সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০২:২১ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

জাহাজীর ভুবনে স্বাগতম

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: শনিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২৬
  • ১৬ বার পড়া হয়েছে
জাহাজীর কাছে ভীষণ সত্য সেই, পথটাই যাওয়া, এর আর কোনো ফিরে আসা নেই’—কথাটা সত্য বটে। অন্তহীন পথ চলাই তো জীবন। তবু কখনোসখনো একটু জিরিয়ে নিতে হয়। বোশেখী দাবদাহে গা পুড়িয়ে কোনো আম্র ছায়ায় দুদণ্ড বসতে হয়।

ফেলে আসা পথটা নিয়েও তখন মনের জানালায় উঁকি দেয় ভাবনার চড়ুই। কতটুকু এলাম, কত কী হারালাম, এসব যোগ-বিয়োগের অঙ্কও কষতে হয়। আর প্রসঙ্গ যখন তিন দশকের মতো দারুণ মাইলফলক, তখন গল্পেরা কি বাঁধ মানে? 

বৃহস্পতির রাতে যখন মুঠোফোনে সাড়া দিলেন ‘শিরোনামহীন’ কর্তা জিয়াউর রহমান, তখন তিনি গাড়িতে। পথ চলতে চলতেই খুললেন গল্পের ঝাঁপি।

সে গল্প ১৯৯৬-এর গ্রীষ্ম থেকে উড়তে উড়তে ছুঁয়ে ফেলল এই গ্রীষ্মের নাগাল। শুরুর কথায় হোক শুরু। তখন জিয়া বুয়েটের ছাত্র। গানের সঙ্গে সখ্য গড়ে উঠল।
গিটারও আছে আয়ত্তে। ভাবলেন, একটা ব্যান্ড করা যেতে পারে। সঙ্গে নিলেন বন্ধু জুয়েলকে। তিনিও ছিলেন গিটারিস্ট। আর ভোকালের জন্য খুঁজে নিলেন বুলবুলকে; বয়সে কিছুটা বড়, গানের শিক্ষকও।
এই তিনে মিলে শুরু করলেন ‘শিরোনামহীন’। গল্প-আড্ডায় এগোতে থাকল তাঁদের গানযাত্রা। ১৯৯৬ সালের ১৪ এপ্রিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদাতিক নাট্য সংসদের একটি প্রদর্শনীর আগ মুহূর্তে সুযোগ হলো গান পরিবেশনার। প্রথমবার আনুষ্ঠানিকভাবে মঞ্চে ওঠে ‘শিরোনামহীন’। সেই থেকে শুরু, আজও ক্লান্তিহীন চলছে দলটি। 

বয়স কম ছিল, অভিজ্ঞতাও ছিল কম। কিন্তু একটা বিষয়ে জিয়া ও তাঁর সতীর্থরা পরিষ্কার ছিলেন, মৌলিক গানটা করে যেতে হবে। আর সে গানে যেন নিজস্ব ছাপ থাকে। এই দৃঢ় ভাবনাই শক্তি হয়ে ওঠে দলটির। যা ‘শিরোনামহীন’কে পরিণত করেছে একবিংশ শতকে বাংলা ব্যান্ডের সবচেয়ে বড় শিরোনামে। গানের ধরন নিয়ে জিয়ার কাছে মিলল এমন ব্যাখ্যা, ‘১৯৯০-এর দশকে যে ব্যান্ডগুলো ছিল, এর মধ্যে কিছু ব্যান্ড মৌলিক গানে ফোকাসড ছিল। আর কিছু ব্যান্ড ইনস্পায়ার্ড গান করত। শিরোনামহীন ছিল এর ব্যতিক্রম। আমি রক যেমন পছন্দ করতাম, পাশাপাশি ক্লাসিক্যালের প্রতি অগাধ ভালোবাসা ছিল। তবে যখন নিজেরা গান বানানো শুরু করলাম, তখন খুব সচেতনভাবেই চেষ্টা করেছি, আমাদের মতো করে বাংলা গান করতে। যেটা শুনলেই মনে হবে, এটা শিরোনামহীনের গান। এর কোনো স্পেসিফিক ফর্মুলা নেই। এটা এক ধরনের কেমিস্ট্রি। আমাদের সদস্যদের মধ্যে একটা আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সেখান থেকে পারস্পরিক ভাবনার আদান-প্রদানে আমাদের মিউজিকের নিজস্বতা তৈরি হয়েছে। ফলে আমাদের সদস্যে পরিবর্তন এলেও বৈশিষ্ট্য হারায়নি।’

‘শিরোনামহীন’-এর প্রথম অ্যালবাম ‘জাহাজী’ প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। বলা বাহুল্য, গোটা বাংলা ব্যান্ডের ইতিহাসে অন্যতম সেরা অ্যালবাম হিসেবে বিবেচিত এটি। তবে অবাক করার মতো বিষয়, অ্যালবামটি তখন প্রকাশ করতে চায়নি কেউই। বহু প্রতিষ্ঠানে ঘুরেছেন ‘জাহাজী’রা, কিন্তু ফিরতে হয়েছে খালি হাতেই। কারণ অ্যালবামটির গানের কথা ও মিউজিক সে সময়ের বাজার-চাহিদার চেয়ে একদমই ভিন্ন ছিল। শেষমেশ এগিয়ে আসে র‍্যাবিট কমিউনিকেশন। যদিও সেটি আদতে সংগীত প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ছিল না, বরং একটি ফিল্ম প্রডাকশন। এর কর্ণধার সগীরের উদ্যোগেই মুক্তির আলো দেখে ‘জাহাজী’। বাজারে আসার পর অল্প সময়ের মধ্যেই অ্যালবামটির নাম-ডাক ছড়িয়ে পড়ে। গানগুলো এদিক-সেদিক বাজতে শুরু করে। শ্রোতার চাহিদা দেখে তখন হাত বাড়ায় জি সিরিজ। র‍্যাবিট কমিউনিকেশনের কাছ থেকে অ্যালবামটি কিনে নেয় প্রতিষ্ঠানটি। অতঃপর বড় পরিসরে বাজারে ছাড়ে তারা, আর তা ছড়িয়ে যায় ব্যাপকভাবে।

ভাঙন সামলে অবিচল

ব্যান্ড মিউজিকের চিরন্তন দুঃখ—ভাঙন। এটি এড়াতে পারেনি ‘শিরোনামহীন’ও। পথচলার তিন দশকে বহুবার এ ধাক্কায় পড়েছে দলটি। তবে অন্য অনেক ব্যান্ডের মতো হারিয়ে নয়; বরং আরো প্রবলভাবে ফিরেছে ‘শিরোনামহীন’। যদিও সদস্য বদলের এ ধারাকে ‘ভাঙন’ মানতে নারাজ জিয়া। তিনি মনে করেন, তাঁর অদম্য ইচ্ছা ও চেষ্টায় ব্যান্ডটি এতটা পথ পাড়ি দিয়েছে। তাঁর ভাষ্য, “৩০ বছর ধরে শিরোনামহীনে একটা ব্যক্তি উপস্থিত, সেটা আমি। এর কারণ আমার ডিটারমিনেশন। গান করে যেতে হবে এবং সেটার জন্য ডেডিকেশন থাকতে হবে, এই ভাবনা নিয়ে পথ চলেছি। ফলে লাইনআপ পরিবর্তনকে আমি ভাঙা-গড়া হিসেবে দেখি না। হ্যাঁ, এই পরিবর্তনটা অনেকবার হয়েছে। প্রথম অ্যালবাম রিলিজের আগেই বুলবুল ভাই চলে গেলেন, এরপর ভোকাল হয়ে আসে মহিন। সেও কিছুদিন পর ছেড়ে দেয়। এরপর আসে আমার আরেক বন্ধু তানযীর তুহীন। সে টানা ১৭ বছর ছিল। প্রথম অ্যালবাম প্রকাশের পরই চলে যায় বন্ধু জুয়েল। আরও একাধিক সদস্য বদল হয়েছে। তো এগুলো অবশ্যই স্ট্রাগল ছিল। সফলতা যেমন আছে, ব্যর্থতাও আছে। এ জন্য এগুলোর হিসাব-নিকাশ আর করি না। একটা জিনিস বুঝে গেছি, দিন শেষে সবচেয়ে জরুরি গানটা ভালো কি না। তুহীন চলে যাওয়ার পর আমরা থেমে থাকিনি, নতুন গান প্রকাশ করতে থাকলাম। মজার ব্যাপার হলো, শিরোনামহীনের সবচেয়ে জনপ্রিয় গান ‘এই অবেলায়’ কিন্তু তুহীন চলে যাওয়ার পর এসেছে। অর্থাৎ গানের শক্তিটাই এমন, সবকিছুকে ছাপিয়ে যায়।”

দশকে দশকে শিরোনামহীন

তিন দশককে তিন ভাগে ভাগ করে যদি ‘শিরোনামহীন’কে ব্যাখ্যা করা যায়, কেমন হয়? ‘ইন্টারেস্টিং’ বলে ব্যাখ্যায় ঢুকলেন জিয়া, “প্রথম দশক আসলে শিখতে শিখতেই চলে গেল। ওই দশকটা কিভাবে গেল, টেরই পেলাম না। প্রথম অ্যালবাম ‘জাহাজী’ প্রকাশিত হয় ২০০৪-এ। ব্যান্ড গঠনের আট বছর পর। এই আট বছরে আমরা গান তৈরি করেছি, কিন্তু প্রকাশ করতে পারিনি। গান রিলিজে যে শক্তি-সামর্থ্য দরকার, তা অর্জন করতে করতেই প্রথম দশক কেটে গেছে। দ্বিতীয় দশকে আমাদের অদম্য আগ্রহ জন্মায়, লাইভ কনসার্টের প্রতি। ওই সময়টাতে পাইরেসি ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে পড়ল। আমাদের পূর্বসুরিদের কিন্তু পাইরেসির এই ধাক্কা সেভাবে সহ্য করতে হয়নি। আমাদের সময়ে পাইরেসির ঝুঁকিতে কম্পানিগুলো হাত গুটিয়ে নিয়েছিল। ফলে দ্বিতীয় দশকে আমরা গান তৈরির চেয়ে শ্রোতাদের সরাসরি গান শোনানোতে বেশি মনোযোগী ছিলাম। তার পরও আমাদের গান এবং অ্যালবামের সংখ্যা সমসাময়িক সবার চেয়ে বেশি। তৃতীয় দশকে এসে আমরা এখন অনেক পরিপক্ব। আরেকটা বিষয় হলো, এই দশকে কনসার্টের প্রেজেন্টেশন অনেক উন্নত হয়েছে। আগে লাইভ শোগুলোর আয়োজন অতোটা আকর্ষণীয় থাকত না। এখন সেটা উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়েছে। এর পেছনে জয় বাংলা কনসার্ট, বামবার কনসার্টগুলোর ভূমিকা আছে। ওই বড় বড় শোগুলো হওয়ার সুবাদেই অন্য আয়োজকরা বুঝতে শিখেছে, কনসার্টের সৌন্দর্য কিভাবে বাড়ানো যায়।”

উচ্ছ্বাস ও অনুভূতি

সফলতা যেমন আছে ব্যর্থতাও আছে

জিয়াউর রহমান

প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, গীতিকার, সুরকার ও গিটারিস্ট

এত লম্বা একটা জার্নি। অবশ্যই দারুণ ব্যাপার। এর মাঝে অনেক চড়াই-উতরাই ছিল। সফলতা যেমন আছে, ব্যর্থতাও আছে। সবই তো অভিজ্ঞতা। সে অভিজ্ঞতার হাত ধরে এত বছর পাড়ি দিয়েছি এবং সামনে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছি। যখন ব্যান্ড শুরু করেছিলাম, তখন বয়স আরো ৩০ বছর কম ছিল। ছোট মানুষ, আবেগ ছিল বেশি। যুক্তির প্রবণতা কিংবা অভিজ্ঞতা ছিল না। তবে ছিল এগিয়ে যাওয়ার উদ্যম আর কঠোর পরিশ্রম করার ইচ্ছা। এই দুটোর সমন্বয় যতটুকু করতে পেরেছি, ততটুকুই সফল হয়েছি। দিনশেষে এ দেশের মানুষ অত্যন্ত গানপ্রিয়। জীবনের প্রতিটা মুহূর্তে গান জড়িত। ফলে মানুষের জন্য গান করে যাওয়ার আনন্দটাই আলাদা।

যা পেয়েছি আমরা সন্তুষ্ট

কাজী আহমেদ শাফিন

ড্রামস, ভায়োলিন ও বাঁশিবাদক

আমি ‘শিরোনামহীন’-এ ২০০৩ থেকে আছি। ২৩ বছর হয়ে গেল। ব্যান্ডটির তিন দশক পূর্ণ হওয়া নিঃসন্দেহে অনেক ভালোলাগার ব্যাপার। এর মধ্যে অনেক সদস্য পরিবর্তন হয়েছে, তবু আমরা নিয়মিত গান করে গেছি। ঠিক এ কারণেই ব্যান্ডটা টিকে আছে। আমাদের সবচেয়ে জনপ্রিয় গানগুলো এই সাম্প্রতিক সময়েই এসেছে। তা ছাড়া কোনো ব্যান্ডে ৩০ বছর ধরে একই সদস্য থাকাটা প্রায় অসম্ভব। পরিবর্তনটাই স্বাভাবিক। নতুন যারা যুক্ত হয়েছেন, তারাও নিজেদের জায়গা থেকে দারুণ ভূমিকা রাখছেন। এই পথচলায় আমরা হ্যাপি। আমরা অনেক ভাগ্যবানও বটে, মানুষ এভাবে এত বছর ধরে আমাদের গান শুনছেন। সো, যা পেয়েছি, আমরা সন্তুষ্ট।

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com