বাংলাদেশে কৃষক কার্ড চালু হলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুফল পাওয়া যেতে পারে। প্রথমত, দেশের কৃষকদের একটি জাতীয় ডেটা বেইস তৈরি করা সম্ভব হবে। এতে কৃষি নীতিনির্ধারণ, পরিকল্পনা এবং কৃষি সহায়তা কার্যক্রম বাস্তবায়ন সহজ হবে।
গণমাধ্যম ও নীতিগত প্রেক্ষাপট : গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এটি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে সরকার পরীক্ষামূলকভাবে (পাইলট) টাঙ্গাইল সদর, জামালপুরের ইসলামপুর, কক্সবাজারের টেকনাফ, পিরোজপুরের নেছারাবাদ, কুমিল্লা সদর, পঞ্চগড় সদর, মৌলভীবাজারের জুড়ী এবং ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলায় এই কার্যক্রম চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা পরবর্তী সময়ে সারা দেশে সমপ্রসারণ করা হবে। এই কার্ডের মাধ্যমে কৃষকদের সুদমুক্ত ঋণ, ভর্তুকি এবং অন্যান্য কৃষি সহায়তা প্রদান করা হবে। প্রাথমিকভাবে কৃষকদের জন্য সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ মওকুফের সুবিধা যুক্ত করার কথাও বলা হয়েছে।
কৃষি বাজার ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে ভূমিকা : কৃষক কার্ডের মাধ্যমে প্রকৃত কৃষকের পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব। তাঁদের তালিকার ভিত্তিতে কৃষকদের কৃষক বাজার (Farmers Market) বা বিশেষ বিক্রয়কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে তাঁরা মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই সরাসরি ভোক্তার কাছে পণ্য বিক্রি করতে পারবেন। এতে কৃষক ন্যায্যমূল্য পাওয়ার সুযোগ পাবেন। পাশাপাশি কৃষিঋণ, সংরক্ষণ সুবিধা এবং বাজার তথ্য প্রাপ্তি সহজ হবে, যা কৃষকদের আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করতে সহায়তা করবে। এ ক্ষেত্রে প্রতিটি উপজেলায় ন্যূনতম একটি করে ‘কৃষক বাজার’ স্থাপন করা অথবা বিদ্যমান বাজারব্যবস্থাকে কৃষক বাজারের আদলে গড়ে তোলা সহজ হবে। আমরা জানি, সরকার কৃষকদের কাছ থেকে বিভিন্ন কৃষিপণ্য নির্ধারিত মূল্যে সংগ্রহ করে থাকে। অনেক সময় প্রকৃত কৃষকরা এই প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারেন না। যদি কৃষক কার্ডের মাধ্যমে কৃষকদের নিবন্ধন করা হয়, তাহলে সরকারি খাদ্য সংগ্রহ কর্মসূচিতে কার্ডধারী কৃষকদের অগ্রাধিকার দেওয়া সম্ভব হবে। আবার কৃষক কার্ডকে যদি একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যুক্ত করা হয়, তাহলে কৃষক সহজেই বিভিন্ন বাজারের বর্তমান মূল্য, চাহিদা ও সরবরাহের তথ্য জনতে পারবেন।
বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ : বাংলাদেশে অনেক কৃষক বর্গাচাষি বা ভূমিহীন। ফলে তাঁদের সঠিকভাবে নিবন্ধন করা কঠিন। অতীতে দেখা গেছে, অনেক সময় প্রভাবশালীরা কৃষকদের নামে সুবিধা গ্রহণ করেন। এটি বড় ঝুঁকি। গ্রামীণ এলাকায় ইন্টারনেট ও প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাব একটি বড় বাধা। কিছু রিপোর্টে দেখা গেছে, পরিকল্পনা থাকা সত্ত্বেও বাস্তবায়ন দীর্ঘসূত্রতায় ভুগছে। এ ছাড়া ব্যাংক, কৃষি অফিস ও প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় না থাকলে এই উদ্যোগ ব্যাহত হতে পারে।
সম্ভাবনা ও দিকনির্দেশনা : প্রায়ই কৃষক আর্থিক সংকটের কারণে দ্রুত পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হন। ফলে তাঁরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন। কৃষক কার্ডের মাধ্যমে যদি কৃষিঋণ, ভর্তুকি ও অন্যান্য আর্থিক সহায়তা সহজে পাওয়া যায়, তাহলে কৃষক তাড়াহুড়া করে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হবেন না। এতে ভালো দাম পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে পারবেন। একই সঙ্গে কৃষক কার্ডের মাধ্যমে কৃষকদের গুদাম, হিমাগার বা সংরক্ষণ সুবিধা ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হলে কৃষক উৎপাদনের সময় অতিরিক্ত সরবরাহের কারণে কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হবেন না। কৃষক কার্ডের মাধ্যমে যদি কৃষককে সরাসরি ক্রেতা, পাইকার বা প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তাহলে মধ্যস্বত্বভোগীর সংখ্যা কমবে এবং কৃষক বেশি মূল্য পাবেন। কৃষক কার্ড বাংলাদেশের কৃষিব্যবস্থায় একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এটি শুধু একটি পরিচয়পত্র নয়, বরং কৃষিকে একটি আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও স্বচ্ছ ব্যবস্থায় রূপান্তরের একটি কার্যকর হাতিয়ার। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে সঠিক বাস্তবায়ন, সুশাসন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতির ওপর।
লেখক : মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, ফল বিভাগ বিএআরআই, গাজীপুর