সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১১:২২ পূর্বাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

মাদকমুক্ত সমাজ : আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার অপরিহার্য লড়াই

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৪৩ বার পড়া হয়েছে
মাদক কেবল একজন ব্যক্তির জীবন কেড়ে নেয় না, বরং তিলে তিলে ধ্বংস করে দেয় একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ। বর্তমানে আমাদের তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ এই বিষাক্ত নেশার জালে জড়িয়ে পড়ছে, যা সমাজকাঠামোর ভিত্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে। এই মারণব্যাধির আগ্রাসন থেকে যদি আমরা আমাদের সন্তানদের রক্ষা করতে না পারি, তবে জাতির মেরুদণ্ডই ভেঙে পড়বে। তাই মাদকের বিরুদ্ধে এই সংগ্রাম এখন আমাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার প্রধান হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

একসময় আমাদের সমাজে প্রচলিত ধারণা ছিল যে মাদক কেবল শহরের উচ্চবিত্ত বা চারিত্রিক অবক্ষয়গ্রস্ত মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ। কিন্তু বর্তমানে সেই চিত্র সম্পূর্ণ উল্টে গেছে। শহর ছাড়িয়ে মাদকের নীল দংশন এখন গ্রামের নিভৃত পল্লীতেও পৌঁছে গেছে। 

শহরের তুলনায় বর্তমানে গ্রামের মাদকসেবীরা অনেকটা নিরাপদ বোধ করে, যা উদ্বেগের বিষয়।

এর প্রধান কারণ হলো, গ্রামে পুলিশের টহল শহরের তুলনায় কম এবং আমাদের চিরায়ত সামাজিক শাসনের ভিত্তিগুলো দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়ছে। আজ কোনো সচেতন মানুষ যদি এসব বিপথগামী যুবককে বাধা দিতে যায়, তবে তাকেই উল্টো লাঞ্ছিত বা বিপদে পড়ার ঝুঁকিতে থাকতে হয়। এই পরিস্থিতির মূলে রয়েছে মাদকসেবী যুবকদের সঙ্গে স্থানীয় কিশোর গ্যাং এবং প্রভাবশালী মহলের গভীর যোগসূত্র। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় এসব অপরাধীচক্র বেপরোয়া হয়ে ওঠে, যা সাধারণ মানুষকে প্রতিবাদ করতে নিরুৎসাহ করে।
এই ভয়ের সংস্কৃতিই মূলত মাদক ব্যবসায়ীদের প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়েছে। 

ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে বাংলাদেশ একটি সংবেদনশীল অঞ্চলে অবস্থিত। যদিও বাংলাদেশ মূলত কোনো বড় আকারের মাদক উৎপাদনকারী দেশ নয়, তবে পার্শ্ববর্তী দেশগুলো থেকে অবৈধ পথে বিপুল পরিমাণ মাদক আমাদের দেশে প্রবেশ করছে। গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল ও গোল্ডেন ক্রিসেন্টের মাঝামাঝি অবস্থানে থাকায় আন্তর্জাতিক পাচারকারীরা বাংলাদেশকে একটি সুবিধাজনক ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করে। সীমান্তবর্তী এলাকার কিছু অসাধু ও লোভী মানুষ এই পাচারকার্যের সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকলেও এই ব্যবসার মূল হোতা বা গডফাদাররা সাধারণত বড় বড় শহরে নিরাপদ আশ্রয়ে বাস করে।

তারা অত্যন্ত শক্তিশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পুরো নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করছে এবং ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। মাদক ব্যবসায়ীদের কৌশলে এখন ভয়ংকর ভিন্নতা এসেছে। তারা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর নজর এড়াতে নারী ও শিশুদের বাহক হিসেবে ব্যবহার করছে, যা আমাদের সামাজিক নৈতিকতার চরম অবক্ষয় প্রকাশ করে। মাঝে মাঝে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর কিছু অসাধু সদস্যের এই ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ততার খবর আমাদের হতাশ করলেও সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রতিরোধের চেষ্টা চলছে। তবে পরিবহনের সময় বাহক বা চুনোপুঁটিরা ধরা পড়লেও মূল মালিকরা সব সময় টাকার জোরে এবং আইনি ফাঁকফোকর গলিয়ে ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। 

বর্তমানে মাদকের প্রকারভেদ ও এর বহুমুখী ক্ষতির দিকগুলো চিন্তা করলে শিউরে উঠতে হয়। ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিল, হেরোইন থেকে শুরু করে অতি সম্প্রতি আইস বা ক্রিস্টাল মেথের মতো মারাত্মক সব মাদক আমাদের তরুণদের জীবন বিপন্ন করে তুলছে। জাতিসংঘের মাদক নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ইউএনওডিসির তথ্য মতে, বাংলাদেশে বর্তমানে মাদকাসক্তের সংখ্যা প্রায় ৮০ লাখের ওপরে এবং এর বেশির ভাগই হলো দেশের তরুণ। এসব নেশাজাতীয় দ্রব্য সেবনের ফলে একজন মানুষের কর্মক্ষমতা দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। শারীরিক ক্ষতির দিক থেকে বিচার করলে দেখা যায়, মাদকাসক্তির ফলে কিডনি বিকল হওয়া, হার্টের সমস্যা, লিভার সিরোসিস, উচ্চ রক্তচাপ এবং ফুসফুসের মারাত্মক সংক্রমণ ঘটে। বিশেষ করে যারা ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণ করে, তাদের মধ্যে এইচআইভি বা এইডসের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। শারীরিক ক্ষতির চেয়েও ভয়াবহ হলো মানসিক ও সামাজিক ক্ষতি। একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তি তার নেশার টাকা জোগাড় করতে প্রথমে ঘরের সম্পদ বিক্রি করে এবং পরবর্তী সময়ে চুরি, ছিনতাই, এমনকি খুনের মতো জঘন্য অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।

মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রথম এবং প্রধান রণক্ষেত্র হলো আমাদের পরিবার। পরিবারই হলো একটি শিশুর প্রথম শিক্ষালয়, যেখানে তার নৈতিকতার ভিত্তি তৈরি হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমাদের দেশের বেশির ভাগ পরিবারে মাদকের ভয়াবহতা নিয়ে সন্তানদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করা হয় না। অনেক মা-বাবা কর্মব্যস্ততার কারণে সন্তানদের পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেন না, যার ফলে একাকিত্ব ও মানসিক অবসাদ থেকে অনেকে ভুল পথে পা বাড়ায়। সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, তার আচরণের কোনো পরিবর্তন হচ্ছে কি না কিংবা সে রাতের বেলা সময়মতো ঘুমাচ্ছে কি না—এসব দিকে অভিভাবকদের কড়া নজর রাখা অত্যন্ত প্রয়োজন। আমরা ঐশীর সেই নৃশংস ঘটনার কথা নিশ্চয়ই ভুলে যাইনি, যেখানে মাদকাসক্ত হয়ে একজন সন্তান তার জন্মদাতা মা-বাবাকে হত্যা করেছিল। এমন বহু হৃদয়বিদারক ঘটনা আমাদের চারপাশে অহরহ ঘটছে। সন্তান যদি ভুলক্রমে নেশায় আসক্ত হয়েই পড়ে, তবে সেটি সামাজিক লজ্জার ভয়ে গোপন না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং তাকে মানসিক সহযোগিতা প্রদান করা উচিত। পারিবারিক সমর্থনই একজন মাদকাসক্তকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার প্রধান শক্তি।

আমাদের সমাজে ধর্মীয় মূল্যবোধের একটি বিশাল প্রভাব রয়েছে। ইসলামসহ পৃথিবীর সব ধর্মেই মাদক বা নেশাজাতীয় দ্রব্যকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ বা হারাম করা হয়েছে। এই ধর্মীয় বিশ্বাসকে মাদক নির্মূলে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব। মসজিদের ইমাম ও ধর্মীয় নেতারা যদি নিয়মিত জুমার খুতবায় এবং বিভিন্ন ধর্মীয় সভায় মাদকের কুফল ও এর পরকালীন ভয়াবহতা নিয়ে আলোচনা করেন, তবে তা সাধারণ মানুষের মনে গভীর প্রভাব ফেলবে। এ ছাড়া সমাজের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা যদি সোচ্চার হন এবং মাদক ব্যবসায়ীদের সামাজিকভাবে বয়কট করেন, তবেই এই অভিশাপ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

তরুণ প্রজন্মকে যদি আমরা মাদকমুক্ত করতে না পারি, তবে আমাদের দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা অবকাঠামো উন্নয়নের কোনো সুফলই দীর্ঘস্থায়ী হবে না। এই জাতীয় সংকট মোকাবেলায় সরকারকে আরো কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। সীমান্ত এলাকায় ড্রোন প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে অবৈধ প্রবেশ বন্ধ করতে হবে এবং বিজিবিসহ সব সংস্থাকে আরো শক্তিশালী করতে হবে। মাদক সিন্ডিকেটের মূল হোতাদের চিহ্নিত করে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে দ্রুত বিচারের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে, যেন কেউ এই ব্যবসা করার সাহস না পায়। এ ছাড়া সরকারি-বেসরকারি সব চাকরিতে নিয়োগের আগে এবং উচ্চশিক্ষায় ভর্তির ক্ষেত্রে ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করা এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে মাদকাসক্তদের অপরাধী হিসেবে না দেখে রোগী হিসেবে বিবেচনা করে তাদের জন্য মানসম্মত ও স্বল্পব্যয়ী সরকারি পুনর্বাসন কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়ানো জরুরি।

আশার কথা হলো, বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে মাদকের বিরুদ্ধে একটি সমন্বিত প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে। সরকার মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছে এবং আইনকে আরো যুগোপযোগী করা হয়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। পাশাপাশি ‘মানস’-এর মতো বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও এনজিও তৃণমূল পর্যায়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং পুনর্বাসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে শুধু আইন বা অভিযান দিয়ে মাদক নির্মূল করা সম্ভব নয়, যতক্ষণ না পর্যন্ত সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে উঠবে। রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারকে একটি ত্রিভুজ নেটওয়ার্কের মতো একসঙ্গে কাজ করতে হবে। তরুণদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যেন তারা অবসরে সৃজনশীল কাজে ব্যস্ত থাকতে পারে। মাদককে ‘না’ বলা হোক, আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার স্লোগান। আসুন, আমরা আজই প্রতিজ্ঞা করি—নিজে মাদক থেকে দূরে থাকব এবং সমাজকেও এর বিষক্রিয়া থেকে রক্ষা করব। একটি মাদকমুক্ত সুস্থ প্রজন্মই পারে আমাদের স্বপ্নের উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ উপহার দিতে। অন্ধকার থেকে আলোতে ফেরার এই লড়াইয়ে আমাদের জয়ী হতেই হবে।

লেখক : সাবেক প্রধান নির্বাহী, প্রশিকা

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com