সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১০:০১ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

বর্ষবরণ উৎসবকে রাঙিয়ে তোলে আলপনা

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৯ বার পড়া হয়েছে

এই জনপদে আলপনার ব্যবহার বহু পুরোনো। পহেলা বৈশাখ, একুশে ফেব্রুয়ারিসহ জাতীয় উৎসব, পূজা, বিয়ে, গায়ে হলুদ, পাহাড়ি উৎসব কিংবা যে কোনো আনন্দ আয়োজনে আঁকা হয় আলপনা। বাহারি রঙের বৃত্ত, ফুল, পাখি, পাতা, শঙ্খ কিংবা জ্যামিতিক নকশা একদিকে যেমন এ অঞ্চলের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে, তেমনি নানা রং উৎসবের আবহকে উজ্জ্বল করে তোলে।

আলপনার ধারাবাহিকতা প্রাচীন যুগ থেকে চলে আসছে। একসময় গ্রামীণ বাংলায় চালের গুঁড়া, হলুদ কিংবা প্রাকৃতিক রং মিশিয়ে আঙুল দিয়ে নকশা করা হতো বলে জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্কন ও চিত্রায়ণ বিভাগের শিক্ষক সুমন হায়দার। তিনি বলেন, ‘আলপনা মূলত বাংলার গ্রামীণ নারীদের ঘরোয়া চর্চা এবং বিভিন্ন ধর্মীয় ব্রতর অংশ হিসেবে শুরু হয়েছিল, যেখানে রঙের বদলে মাটির উঠোনে শুধু চালের গুঁড়া ব্যবহার করা হতো। তবে নাগরিক জীবনে প্রবেশের পর এটি তার আদি রিচুয়ালিস্টিক বা ধর্মীয় রূপ থেকে বেরিয়ে একটি ধর্মনিরপেক্ষ ও সর্বজনীন শিল্পমাধ্যমে (আর্ট ফর্ম) পরিণত হয়েছে।’
লোকসংস্কৃতি গবেষকদের মতে, এই চর্চার শিকড় প্রাক-আর্য যুগে। তখন ভূমি উপাসনাকেন্দ্রিক আচারে মাটির উঠোনে চালের গুঁড়-জলের মিশ্রণে নকশা আঁকা হতো, যা ছিল উর্বরতা, সমৃদ্ধি ও শুভকামনার প্রতীক। আর্য সংস্কৃতি এতে দেবদেবীর উপাদান যোগ করলেও মূল কাঠামো ছিল আদিবাসী লোকজীবনের।

মধ্যযুগে বাংলায় হিন্দু-বৌদ্ধ-জৈন আচারের প্রভাবে আলপনা আরও সমৃদ্ধ হয়। গ্রামীণ মহিলারা লক্ষ্মীপূজা, দুর্গাপূজা, বিবাহ ও নবান্ন উৎসবে মাটির দাওয়ায় আঁকতেন। উপকরণ ছিল সহজ–চালের গুঁড়া, পানিতে গোলানো চালের মণ্ড, শুকনো পাতা দিয়ে তৈরি রঙের গুঁড়া, কাঠকয়লা, পোড়ামাটি ইত্যাদি। নকশায় ফুটত পদ্ম, ধানের গুচ্ছ, লক্ষ্মীর পদচিহ্ন, মাছ, সূর্য, শঙ্খ।
শান্তিনিকেতনি শৈলীর প্রভাবে আলপনা বিমূর্ত ও আলংকারিক হয়ে ওঠে। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের পর থেকে এটি বাঙালির জাতীয় পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে। ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ২১ ফেব্রুয়ারিতে আলপনা আঁকা শুরু হয়। এর মাধ্যমে আলপনা সেকুলার জাতীয় অনুষঙ্গ হিসেবে আবির্ভূত হয়।
আগে বাড়ির উঠানে, নববধূর ঘরে কিংবা পূজামণ্ডপে আলপনা আঁকতেন গ্রামের নারীরা। প্রতিটি নকশা যেন প্রার্থনা, শুভকামনা আর আনন্দের বহিঃপ্রকাশ। বিশেষত বিয়ে কিংবা পূজা-পার্বণে আলপনা ছিল অপরিহার্য।

স্বাধীন বাংলাদেশে আলপনা আর শুধু হিন্দু আচার নয়। মুসলিম পরিবারে বিয়ে, পহেলা বৈশাখ বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে এর ব্যবহার স্বাভাবিক। ঢাকায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় আলপনা আঁকা হয় কয়েক লাখ বর্গফুটজুড়ে। রাজপথ, বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর, রমনা পার্ক সবই হয়ে ওঠে আলপনার ক্যানভাস। তরুণ-তরুণীরা মুখে আলপনা আঁকেন নানা উৎসব আয়োজনে।
গ্রামে এখনও ঐতিহ্যবাহী রূপ টিকে আছে। সিলেট, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনাসহ বিভিন্ন এলাকায় গ্রামীণ বাড়ির উঠানে মায়ের হাত ধরে মেয়েরা আলপনা আঁকা শেখে। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে এর নতুন বৈচিত্র্য দেখা যাচ্ছে। আলপনায় যোগ হয়েছে আধুনিক উপাদান, রাসায়নিক রং, ওয়াল মুরাল, এমনকি পোশাকের ডিজাইন।
চারুকলার শিক্ষক সুমন হায়দার জানান, ২১ ফেব্রুয়ারির মতো জাতীয় অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে বিয়ে বা গায়ে হলুদের মতো সামাজিক উৎসবগুলোতে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে এখন আলপনার ব্যবহার ব্যাপকভাবে দেখা যায়। ধর্মীয় অনুশীলনের চিহ্ন থেকে বেরিয়ে এখন নানা নকশায় কাজ হচ্ছে। তাই এটি আর শুধু ধর্ম বা ব্রতর জায়গা থেকে দেখার সুযোগ নেই। এক সময় আলপনায় শুধু সাদা রং ব্যবহার হতো। ধীরে ধীরে লাল, হলুদ, সবুজের মতো নানা রঙের ব্যবহার শুরু হয়।

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com