রুপালি পর্দা আসলে এক ধরনের আয়না; যেখানে কেউ নিজের মুখই বারবার দেখে, আবার কেউ প্রতিবারই নতুন মুখ খুঁজে নেয়। নাজিফা তুষি দ্বিতীয় দলের অভিনেত্রী। এক দশকের অভিনয়জীবনে তিনি প্রমাণ করেছেন, সৌন্দর্য যদি মেধার সঙ্গে মিশে যায়, তবে তা কেবল আলো ছড়ায় না, দর্শকের মনে স্থায়ী ছাপও রেখে যায়। হঠাৎ করে অসংখ্য কাজ করে আলোচনায় আসার চেয়ে তিনি বিশ্বাস করেছেন নির্বাচিত চরিত্রে। সেই বিশ্বাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ ‘হাওয়া’। সিনেমাটি তাঁকে শুধু জনপ্রিয় করেনি, দর্শকের মনে এক ধরনের আস্থার জায়গাও তৈরি করেছে। তুষি নিজেই বলেন, ‘একটা চিত্রনাট্য পেলে ঝাঁপিয়ে পড়া আমার স্বভাবে নেই। দর্শক যদি গ্রহণ না করেন, তাহলে সে কাজ করে লাভ নেই। আমি শুরু থেকেই বেছে বেছে কাজ করেছি, ধৈর্য ধরে থেকেছি।’ এই ধৈর্য যেন তাঁর অভিনয়ের ভিত–নিঃশব্দে, কিন্তু শক্তপোক্ত।
নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার নেশা
হাওয়ার পর যখন একের পর এক প্রস্তাব তাঁর দরজায় কড়া নাড়ছিল, তখন তুষি নিলেন আরেকটা কঠিন সিদ্ধান্ত–সংখ্যা নয়, গভীরতা। সেই পথেই যুক্ত হলেন ‘প্রেশার কুকার’-এ। চার নারীর গল্পে নির্মিত এই সিনেমায় তিনি যেন এক শরীরে একাধিক জীবন বয়ে বেড়িয়েছেন। কখনও পার্লারকর্মী, কখনও প্রেমিকা, কখনও মা–প্রতিটি স্তরে তিনি ভেঙেছেন নিজেকে, গড়েছেন নতুন করে। তাঁর কথায়, ‘এই যে আমি প্রেশার কুকার যে চরিত্রটি করেছি, হয়তো জীবনে আর করব না। আমি নিজেকে বারবার ভাঙতে প্রস্তুত।’ এই ভাঙাই যেন তাঁর অভিনয়ের আসল শক্তি। চরিত্রের জন্য দুই মাসের প্রস্তুতি, শুটিংয়ের বাইরে সৃজনশীল অংশে সম্পৃক্ততা–সব মিলিয়ে সিনেমাটি হয়ে উঠেছে তাঁর নিজের এক বিস্তৃত ক্যানভাস।
চরিত্র থেকে চরিত্রে
প্রেশার কুকারে সাফল্যের রেশ কাটতে না কাটতেই তুষি হাজির হচ্ছেন ‘রইদ’ নিয়ে। যেখানে তিনি যেন আরও এক ধাপ এগিয়ে গেছেন। চরিত্রের বাস্তবতা আনতে যে ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তা শুনলে বিস্মিত হতে হয়।
ছয় মাস ধরে চুলে কোনো শ্যাম্পু, সাবান বা প্রসাধন ব্যবহার করেননি। রোদে পুড়ে ত্বক কালো করতে শরীরে মেখেছেন সরিষার তেল। তুষি বলেন, ‘আমি চেয়েছিলাম মেকআপ নয়, সত্যিকারের রোদে পোড়া ত্বক। যেন আমাকে শহুরে না লাগে, গল্পের অঞ্চলের মানুষ মনে হয়।’ শুধু ত্বক নয়, বদলেছে দাঁত, বদলেছে কণ্ঠও। চরিত্রের প্রয়োজনে তিনি নিয়মিত পান খেয়েছেন, এমনকি পাথরের চুন ব্যবহার করেছেন; যা মুখে জ্বালা, জিহ্বায় পোড়া অনুভূতি তৈরি করত। সেই কষ্টও থামাতে পারেনি তাঁকে। কারণ, তাঁর কাছে অভিনয় মানে শুধু অভিনয় নয়, একটি জীবনকে নিজের মধ্যে ধারণ করা। এই সিনেমায় তাঁর চরিত্রটির কোনো নাম নেই। নামহীন সেই মানুষটিকে জীবন্ত করে তুলতে তিনি মিশে গেছেন শ্রমজীবী মানুষের ভিড়ে–মাটি কেটেছেন, টিলায় উঠেছেন, গাছ লাগিয়েছেন। পোশাকের জন্য বেছে নিয়েছেন ব্যবহৃত পুরোনো কাপড়; যেন চরিত্রের গায়ে লেগে থাকে বাস্তবের গন্ধ। সহশিল্পী মোস্তাফিজুর নূর ইমরানের সঙ্গে এটি তাঁর প্রথম কাজ। তুষির ভাষায়, ‘চরিত্রের প্রয়োজনে আমরা সব অভিনয়শিল্পী এক অদ্ভুত জীবনযাপন করেছি।’
নায়িকা নন, তিনি অভিনেত্রী
নাজিফা তুষি নিজেকে কখনোই ‘নায়িকা’ শব্দের গণ্ডিতে আটকে রাখেননি। তাঁর উচ্চারণ স্পষ্ট–নায়িকা হতে চাইনি, অভিনেত্রী হতে চেয়েছি। গ্ল্যামারের ঝলক নয়, তিনি খুঁজেছেন চরিত্রের গভীরতা। তাই প্রচলিত বাণিজ্যিক সিনেমার সহজ পথ এড়িয়ে অপেক্ষা করেছেন ভিন্ন কিছু করার। ২০১৪ সালে ‘আইসক্রিম’ দিয়ে বড়পর্দায় অভিষেক হলেও তখন তাঁকে তেমনভাবে মনে রাখেনি দর্শক। তুষি নিজেও স্বীকার করেন, ‘তখন আমি অনেক ছোট ছিলাম, অনেক কিছু বুঝিনি। তবে আইসক্রিম আমাকে শিখিয়েছে–আমার শেখার এখনও অনেক বাকি।’
সামনে যে পথ
বর্তমানে একাধিক প্রজেক্ট নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন তুষি। ‘রঙ্গমালা’র শুটিং শেষ করবেন শিগগিরই। একই সঙ্গে তিনি কাজ করেছেন ‘রেহানা মরিয়ম নূর’-এর নির্মাতা আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদের একটি ওয়েব সিরিজে। এ ছাড়া রায়হান রাফীর ‘আন্ধার’ সিনেমার শুটিং শেষের পথে। নতুন করে যুক্ত হয়েছেন রবিউল আলম রবির ‘সুরাইয়া’ সিনেমায়; যেখানে নাম ভূমিকায় অভিনয় করছেন তিনি–সব মিলিয়ে সামনে অপেক্ষা করছে ব্যস্ত সময়।