সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০৬:৪৬ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

রাত নেমেছিল রুহিনার বুকে

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: শুক্রবার, ১০ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৭ বার পড়া হয়েছে
: হ্যালো।

: হ্যালো, বলুন।

: এটা কি ঢাকা?

: এটা কি ঢাকা মানে কী? কাকে চান আপনি?

: না, মানে বলছি, এটা কোন জায়গা?

: মোবাইল ফোন তো নিজে নিজে চলাচল করতে পারে না। এটা একজন ব্যক্তির কাছে থাকে।

তিনি যেখানে এই ডিভাইস নিয়ে যান, এটাও সেখানে যায়। সুতরাং ব্যক্তিকে না খুঁজে আপনি কেন মোবাইল ফোনটা কোথায় আছে, সেটা তালাশ করছেন? তা ছাড়া আপনি কে বলছেন, সেটাই তো বলছেন না। ফোন করার পর নিজের পরিচয় দিয়ে এরপর অন্য প্রশ্ন করতে হয়। 

: আচ্ছা, আমি রুহিনা।

যাত্রাবাড়ী থেকে বলছি। এটা বিপ্লব ভাইয়ের নম্বর? 

: হ্যাঁ, বিপ্লব বলছি, বলুন।

: আপনার সঙ্গে একটু কথা বলতে চাই, আপনার ফ্রি সময়ে। কখন কল দিতে পারি?

: সমস্যা নেই।

এখনই বলুন। 

: আপনি কি উচ্চারণ শেখান? আমি আপনার কাছ থেকে উচ্চারণ শিখতে চাই। টেলিভিশনে আপনার করা রিপোর্টগুলো খুব ভালো লাগে। আপনার উচ্চারণ সাবলীল ও শ্রুতিমধুর। একটানা কয়েক ঘণ্টা শুনলেও বোরিং লাগে না।

 

: না, আমি কাউকে উচ্চারণ শেখাই না। তবে কেউ সহযোগিতা চাইলে করতে পারি।

: আমি আপনার কাছ থেকে শুদ্ধ উচ্চারণ এবং কথা বলার কৌশল শিখতে চাই।

: আপনার পুরো পরিচয়টা দিন।

: আমি রুহিনা। যাত্রাবাড়ীতে আমাদের বাড়ি। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। জার্নালিজমে অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে। আপনার প্রেজেন্টেশন, নিউজ রিডিং নিয়মিত দেখি। আপনার একজন অন্ধভক্ত আমি। আমি যেহেতু জার্নালিজমে পড়ি, আমি আপনার সঙ্গে একটা যোগাযোগ রাখতে চাই।

: আচ্ছা, প্রয়োজন হলে মাঝেমধ্যে নক দিতে পারেন। দেখুন, উচ্চারণ শিখতে হলে আগে আপনাকে নিজ থেকে চেষ্টা করতে হবে যে আপনি আঞ্চলিক ভাষায় আপাতত কথা বলবেন না। নিজের মধ্যে অভ্যাস তৈরি করতে হবে। প্রাথমিকভাবে পত্রিকা পড়ে প্র্যাকটিস করতে পারেন। সঙ্গে রাখতে পারেন বাংলা একাডেমি উচ্চারণ অভিধান। পড়তে গিয়ে কোনো উচ্চারণে খটকা লাগলে অভিধান দেখে ঠিক করে নিলেন।

: বাহ্, দারুণ আইডিয়া দিলেন। আপনাকে কখন কল দিলে বিরক্ত হবেন না।

: আপনি সন্ধ্যার দিকে দিতে পারেন। ফ্রি থাকলে ধরব। তবে ভীষণ ব্যস্ত থাকি রিপোর্টিং ও অফিসের অন্যান্য কাজ নিয়ে। যা হোক, আজ রাখি। অন্য দিন আবার কথা হবে।

: অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।

 

২.

মশিউর বিপ্লব। এই সময়ের সাহসী টিভি রিপোর্টার। জার্নালিজমের এই দুঃসময়েও কৌশল ও প্রজ্ঞা দিয়ে সৎ ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার প্রতীকে পরিণত হয়েছেন। চ্যানেল ২৪ ঘণ্টার একজন চৌকস সাংবাদিক। হিউজ সোর্স মেইনটেন করেন। দু-তিনটা বিটে একসঙ্গে কাজ করেন। ক্রাইম বিটে তাঁর অসাধারণ দক্ষতা আছে। তাঁর অনেকগুলো অনুসন্ধানী প্রতিবেদন আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছে। দেশেও বেশ আলোচিত তিনি। অফিসের প্রয়োজনে নিউজ অ্যাংকরিংও করেন। চমৎকার শুদ্ধ উচ্চারণে নিউজ পড়তে পারেন। টিভি রিপোর্টে তাঁর ভয়েসে আলাদা শ্রুতিমধুরতা পাওয়া যায়।  জলদ গম্ভীর গমগমে কণ্ঠ। তাঁর কণ্ঠে খবর শোনার পর কানে তার একটা ভালো লাগার রেশ অনেকক্ষণ রয়ে যায়।

মশিউর বিপ্লবের এরই মধ্যে প্রচুর ফ্যান ফলোয়ার তৈরি হয়েছে। ব্যক্তিগত ফেসবুকে লাখ লাখ ফলোয়ার। ইউটিউবে লাখ লাখ ভিউ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও বিপ্লবকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। এই বয়সে এশিয়ার নোবেলখ্যাত র্যামন ম্যাগসেসাই পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের বেস্ট রিপোর্টিং অ্যাওয়ার্ডও তাঁর ঝুলিতে।

বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে প্রচুর অফার আসে বিপ্লবের কাছে। উচ্চারণ প্রশিক্ষণ, সংবাদ পাঠ এবং টিভি রিপোর্টিংয়ের ওপর ক্লাস নেওয়ার জন্য। কিন্তু বিপ্লব বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ‘না’ করে দেন। কারণ সময় নেই।

তবে গত সপ্তাহে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্নালিজম ডিপার্টমেন্ট থেকে আসা ক্লাস নেওয়ার অফারটি ফেরাতে পারেননি। কারণ এটা তো প্র্যাকটিসের ব্যাপারও বটে। ঢাবি থেকে এ রকম অফার আসা মানে নিঃসন্দেহে আনন্দ ও সম্মানের। কিন্তু বিপত্তি ঘটেছে অন্য জায়গায়। ঢাবিতে ক্লাস নেওয়ার পর বিভিন্ন পত্রিকায়ও এই খবর ছাপা হয়েছে। এই খবর দেখে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্নালিজম ডিপার্টমেন্ট থেকে ফোন আসছে একটি-দুটি ক্লাস নেওয়ার জন্য। সবচেয়ে বেশি বিরক্ত করছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। সেখানকার জার্নালিজম বিভাগের চেয়ারম্যান ফোন করে অনুরোধ করেছেন। একটি ক্লাস। এক ঘণ্টার ব্যাপার।

 

৩.

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে আসতেই হলো। অধ্যাপক নেয়ামত স্যার তো নাছোড়বান্দা। তিনি বলেছেন, মশিউর বিপ্লব এটা আমার অনুরোধ এবং আদেশ। প্লিজ, তুমি একবার এসে আমার ছাত্রদের এক ঘণ্টা সময় দিয়ে যাও। ক্লাসের বিষয় টিভি রিপোর্টিংয়ের বাঁকবদল।

আজ ক্লাসে শতভাগ উপস্থিতি। মশিউর বিপ্লব ভাবছেন, আজকে অন্য রকম একটি টপিক সামনে আনবেন। হান্টিং জার্নালিজম বা শিকারি সাংবাদিকতা নিয়ে কথা বলবেন।

শিকারি সাংবাদিকতা নিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক আল মামুনের কিছু বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং উক্তি তুলে ধরেন মশিউর বিপ্লব।

“ইউরোপ ও আমেরিকায় এই শিকারি সাংবাদিকতা দেখা যায়নি; বাংলাদেশে ঘটেছে। কারণ আমাদের সংবাদব্যবস্থায় প্রপাগান্ডা চালানোর সুযোগ আছে। কিন্তু তাৎক্ষণিক একটি মব তৈরি করে কাউকে অপরাধী করা যায় না। শিকারি সাংবাদিকতার মধ্য দিয়ে মুহূর্তেই কাউকে অপরাধী করে ফেলা যায়। এখানে গোয়েন্দা সংস্থা, রাষ্ট্রীয় লোকজন এবং সংবাদপত্রের এক ধরনের সংযোগ কাজ করে। এটি দুইভাবে কাজ করে। একদিকে সে সমাজের ভাষাগুলোকে দমন করে, অন্যদিকে সমাজের ভাষাগুলোকে সে শিকার করে।

বাংলাদেশে শিকারি সাংবাদিকতার ম্যানিফেস্টো শুরু হয় ২০০৭ সালে। সে সময় শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে গ্রেপ্তার করার সময় আমরা শিকারি সাংবাদিকতা দেখেছি। পরে তা বিস্তৃত হতে পারেনি। কিন্তু মামুনুল হকের রিসোর্টকাণ্ড বা পরীমনির মাদককাণ্ডে তা পুনরায় প্রতিফলিত হয়েছে।

সাংবাদিকদের মধ্যে চাকরি হারানোর ভয় কাজ করে। কারণ বাংলাদেশে চাকরি ও সম্মান একসঙ্গে হারায়। এখানে কেউ চাকরি হারালে তাঁকে স্বাধীনতাবিরোধী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। ফলে সম্মান হারানোর ভয়ে সাংবাদিকরা তাঁর মালিকপক্ষের সঙ্গে সমঝোতা করেন।

যাঁরা গণমাধ্যমের মালিক, তাঁরাই রাষ্ট্র চালান। গত নির্বাচনে ১৮ জন গণমাধ্যমের মালিক অংশ নিয়েছেন এবং ১২ জন সংসদ সদস্য হয়েছেন।

মূলধারার গণমাধ্যমের আয় কমে যাওয়ার কারণে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সঙ্গে তাদের মধ্যে এক ধরনের নেক্সাস গড়ে উঠেছে। এই শক্তিশালী নেক্সাস শিকারি সাংবাদিকতার উত্থানে ভূমিকা রেখেছে।”

পুরো ক্লাসে পিনপতন নীরবতা। মশিউর বিপ্লবের ক্লাস মুগ্ধ হয়ে শোনে শিক্ষার্থীরা। শেষে প্রশ্নোত্তরের পালা। প্রশ্ন করতে পারবে পাঁচজন। কিন্তু হাত উঠেছে ২৫ জনের। কার প্রশ্ন নেবে, আর কারটা নেবে না। এ এক আরেক বিপত্তি!

যাক নেয়ামত স্যারই ঠিক করে দিলেন, কারা প্রশ্ন করবে।

: স্যার, আমি রুহিনা, জার্নালিজমে সিক্সথ সেমিস্টার। আমার প্রশ্ন হলো, সাংবাদিকরা কি সব সময় সত্য বলতে পারেন বা নিরপেক্ষ থাকতে পারেন? কারণ প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই তো কোনো না কোনো গোষ্ঠী বা দলের প্রতি একটা প্রচ্ছন্ন প্রীতি থাকে। আর সাংবাদিকরা তো এর বাইরে নয়।

: হ্যাঁ, আপনি ঠিক বলেছেন, রুহিনা। কিন্তু প্রকৃত সাংবাদিক হতে হলে অবশ্যই আপনার মধ্যে বিবেচনাবোধ থাকতে হবে। কোনো গোষ্ঠীর প্রতি আপনার ভালোবাসা থাকতে পারে, কিন্তু এই কারণে আপনি যদি সত্যকে লুকিয়ে ফেলেন, তাহলে আপনি মনে করবেন, এখনো আপনি প্রকৃত সাংবাদিক হয়ে উঠতে পারেননি। সত্যকে তুলে ধরার কাজ এমন কঠিন, সত্যটা নিজের বিরুদ্ধেও যেতে পারে, কিন্তু তখন আপনাকে নির্মোহ থেকে তা মানুষের জন্য সামনে উপস্থাপন করতে হবে।

রুহিনা সাপ্লিমেন্টারি প্রশ্ন করতে চায়। কিন্তু নেয়ামত স্যার থামিয়ে দেন।

: স্যার, খুব জরুরি আরেকটি বিষয়। এক মিনিট, প্লিজ।

: আচ্ছা, বলো।

: আপনি এত চমৎকার শুদ্ধ উচ্চারণ শিখলেন কিভাবে, বিপ্লব স্যার?

এমন প্রশ্ন শুনে হেসে দেন মশিউর বিপ্লব।

: দেখুন, চমৎকার উচ্চারণ পারি কি না, জানি না। তবে সব সময় চেষ্টা করি। আপনারাও চেষ্টা করুন পারবেন।

একের পর এক প্রশ্ন আসতে থাকে। এর মধ্যে বিপ্লবের ব্যক্তিগত বিষয়াদি নিয়েও অনেকে প্রশ্ন করেন। এক ঘণ্টার ক্লাস গিয়ে থামে আড়াই ঘণ্টায়।

 

৪.

রাত ১১টা। অফিস থেকে সবেমাত্র ফিরেছেন মশিউর বিপ্লব। আয়েশি ভঙিতে গা এলিয়ে দিয়েছেন বিছানায়। কেবলই ফোনটা নিয়েছেন হাতে। এর মধ্যেই রিংটোন।

: হ্যালো, স্লামালেকুম। কে বলছেন আপনি?

: আমি রুহিনা। চিনতে পেরেছেন?

: না তো।

: রুহিনা, আপনার রুহিনা।

: আমার রুহিনা মানে?

: কেন একদিন ফোন করেছিলাম আপনাকে। আপনি মাঝেমধ্যে কথা বলার অনুমতি দিয়েছিলেন। আমি জগন্নাথে পড়ি, জার্নালিজমে সেকেন্ড ইয়ারে…।

: ও আচ্ছা, গতকালই তো প্রশ্ন করলেন আমার ক্লাসে।

: যাক এবার তাহলে চিনতে পেরেছেন…।

: হ্যাঁ, হ্যাঁ…কিভাবে মনে রাখব, বলুন…এত ব্যস্ততা…যাক, কাল আপনার প্রশ্নটা ইউনিক ছিল…।

: ওয়াও, আমার প্রশংসা করলেন তাহলে…।

: হা হা হা…আপনাদের ডিপার্টমেন্ট কেমন চলছে, কেমন এনজয় করছেন জার্নালিজম ডিপার্টমেন্ট…?

: বেশ। আমার তো স্বপ্ন ছিল সাংবাদিকতা নিয়ে পড়ার…ঢাবিতে চেয়েছিলাম…হয়নি…।

: এখন যেখানে পড়ছেন, সেখানেই মন দিয়ে পড়ুন…।

: একটি ব্যক্তিগত প্রশ্ন করতে পারি?

: করুন।

: আপনি কি ম্যারিড?

: কেন? এই প্রশ্নের জবাব কি খুব প্রয়োজন?

: হ্যাঁ। জানতে চাই।

: কী করবেন জেনে?

: আহা, বলুন না…। এরপর বলছি…।

: আনম্যারিড…।

: বাহ্।

: কেন বাহ্?

: না, মানে ম্যারিড হলে তো আর এত সময় ধরে কথা বলতে পারতাম না আপনার সঙ্গে…।

: ও, তাই! তা প্রশ্নের উত্তর তো পেলেন…এখন কী হবে?

: এখন অনেক কিছুই হবে। আমি যাত্রাবাড়ীর মেয়ে। এখানে আমাদের আদি বসবাস। আমাদের যাত্রাবাড়ীর বাইরে আর কোনো গ্রামের বাড়ি নেই। আমার দাদার দাদা থেকে বসবাস শুরু হয়েছে। এখানে আমাদের পাঁচতলা নিজস্ব বাড়ি আছে। যাত্রাবাড়ী থানার মধ্যে আরো ৫০ বিঘা আবাদি জমি আছে আমাদের। আমার বাবার দুই কন্যা আমরা। আমি বড়। আর ছোটটা হাই স্কুলে পড়ছে। আমাদের দুজনের নামে ৫০ লাখ করে টাকা ফিক্সড ডিপোজিট করে রাখা আছে ব্যাংকে।

: ওরে বাবা, বিশাল ব্যাপার তো…।

: হ্যাঁ, বিশাল ব্যাপার। তবে এগুলো সব আপনার…।

: মানে কী?

: মানে, এগুলো সব আপনাকে দিয়ে দেব। এগুলো সব আপনার নিজস্ব সম্পত্তি হয়ে যাবে।

: এসব কী বলছেন? কিভাবে আমার হবে?

: আপনি তো অবিবাহিত।

: হ্যাঁ, তাতে কী হয়েছে?

: আপনি আমাকে বিয়ে করবেন। আমাদের সুন্দর একটি সংসার হবে। সন্তান হবে। আমার সম্পত্তি সব আপনার হবে। কোনো চাকরিবাকরি করতে হবে না। আপনি কেবল ক্রিয়েটিভ কাজ করবেন।

কথাগুলো এক নিঃশ্বাসে বলে চুপ হয়ে যায় রুহিনা। এ প্রান্তে বিপ্লবের কণ্ঠ শুকিয়ে কাঠ। কিংকর্তব্যবিমূঢ়! কী বলবেন তিনি! এ রকম করে সরাসরি এখন পর্যন্ত বিয়ের প্রস্তাব দেয়নি বিপ্লবকে। রুহিনা একদম চুপ হয়ে আছে। নীরবতা ভাঙতে হলো বিপ্লবকেই।

: হ্যালো।

: বলুন, শুনছি।

: এ রকম করে কি কেউ বিয়ের প্রস্তাব দেয়?

: তাহলে কিভাবে দেব? আমি আপনাকে পছন্দ করি, ভালোবাসি—সেটা আমি না বললে আর কে বলে দেবে?

: তাই বলে…।

: আমি কি দেখতে খুব খারাপ? অসুন্দর? কালো? কুিসত! তাহলে কেন বিয়ে করবেন না?

: আচ্ছা, আজকে রাখি তাহলে…।

: হ্যাঁ-না কিছুই বলবেন না?

: পরে আরেক দিন কথা বলব…।

ফোনটা বিপ্লবই কেটে দেন। আরো বারকয়েক কল করে রুহিনা। কিন্তু ফোনটা রিসিভ করেন না বিপ্লব।

 

৫.

রুহিনার সঙ্গে ওই দিনের পর আর কথা হয়নি। অনেকবার, প্রায় প্রতিদিনই দু-চারবার ফোন করলেও কোনো রেসপন্স করেননি বিপ্লব। এরই মধ্যে পেরিয়ে গেছে পাঁচ মাস। রুহিনার নামটাও প্রায় ভুলেই গেছেন।

আজ ১৮ জুলাই ২০২৪। সারা দেশে চলছে কোটাবিরোধী আন্দোলন। তুমুল আন্দোলন। রাজপথে রক্ত ঝরছে ছাত্র-জনতার। সকাল থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় অ্যাসাইনমেন্ট পড়েছে বিপ্লবের। সকাল থেকে এত এত ঘটনা কাভার করতে করতে ক্লান্ত। লাইভ সংযোগ, মিছিল কাভারেজ, ইন্টারভিউ; সকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা। অফিসের সব কাজ শেষ করে সন্ধ্যা ৭টায় বাসায় ফেরেন বিপ্লব।

চেনা বিছানায় গা এলিয়ে দেন। চোখ বুজতেই ঘুম। ঘুমের দেশে গিয়ে স্বপ্নের সঙ্গে সাক্ষাৎ।

‘সাংবাদিকতায় নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন মশিউর বিপ্লব। নোবেল মঞ্চে তিনি উপস্থিত। তাঁকে ঘিরে সারা বিশ্বের গণমাধ্যমের উচ্ছ্বাস। নোবেল পুরস্কারের প্রচলনের পর এই প্রথম একজন ব্যক্তিকে সাংবাদিকতায় নোবেল প্রাইজ দেওয়া হলো। মশিউর বিপ্লব মানুষের কল্যাণে সারা বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে বেড়িয়ে মানবিক সাংবাদিকতা করেছেন। তাঁর রিপোর্টিয়ে অনেক জটিল সমস্যার নিষ্পত্তি হয়েছে। রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান, কাশ্মীরের মানুষের মুক্তি লাভ, ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধ বন্ধ হয়েছে তাঁর রিপোর্টের কারণে। আর এসবের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ মশিউর বিপ্লবকে দেওয়া হচ্ছে নোবেল পুরস্কার।’

হঠাৎ একটি ফোনকল। স্বপ্নের রাজ্য থেকে ধড়ফড় করে সংবিৎ ফিরে পাওয়া। ঘুম ঘুম চোখে ফোনটা রিসিভ করেন বিপ্লব। ও প্রান্তে চিৎকার-চেঁচামেচি, হৈচৈ।

: হ্যালো…।

: হ্যালো, কে বলছেন…?

: ফোন করেছেন আপনি? আপনি কে বলছেন?

: আমি আসলে একজন আহত ব্যক্তিকে নিয়ে ঢাকা মেডিক্যালে এসেছিলাম…।

: তো সমস্যা কী বলুন…।

: যাত্রাবাড়ীতে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সংঘর্ষ হয়েছে। দুপুরে এ ঘটনা ঘটলে অনেক শিক্ষার্থী আহত হয়। আমার পাশে যিনি মিছিল করছিলেন, তাঁর বুকের বাঁ পাশে গুলি লাগে…। গুলি খেয়ে আহত হওয়ার পর তাঁকে আমরা হাসপাতালে নিয়ে আসি…। আপুটার সঙ্গে থাকা মোবাইল ফোনের ডায়ালে এই নম্বরে কল দেওয়া ছিল কয়েকবার। সে জন্য ফোন করেছি। আপনি কি তাঁর কিছু হন?

: আচ্ছা, মেয়েটার নাম কী?

: আমরা তাঁর ব্যাগে যে আইডি কার্ড পেয়েছি, তাতে লেখা রুহিনা ইয়াসমিন…।

: রুহিনা…

: আপনি চেনেন তাঁকে। তাঁর মা-বাবার নম্বর দরকার।

: কী হয়েছে ওর?

: কিছুক্ষণ আগে মারা গেছে রুহিনা…।

হাত থেকে মোবাইলটা পড়ে যায়। স্তব্ধ হয়ে যান বিপ্লব।

: রুহিনা আর নেই…। শহীদ হয়েছে?

 

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com