক্র ব্যাহত হচ্ছে। এতে উৎপাদন আরো কমার আশঙ্কা বাড়ছে।
দুই দশকের ধারাবাহিক বৃদ্ধির পর ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে ইলিশ আহরণের রেকর্ড দাঁড়ায় পাঁচ লাখ ৭১ হাজার টনেরও বেশি।
ইলিশের প্রধান খাদ্য প্লাংকটন। মত্স্য বিভাগের গবেষণা অনুযায়ী, গত দুই দশকে মেঘনা নদীতে
প্লাংকটনের পরিমাণ ৬৭.৯ শতাংশ কমে গেছে। এতে ইলিশের বৃদ্ধি ও বেঁচে থাকা মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্লাংকটনের পরিমাণ আশঙ্কাজনক হারে কমায় সামগ্রিক জলজ বাস্তুতন্ত্রে গুরুতর সংকেত দিচ্ছে। ২০০৬ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে প্লাংকটন কমেছে প্রায় ৬৭.৯ শতাংশ, যেখানে বার্ষিক গড় কমার হার প্রায় ২০০ সেলস/লিটার।
২০২২ সালে সাময়িক বৃদ্ধি দেখা গেলেও ২০২৩ সালে বড় ধস পরিস্থিতিকে নাজুক করে তোলে। এই ক্রমাগত কমে যাওয়া মাছের উৎপাদন, খাদ্যশৃঙ্খল ও নদীর জীববৈচিত্র্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
গবেষণা অনুযায়ী, ইলিশ মাছের বিচরণ ক্ষেত্রের ইকোলজিক্যাল স্টাডিতে নিম্ন মেঘনা ও ঊর্ধ্ব মেঘনার পানির গুণগত মান বিশ্লেষণে দেখা যায়, তাপমাত্রা ও দ্রবীভূত অক্সিজেন তুলনামূলকভাবে অনুকূলে থাকলেও অ্যামোনিয়া ও কার্বন ডাই-অক্সাইড কিছু ক্ষেত্রে বেশি। নিম্ন মেঘনায় ক্ষারত্ব বেশি আর ঊর্ধ্ব মেঘনায় স্বচ্ছতা বেশি লক্ষ করা গেছে। পানির গুণগত কিছু ক্ষেত্রে আংশিক দূষণের ইঙ্গিত রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইলিশ প্রজননের জন্য মিঠা পানির ওপর নির্ভরশীল। লবণাক্ততা বেড়ে গেলে ডিম ছাড়ার স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হয়, পোনা বেঁচে থাকার হার কমে যায় এবং মাছের অভিবাসন ব্যাহত হয়।
গবেষণার পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, নদীজুড়ে গড় লবণাক্ততার মাত্রা ১ থেকে ১২ পিপিটি এর মধ্যে ওঠানামা করছে। তবে বর্ষা মৌসুমে লবণাক্ততা প্রায় শূন্যে নেমে আসে, আর শরৎ ও গ্রীষ্মকালে এটি তুলনামূলকভাবে কম থাকে। ধীরে ধীরে এই লবণাক্ততা নিম্ন মেঘনা থেকে উচ্চ মেঘনার দিকে বিস্তার লাভ করছে এবং ডিসেম্বর থেকে মে পর্যন্ত প্রায় অর্ধেক বছর স্থায়ী থাকে। এতে ইলিশ আহরণের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব রয়েছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, লবণাক্ততা যত বাড়ে, মাছের প্রাপ্যতা তত কমে, অর্থাৎ এদের মধ্যে একটি নেতিবাচক সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে লবণাক্ততা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছালে ইলিশ উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এ ছাড়া বাড়তে থাকা লবণাক্ততা জাটকা বা ছোট ইলিশের বৃদ্ধি ও স্বাভাবিক বিচরণে বড় বাধা সৃষ্টি করছে, যা ভবিষ্যৎ উৎপাদনের জন্যও উদ্বেগজনক। সামগ্রিকভাবে এই অনিয়ন্ত্রিত লবণাক্ততা প্রবাহ মত্স্য সম্পদের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
গবেষণায় নদীর পানিতে উদ্বেগজনক পরিবর্তন পাওয়া গেছে। অনেক স্থানে দ্রবীভূত অক্সিজেন পাঁচ মিলিগ্রাম/লিটারের নিচে নেমে যাচ্ছে, যেখানে ছয়-সাত মিলিগ্রাম/লিটার থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কার্বন ডাই-অক্সাইড ও অ্যামোনিয়ার মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা মাছের জন্য ক্ষতিকর পরিবেশ তৈরি করছে।
গবেষকরা বলছেন, পদ্মা-মেঘনা নদীর অববাহিকায় শিল্প ও নগর বর্জ্য নদীতে পড়ায় পানির স্বচ্ছতা কমছে এবং বিষাক্ত উপাদান জমছে। বিশেষ করে চাঁদপুরসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রজনন এলাকাগুলো এখন ঝুঁকির মুখে।
ইলিশের টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত করতে মত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. আমিরুল ইসলাম কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করেছেন। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘ইলিশের বিচরণক্ষেত্রে পরিবেশদূষণ রোধ এবং প্রধান খাদ্য প্লাংকটনের উৎপাদন বৃদ্ধি করা জরুরি।’
একই সঙ্গে তিনি অবৈধ কারেন্ট জাল ও জাটকা নিধন সম্পূর্ণ বন্ধের পাশাপাশি মা ইলিশ ধরা বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহবান জানান। বর্তমানে মার্চ-এপ্রিল দুই মাস দেশের পাঁচটি অভয়াশ্রমে মাছ ধরা নিষিদ্ধ। ইলিশের বংশবৃদ্ধি ও সম্পদ রক্ষায় এই নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে নিবিড় নজরদারি ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন তিনি।