অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট হিসেবেও কাজ করে মেলাটোনিন। দৈহিক ও মানসিক চাপের হরমোন কর্টিসল কমাতে এটি কাজ করে।
চেরি, কাঠবাদাম, কাজুবাদাম, ডিম, মাছ, দুধ ও দুধের তৈরি খাবার, ওটস, ডালিম, কুমড়ার বীজ, সূর্যমুখীর বীজ, টমেটো এবং টক দই মেলাটোনিন উৎপাদন বৃদ্ধি করে। খাদ্যতালিকায় এগুলো রাখলে ভালো ঘুম হবে। এসব খাবার কর্টিসোল হরমোনের মাত্রাও নিয়ন্ত্রণে রেখে পরোক্ষভাবে ঘুমের মান বাড়ায়।
ঘুম হয় গাঢ়। রাতে ঘুম কম হলে কর্টিসোল ও মেলাটোনিন হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হয়। তখন বেড়ে যায় ডায়াবেটিস, হৃদরোগ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিপাকতন্ত্রের রোগের ঝুঁকি।
মূত্রতন্ত্র নিয়ন্ত্রণ
কিডনি কতটুকু পানি নিঃসরণ করবে, সেটি নিয়ন্ত্রণ করে অ্যান্টিডাইইউরেটিক হরমোন। এটি রাতে নিঃসৃত হয়। তাই রাতে প্রস্রাবের জন্য ঘুম ভেঙে উঠতে হয় না। যদি এই হরমোন উৎপাদন ব্যাহত হয়, তাহলে বারবার রাতে ঘুম ভেঙে প্রস্রাব করতে হয়। এই হরমোনের নিঃসরণ অনেকটাই খাদ্যাভ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। ইলেকট্রোলাইট সমৃদ্ধ খাবার, বিশেষ করে বিভিন্ন রকমের ফলমূল অ্যান্টিডাইইউরেটিক হরমোনের নিঃসরণ বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে। ঘুমের ব্যাঘাত কমাতে বিকেলের পর অতিরিক্ত চা, কফি ও তরমুজ খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। পানিও পান করতে হবে পরিমিত মাত্রায়।
মানসিক শান্তি
মানসিক স্থিতিশিলতা আনে এবং ভালো ঘুমাতে সাহায্য করে ডোপামিন। ডোপামিন নিঃসরণেও খাবারের ভূমিকা আছে। আমাদের অন্ত্রে স্বাস্থ্যকর ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা যত বাড়বে, ডোপামিনের নিঃসরণও তত বাড়বে। তাই অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা বাড়াতে স্বাস্থ্যকর চর্বিসমৃদ্ধ খাবার, ফার্মেন্টেড ফুড এবং আঁশযুক্ত খাবার খেতে হবে। তৈলাক্ত মাছ, অলিভ অয়েল, টক দই, পান্তা, শাক-সবজি, সামুদ্রিক মাছ ইত্যাদি খাওয়া যেতে পারে। বাদ দিতে হবে ভাজাপোড়া, প্রক্রিয়াজাত ও প্যাকেটজাত খাবার। হাসিখুশি থাকলে, নিয়মিত বেড়াতে গেলে এবং এমনকি পছন্দের পোশাক পরলেও ডোপামিনের নিঃসরণ বাড়ে। মিষ্টিজাতীয় খাবার দ্রুত ডোপামিন নিঃসরণ করলেও আবার এর নিঃসরণ খুব দ্রুত কমিয়েও দেয়, যা আমাদের শরীরকে অস্থির করে তোলে। তাই মিষ্টিজাতীয় খাবার কম খেতে হবে। ঘুমাতে যাওয়ার আগে মিষ্টি পানীয় পান করবেন না।
সেরোটোনিন বাড়ানো জরুরি
ঘুমের ওপর সেরোটোনিন হরমোনের সরাসরি প্রভাব রয়েছে। দেহের ৯০ শতাংশ সেরোটোনিন উৎপন্ন হয় অন্ত্রের এন্টেরোক্রমাফিন কোষের এন্টেরিক নার্ভাস সিস্টেম থেকে। এ জন্য অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখা বেশি জরুরি। অন্ত্রের মাসল মুভমেন্টও সেরোটোনিন নিঃসরণে সাহায্য করে। ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড, আঁশসমৃদ্ধ খাবার, ভিটামিন বি-১২ এবং ভিটামিন ডি সেরোটোনিনের নিঃসরণ বৃদ্ধি করে। এ ছাড়া অ্যান্টি-ইনফ্লামেটরি গুণসমৃদ্ধ খাবার; যেমন—দারচিনি, লবঙ্গ, হলুদ, ফ্ল্যাক্স সিড ও চিয়া সিড খাবার তালিকায় যোগ করতে হবে।
গড়ে তুলুন স্বাস্থ্যকর অভ্যাস
► গ্যাস্ট্রিকের ওষুধসহ অন্যান্য ওষুধ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া খাওয়া যাবে না।
► লাল আটা, ফাইবার সমৃদ্ধ কার্বোহাইড্রেট ও ফার্মেন্টেড ফুড; যেমন—টক দই খাওয়ার অভ্যাস করতে হবে।
► প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০ মিনিট ব্যায়াম করতে হবে।
► সপ্তাহে অন্তত দু-তিন দিন সামুদ্রিক মাছ খান।
একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য কমপক্ষে প্রতিদিন ছয় থেকে আট ঘণ্টা ঘুম জরুরি। ঘুম অবশ্যই হতে হবে রাতের আঁধারে। আমাদের শরীরের একটি হরমোনের কর্মকাণ্ড অন্য আরেকটি হরমোন দ্বারা প্রভাবিত হয়। তাই দেখা যায়, শরীরে যেকোনো একটি হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হলে এর প্রভাবে অন্য অনেক হরমোনের ভারসাম্যও নষ্ট হতে পারে।
লেখক : জ্যেষ্ঠ পুষ্টি কর্মকর্তা
চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক জেনারেল হাসপাতাল