এক মাস সিয়াম সাধনার পর ঈদের আনন্দ আসে ভিন্ন এক আবহে। সারা মাস রোজা রাখার ফলে এক ধরনের অভ্যাসে ছিলেন। এবার আনন্দ, উল্লাস উদযাপনের সময়। দীর্ঘ সময় রোজা রাখার ফলে মানুষের শরীরে কিছু গুরুত্বপূর্ণ শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তন ঘটে। নিয়মিত নির্দিষ্ট সময়ে খাবার গ্রহণ, দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা এবং তুলনামূলক কম ক্যালরি গ্রহণের কারণে শরীর এক ধরনের বিপাকীয় অভিযোজনে অভ্যস্ত হয়ে যায়। এই সময়ে ইনসুলিনের কার্যকারিতা কিছুটা সংবেদনশীল হয়ে ওঠে এবং পাচনতন্ত্রও অপেক্ষাকৃত বিশ্রাম পায়। তাই রোজা শেষ হওয়ার পর হঠাৎ অতিরিক্ত তেল-চর্বিযুক্ত খাবার, মিষ্টি বা লাল মাংস খেলে শরীরের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এতে গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা, ডায়রিয়া, রক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধি এবং হৃদযন্ত্রের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই ঈদের আনন্দের সঙ্গে খাদ্যাভ্যাসেও সচেতনতা জরুরি।
রোজার সময় দীর্ঘক্ষণ না খাওয়ার কারণে শরীরের ইনসুলিন প্রতিক্রিয়া কিছুটা পরিবর্তিত হয়। এই অবস্থায় হঠাৎ বেশি মিষ্টি বা উচ্চ ক্যালরিযুক্ত খাবার খেলে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে এক মাস অপেক্ষাকৃত হালকা খাবার গ্রহণের ফলে পাচনতন্ত্রের এনজাইম কার্যক্রমও কিছুটা ধীর হয়ে যায়। ফলে হঠাৎ করে অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত বা ভারী খাবার গ্রহণ করলে হজমে সমস্যা দেখা দিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে পেট ফাঁপা, অম্বল বা অস্বস্তির মতো সমস্যাও দেখা যায়।
এছাড়া রোজার সময় শরীরের বেসাল মেটাবলিক রেট কিছুটা কমে যেতে পারে, যার অর্থ শরীর তখন শক্তি সাশ্রয়ী অবস্থায় থাকে। এই সময় অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণ করলে তা সহজেই চর্বি হিসেবে জমা হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। তাই ঈদের দিনে খাবারের পরিমাণ ও ধরন সম্পর্কে সচেতন থাকা প্রয়োজন।
ঈদের দিন সকালে খুব ভারী খাবার দিয়ে দিন শুরু না করাই ভালো। পুষ্টিবিদদের মতে, দিনের শুরুতে হালকা কিন্তু পুষ্টিকর খাবার খাওয়া উচিত। একটি সেদ্ধ ডিম, এক কাপ টক দই, সামান্য ওটস বা ফল এবং চিনি ছাড়া লেবু পানি শরীরকে প্রয়োজনীয় শক্তি জোগাতে পারে। এতে রক্তে শর্করার মাত্রা তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকে এবং হজমের সমস্যাও কম হয়।
দুপুরের খাবারের ক্ষেত্রে সুষম খাদ্য নির্বাচন করা গুরুত্বপূর্ণ। পাতে পর্যাপ্ত সবজি ও সালাদ রাখা উচিত, কারণ এগুলো আঁশ ও ভিটামিনের ভালো উৎস। পাশাপাশি পরিমিত পরিমাণে প্রোটিন হিসেবে মুরগি, মাছ বা চর্বিহীন মাংস রাখা যেতে পারে। কার্বোহাইড্রেট হিসেবে অল্প পরিমাণ ভাত বা পোলাও গ্রহণ করা যেতে পারে। লাল মাংসের ক্ষেত্রে পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি, কারণ এতে চর্বির পরিমাণ তুলনামূলক বেশি থাকে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত তেল ব্যবহার না করাও গুরুত্বপূর্ণ। দিনের বিভিন্ন সময়ে মিষ্টি বা ডেজার্ট খাওয়ার প্রবণতা থাকে।
তবে পুষ্টিবিদরা পরামর্শ দেন, মিষ্টি খাবার সীমিত পরিমাণে খাওয়া উচিত এবং একসঙ্গে মিষ্টি ও কোমল পানীয় না খাওয়াই ভালো। এতে শরীরে অতিরিক্ত চিনি প্রবেশের ঝুঁকি কমে। যদি সারাদিন তুলনামূলক বেশি ক্যালরিযুক্ত খাবার খাওয়া হয়, তাহলে রাতের খাবার হালকা রাখা ভালো। এ সময় বেশি করে সবজি, সালাদ এবং মাছ বা মুরগির মতো সহজপাচ্য প্রোটিন গ্রহণ করা যেতে পারে। খাবারের পর কিছুটা শারীরিক সক্রিয়তাও গুরুত্বপূর্ণ। ২০ থেকে ৩০ মিনিট হাঁটা হজম প্রক্রিয়াকে সহায়তা করে এবং রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত পানি পান করাও জরুরি। যাদের ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা স্থূলতার সমস্যা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে খাবার নির্বাচন আরও সতর্কতার সঙ্গে করা প্রয়োজন।
লাল মাংস ও তেলে ভাজা খাবার কম খাওয়া এবং নিয়মিত ওষুধ গ্রহণ করা উচিত। প্রয়োজনে রক্তে শর্করার মাত্রাও পরীক্ষা করা যেতে পারে। ঈদ আনন্দ ও আতিথেয়তার উৎসব হলেও স্বাস্থ্য সচেতনতা বজায় রাখা সমান গুরুত্বপূর্ণ। পরিমিত ও সুষম খাদ্য গ্রহণ এবং নিয়মিত শারীরিক সক্রিয়তা বজায় রাখলে ঈদের আনন্দ যেমন উপভোগ করা যায়, তেমনি সুস্থ থাকাও সম্ভব। মনে রাখতে হবে, সুস্থ শরীরই আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ।
[পুষ্টিবিদ, আলোক হাসপাতাল লি]