জেনেভা কনভেনশনের অনুচ্ছেদ অনুসারে, বেসামরিক কোনো কিছুকে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু করা যাবে না। এই ভিত্তিতেই আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলার জন্য দায়ী রুশ সামরিক কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন। এ ধরনের হামলা, আতঙ্ক ও মনোবল ভেঙে দেওয়ার উদ্দেশ্যে ইউক্রেনের শহর ও নগরগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র বর্ষণের ঘটনা যুদ্ধাপরাধের শামিল। এই সপ্তাহে ইরানকে বোমা মেরে ‘প্রস্তর যুগে’ ফিরিয়ে দেওয়ার ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুমকি বাস্তবায়িত হলে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে ঠিক একই নিয়ম প্রযোজ্য হবে।
আন্তর্জাতিক আইনের এই ধরনের মৌলিক নীতিগুলো কার্যকর করা জরুরি। কারণ ট্রাম্প ও তাঁর প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ যেন এক রক্তপিপাসু দুঃস্বপ্নের মধ্যেই কথা বলছেন। পেন্টাগন থেকে মৃত্যু ও ধ্বংসের আদেশ দেওয়ার ক্ষমতায় জঘন্যভাবে গর্ব বোধ করে হেগসেথ ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’কে ‘অধার্মিকদের দাঁত ভেঙে দেওয়া’র একবিংশ শতাব্দীর এক ধর্মযুদ্ধ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।
সামাজিক মাধ্যমে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক অকথ্য গালাগাল আগের সব কিছুকে ছাড়িয়ে গেছে। তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে বলেছেন, ইরান যদি হরমুজ প্রণালি জাহাজ চলাচলের জন্য ফের খুলে না দেয়, তাহলে ‘মঙ্গলবার হবে পাওয়ার প্লান্ট দিবস, আর সেতু দিবস… প্রণালিটা খুলে দাও, তোমরা সবাই উন্মাদ, তা না করলে তোমাদের জাহান্নামে পাঠানো হবে।’
এই গ্রীষ্মে স্বাধীনতা ঘোষণার ২৫০তম বার্ষিকী সামনে রেখে এ ধরনের ভাষা ট্রাম্পের পদ এবং তাঁর নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের জন্য কলঙ্কজনক। এটি যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক সুনাম ও নৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতাকে আরও ক্ষুণ্ন করে, যা বিনষ্ট করার জন্য তিনি ইতোমধ্যে অনেক কিছু করেছেন।
রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও ভালো হলে তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যরা ডেমোক্রেটিক সিনেটর ক্রিস মারফির পরামর্শ অনুসরণ করে তাঁকে অপসারণের জন্য সাংবিধানিক বিকল্পগুলো খতিয়ে দেখতেন। কিন্তু ট্রাম্প যে দল দিয়ে নিজেকে ঘিরে রেখেছেন, তাদের কাপুরুষোচিত সহযোগিতার কারণে সেই সম্ভাবনা ক্ষীণ।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই যুদ্ধ অবৈধ এবং যুদ্ধের বিধ্বংসী বিস্তার যেন না ঘটে, এই আশায় অপেক্ষা করা ছাড়া বাকি বিশ্বের আর কোনো উপায় নেই। আর যে ক্ষতি হতে পারে, তা অচিন্তনীয় ও ক্রমবর্ধমান পরিণতি ডেকে আনবে। ইরান প্রতিবেশী অঞ্চলের ভেতরে ও বাইরে নিজেদের হামলার পরিধি বাড়িয়ে পাল্টা জবাব দেওয়ার হুমকি দিয়েছে।
ইরানের প্রতিরোধ করার সামরিক সক্ষমতা নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার ব্যাপারে ট্রাম্পের দাম্ভিক দাবি কোনো ফাঁকা হুমকি নয়– হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনা তাই প্রমাণ করে।
একটি শক্তিশালী কৌশলগত পরিকল্পনা এবং কোনো আইনি যৌক্তিকতার অনুপস্থিতি উপলব্ধি করে ন্যাটো মিত্ররা যুদ্ধে অংশগ্রহণকে প্রত্যাখ্যান করে ট্রাম্পের নির্বুদ্ধিতার ব্যাপারে সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছে। ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে তাদের এখন আশা করতে হবে, মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই সর্বনাশা বাগাড়ম্বর আসলে যুদ্ধ থেকে দ্রুত বেরিয়ে আসার একটি প্রকৃত পথ খোঁজারই ছদ্মবেশ।
ট্রাম্প তাঁর ভয়াবহ সতর্কবার্তার পর দাবি করেছেন, মঙ্গলবারের সর্বশেষ সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই ইরানের সঙ্গে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তির ‘বেশ সম্ভাবনা’ রয়েছে। অথচ এর কয়েক ঘণ্টা পরেই ইসরায়েল ইরানের বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ পেট্রোকেমিক্যাল প্লান্টে বোমা হামলা চালিয়েছে।
মনে হচ্ছে, ট্রাম্প নিজের খেয়ালখুশি মতো কাজ করছেন। সোমবার হোয়াইট হাউসে এক সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে তিনি ও হেগসেথ দক্ষিণ ইরানে গুলি করে ভূপাতিত করা একটি মার্কিন যুদ্ধবিমানের নিখোঁজ ক্রু সদস্যের নাটকীয় উদ্ধার নিয়ে দীর্ঘক্ষণ ধরে আত্মশ্লাঘা প্রকাশ করেন। আগামী কয়েক ঘণ্টায় হাজার হাজার মানুষের জীবন এবং বিশ্ব অর্থনীতির তাৎক্ষণিক ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে এমন একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের খামখেয়ালির ওপর, যিনি কেবল তাঁর আত্মগরিমার প্রবৃত্তি এবং উপদেষ্টাদের তোষামোদপূর্ণ প্রতিধ্বনি দ্বারা পরিচালিত হন।
গার্ডিয়ানের সম্পাদকীয়; ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম