সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০৬:৪৬ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

সিদ্ধার্থ নাটকে নওশাবা আহমেদ

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ১৯ বার পড়া হয়েছে
‘সিদ্ধার্থ’ নাটকে নওশাবা আহমেদ

একটি নাটকের কাছে মানুষের চাওয়া কোথায় এসে থামে? তৃপ্তি বা মধুর অতৃপ্তির কাছে এসে? শিক্ষা বা বিনোদনে? নাকি দেখার চোখ তৈরির কাছে এসে, শোনার কান তৈরির কাছে গিয়ে। তর্কে জেতার শক্তি জেতার পর, সুন্দরের ধারণা নির্মাণের পর, কদর্যের ধারণা পুনর্নির্মাণের পর। নাকি নির্মাণ বা অবিনির্মাণের তাড়নার কাছে এসে। কখন থমকায়? উত্তর নেই। সবশেষে যে তাড়নার কথা বলা হলো, সেটি কী? দর্শকের মনে এমন মনোভাব জন্মানো; যা চলছে আগের কাঠামো ধরে, তা ঠিক চলছে না। একটু বদলে আরও লক্ষ্যের কাছাকাছি নিই একে, তাতে যদি মোক্ষের কাছে যাওয়া যায়। কিংবা এমন ভাবা যে, চলমান কাঠামো একেবারেই রদ্দি, চলো একে পুরো বর্জন করে ভেঙে গড়ি।
প্রতিটিই সত্য। তবে দর্শকের নেওয়ার ক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল। দেওয়ার ক্ষমতার মুখাপেক্ষী।

নাট্যদল আরশিনগরের উপস্থাপনায়, রেজা আরিফের নির্দেশনায় নির্মিত ‘সিদ্ধার্থ’ দর্শকের চোখে জল এনেছে। অভিনেতা-অভিনেত্রীদের চোখেও। ২৬ জানুয়ারি সন্ধ্যা ৭টার পর শুরু শো শুরু হয়ে দুই ঘণ্টারও বেশি সময় পর যখন শেষ হলো, শিল্পকলা একাডেমির বাইরে ঘন শীতের রাত। ভেতরে মনের দিক থেকে উষ্ণ হয়ে ওঠা মানুষগুলো কি আরও প্রেমময় তখন? ১৯১৯ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সায়াহ্নে স্বেচ্ছায় যুদ্ধে যোগ দিয়েও ফিরে আসা হেরমান হেস যখন নতুন বৌদ্ধিক বোঝাপড়ায়, সজল চোখে, শব্দে, বাক্যে সিদ্ধার্থকে আঁকছেন, তাঁর মনের তখনকার নির্মল অনুভূতি আরশিনগরের পাত্র-পাত্রীগণ দর্শক পর্যন্ত বয়ে এনেছিলেন।

সিদ্ধার্থের নির্মাণে কি ‘অবিনির্মাণও’ কি ধরা পড়ে না? মঞ্চে এইসব অবিনির্মাণই কিন্তু মূল সার্থকতা। এ নাটক সার্থকতা দিয়ে শুরু। দর্শক চমকে গেছে দেখতে পেয়ে, সিদ্ধার্থ একজন ‘নারী’। পুরুষ চরিত্রে নারী অভিনয়শিল্পী কি ‘প্রতীক’ হয়ে এলেন? প্রথম দৃশ্যের গৃহত্যাগী মুহূর্তে, সিদ্ধার্থ তখনও নবীন, জীবন্ত, সম্ভাবনার শক্তিতে সতেজ, ভবিষ্যতের রঙে আবৃত। প্রতিজ্ঞায় দৃঢ়, বাবা-মায়ের আশ্রয়লালিত ও ললিত, প্রশ্ন তাকে উন্মাতাল করলেও উত্তর খোঁজার অস্থির অভিযান তখনও শুরু হয়নি, জগতের রূঢ়তা তাকে স্পর্শ করেনি, সুতরাং কমনীয়, নমনীয়, শুভ্র পৃষ্ঠা। সেই মুহূর্তের সিদ্ধার্থ ‘কৃষ্ণ-অভিমুখী’ রাধাভাব যুক্ত! জীবনের ঊষাকালের সিদ্ধার্থকে রাধারূপী দেখানোকে আমি বিপ্লব জ্ঞান করেছি। সেইসঙ্গে আরশিনগর দলটি যে এখানে লালনের মতোনই নদীর রহস্য উন্মোচন করবে, প্রথম সিদ্ধার্থ চরিত্রে নারী এর আভাসও হয়তো দেয়। মোহিত হয়েছি নিরীক্ষার সাহসের এমন সততায়, প্রতীকধর্মিতায়। এখানেই মঞ্চের শক্তি!

সিদ্ধার্থ নাটকে মোট চারজন ‘সিদ্ধার্থের’ ভূমিকায় অভিনয় করেছেন। সিদ্ধার্থের জীবনের একেক মানসিক স্তরের প্রতীক হয়ে প্রত্যেকের আবির্ভাব, অভিযান, বিকাশ, পরিণতি–আলোর ঝর্ণার নিচে নাচে, সংগীতে, যোগে, বিনিয়োগে অনবদ্য! যে পার্শ্বচরিত্রেরা নদী, ঢেউ, কালের স্রোত হয়েছেন, তৈরি করেছেন বাজার, অতিপ্রাকৃত আবহ, সময়ের চোখ। যিনি কমলা হয়েছেন, বাসুদেব হয়েছেন, গোবিন্দ ও পুত্র হয়েছেন। শরীরগুলোকে যারা ছুড়ে দিয়েছেন, লুফে নিয়েছেন। যে যন্ত্রীরা পর্দার আড়াল থেকে রক্তে নাচ তোলা সুর তুলেছেন, এমনকি যাদের ভূমিকা এখানে অনুল্লিখিত থাকল–প্রত্যেকে সিদ্ধার্থকে লালন করেছিলেন বিষ্ণুর মমতায়। সিদ্ধার্থ নাটকটির এমন বহু অনুষঙ্গ আছে, প্রতিটি দীর্ঘ আলাপ দাবি করে। শুধু নদীর প্রসঙ্গ আনা যাক। দারাশুকোর পারসিক অনুবাদের পথ ধরে লাতিন ভাষায় দুপেরঁর মাধ্যমে ইউরোপে উপনিষদ এসেছিল উনিশ শতকের ঊষাকালে। কিন্তু সরাসরি সংস্কৃত থেকে প্রথম জার্মানিতে পাউল ডায়সেনের হাতে ভাষায় অনূদিত হয় যখন, তখন ১৮৯৭। এবং উপনিষদ অনুবাদের পরের ও আগের জার্মান ভাবনাচিন্তার জগৎ এক নয় (নদীর প্রসঙ্গ ডাকতে গিয়ে উপনিষদ এলো)। উপরন্তু হেরমান হেস সাধক পরিবারের সন্তান। যাদের অবতার যিশুর ওপর বুদ্ধের সরাসরি প্রভাব। হেরমান হেসের সঙ্গে ভূ-ভারতের সম্পর্ক জন্মান্তরের, তাঁর মায়ের জন্ম ভারতে। এতো পথ হাঁটা ছিল বলেই কি হেস জেনেছেন, বুঝেছেন, অনুভব করেছিলেন এ মাটির নদীর দর্শন, এ ভূখণ্ডের জলের শপথ? নদী গন্তব্য থেকে বিপথগামী হতে দেয় না তাদের, প্রকৃত অর্থেই যারা পথের সন্ধান করে। সত্যিই যারা সৎ ও সত্যান্বেষী, কৌতূহলী। যারা দুঃখী কিন্তু অধৈর্য নয়। এবং নদী শোনায় জলচক্রের বাণী–সব কিছু ফিরে আসে। সিদ্ধার্থ নাটকে নদী এতো অনুপম রূপ ও রূপকে এসেছে বারবার যে একে কখনও মা গঙ্গা, কখনও বাবা রাইন বলে মনে হয়।

সাধকের জীবন সমুদ্রগামী নদীর মতোন। সিদ্ধার্থ দেখিয়েছে যে জীবন বুদ্ধ যাপন করেননি, সেটিও মোক্ষের দিকে গেছে। বুদ্ধ কিছু তর্কের মীমাংসা হবে না বলে ঘোষণা দেওয়ার পরও, তর্কগুলো চলছে। কারণ বুদ্ধ এখন এক পুণ্যপণ্য। পুণ্য যখন পণ্যধর্ম পায়, তখন ধর্ম ও অধর্ম অভিন্ন ভাষায় ও কর্মে কথা বলে। ঈশ্বর আছেন কী নেই, এই উত্তরের মীমাংসা হবে না। এই বলে, বুদ্ধ ফিরলেন মানুষের কাছে। আর মানুষ? মনুষ্যত্বকে ঠেলে দিয়ে গেল, যেখানে বুদ্ধ নিষ্প্রাণ প্রতিমূর্তি। বুদ্ধ বলেছিলেন, প্রত্যেক মানুষ বুদ্ধ হতে পারে। মানুষ ভুলে গেছে সেই কথা। হেরমান হেস, তাঁর পদাঙ্কে রেজা আরিফ দেখিয়েছেন গৌতম বুদ্ধের বোধি লাভের বিকল্প আখ্যান। উপন্যাস ও নাটকের চরিত্র যে সিদ্ধার্থ, হ্যাঁ তিনি বুদ্ধ নন, তবু তিনি বুদ্ধ। যে জীবন গৌতম যাপন করেননি, সিদ্ধার্থ সেই পথে এগিয়েছে সিদ্ধি পেয়েছে। নির্বাণের বিকল্প পথ দেখায় ‘সিদ্ধার্থ’। এবং দুই পথের দুই পথিকের নাম একত্রে উচ্চারিত হলে দাঁড়ায় সিদ্ধার্থ গৌতম, অর্থাৎ বুদ্ধ। যে নিবেদন জাফর আলম তাঁর করা অনুবাদে দিয়েছিলেন, নাটকের সংলাপের বিশ্বস্ততায় তার যথার্থ অনুগামী নিবেদনের পরিচয় দিয়েছে আরশিনগর।
আমাদের মঞ্চনাটক বিশ্বমানের–‘সিদ্ধার্থ’ এই মতের প্রতিনিধিত্ব করে। এবার সংলাপের জড়তা, অতিঅভিনয়ের জড়োয়া ত্যাগ করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেওয়া যাক।

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com