সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১১:২২ পূর্বাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

ঊনসত্তরের অভ্যুত্থান ও আন্তত্যাগ

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: বুধবার, ২১ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৪৫ বার পড়া হয়েছে

আজ থেকে ঠিক পঞ্চাশ বছর আগে উত্তাল ১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারি ছাত্রদের ১১ দফা আন্দোলনের সূচনালগ্নে স্বৈরাচার আইয়ুবশাহীর পুলিশের গুলিতে আসাদ নিহত হন। আসাদ ছিলেন বাম চিন্তাধারায় বিশ্বাসী একজন সক্রিয় রাজনৈতিক নেতা ও আন্দোলনকর্মী। ছাত্র আন্দোলনের পাশাপাশি তিনি কৃষকদের মাঝেও কাজ করতেন। ১৯৬৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর মওলানা ভাসানী সারা পূর্ব বাংলায় হাট হরতাল আহ্বান করেন। প্রায় সারা দেশেই হাট হরতাল পালিত হয়। অনেক হাটেই হরতাল পালনকারীদের সঙ্গে পুলিশের কমবেশি সংঘর্ষ হয়। সবচেয়ে বড় সংঘর্ষ হয় নরসিংদী জেলার মনোহরদীতে। পুলিশের গুলিতে পাঁচজন আন্দোলনকারী নিহত হন এবং আসাদ মাথায় আঘাতপ্রাপ্ত হন।

সে সময় প্রত্যন্ত অঞ্চলের সঙ্গে ঢাকার যোগাযোগ সহজ ছিল না, কোনো খবর পেঁৗঁছাতে হলে সরাসরি ঢাকায় আসতে হতো। পুলিশের হত্যাকাণ্ডের খবর ঢাকার পত্রিকায় পৌঁছানোর জন্য আহত আসাদ সাইকেলে চেপে ঘোড়াশাল পৌঁছান এবং সেখান থেকে ট্রেনে ঢাকা আসেন। শেষ পর্যন্ত আসাদ দৈনিক পাকিস্তানের সাংবাদিক নির্মল সেন ও সাখাওয়াত আলী খানের কাছে মনোহরদীর হাতিরদিয়ায় পুলিশের নির্মম বর্বরতার ঘটনা তুলে ধরেন। এই ঘটনার মাত্র ২২ দিন পরে ঢাকায় আন্দোলনরত অবস্থায় পুলিশের গুলিতে আসাদ নিহত হন। নির্মল সেন পরবর্তী সময়ে লিখেছিলেন হত্যাকাণ্ডের সংবাদ দিতে এসে আসাদ হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন।

আটষট্টির ডিসেম্বর থেকেই তিনটি ছাত্র সংগঠন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন), পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া) এবং পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ আইয়ুবশাহীর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ ছাত্র আন্দোলন গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেয়। তখন ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন যথাক্রমে আবদুর রউফ ও খালেদ মোহাম্মদ আলী, ছাত্র ইউনিয়নের (মতিয়া) সভাপতি সাইফুদ্দিন আহমেদ মানিক, সাধারণ সম্পাদক সামসুদ্দোহা আর ছাত্র ইউনিয়নের (মেনন) সভাপতি মোস্তফা জামাল হায়দার ও সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল্লাহ। মাহবুব উল্লাহর নামে মামলা থাকায় সে আত্মগোপনে ছিল। আমি ছিলাম সেই কমিটির সহ-সভাপতি ও দীপা দত্ত সহ-সম্পাদক। ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের (মতিয়া) সঙ্গে আলোচনার সময় ছাত্র ইউনিয়নের (মেনন) পক্ষে মোস্তফা জামাল হায়দারের সঙ্গে দীপা দত্ত ও আমি উপস্থিত থাকতাম। তাছাড়া ‘ডাকসুর’ পক্ষে উপস্থিত থাকতেন সহ-সভাপতি তোফায়েল আহমেদ (ছাত্রলীগ) ও সাধারণ সম্পাদক নাজিম কামরান চৌধুরী (এনএসএফ)। নাজিম কামরান চৌধুরী যুক্ত থাকলেও এনএসএফ তখনো সাংগঠনিকভাবে আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়নি।

যৌথ আন্দোলনের দাবি নিয়ে আলোচনার সময় ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে প্রস্তাব দেওয়া হয়, ছাত্রদের কর্মসূচিতে ছয়টা দফা থাকতে হবে। কিন্তু আমাদের বক্তব্য ছিল, ছাত্রদের দাবিও ছয় দফা হলে সবাই ভাববে এটা বুঝি আওয়ামী লীগেরই ছয় দফা। আগে দাবির বিষয়গুলো নির্ধারণ করতে হবে। পরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে দফা কয়টা হবে। দাবি নির্ধারণ করাও খুব সহজ কাজ ছিল না। অনেক আলোচনার পর ছাত্রলীগ প্রস্তাব দেয়, আওয়ামী লীগের ‘ছয় দফা’ ছাত্রদের দাবির একটা দফা করা হলে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী একটা দাবি গ্রহণ করা যেতে পারে। শেষ পর্যন্ত যে এগারো দফা দাবিনামা গৃহীত হয়, তার তিন নম্বর দফাটি ছিল আওয়ামী লীগের ‘ছয় দফা’ সংক্রান্ত এবং দশ নম্বর দফায় ছিল সিয়াটো, সেন্টো, পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তি বাতিলের কথা। বহু আলোচনার ভিত্তিতে ছাত্রদের এগারো দফা পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়।

সদ্য প্রণীত এগারো দফার ব্যাখ্যা ও ছাত্র আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্যে ১৪ জানুয়ারি ত্রিদলীয় ছাত্র কর্মিসভা অনুষ্ঠিত হয় তখনকার কলা ভবনের মধুর ক্যান্টিনের সামনের মাঠে। এই ছাত্র সভাতেই ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ তাদের এগারো দফা কর্মসূচি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে। সভায় সিদ্ধান্ত হয় এগারো দফা বাস্তবায়নের জন্য প্রথম সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল হবে ১৭ জানুয়ারি। তখন ১৪৪ ধারা জারি ছিল। আমরা ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে মিছিল বের করার পক্ষে ছিলাম। বেশ কিছুক্ষণ পুলিশের সঙ্গে ছাত্রদের খণ্ড খণ্ড সংঘর্ষ চলে। হঠাৎ পুলিশ টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে। এর আগে টিয়ার গ্যাসের যন্ত্রণার অভিজ্ঞতা আমাদের ছিল না। ঘণ্টাখানেক পরে পরিবেশ শান্ত হয়। তখন সিদ্ধান্ত হয় বিকেলে পরবর্তী কর্মসূচির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

১৮ জানুয়ারি আবার কলা ভবনে সমাবেশ ও জঙ্গি মিছিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সকাল থেকেই বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পাড়া-মহল্লা থেকে ছাত্ররা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনে জমায়েত হতে থাকে। সবার মধ্যেই বেশ জঙ্গিভাব, অনেকের হাতেই লাঠি। পুলিশও প্রস্তুত হয়ে কলা ভবন ঘিরে রেখেছে। সামনের রাস্তা দিয়ে গরম ও রঙিন পানি ছিটানোর গাড়ি টহল দিচ্ছে। প্রথম দফায় আমরা মিছিল বের করতে ব্যর্থ হই। তখন ছাত্ররা তিন অংশে বিভক্ত হয়ে তিন দিক থেকে মিছিল বের করার চেষ্টা চালায়। শেষ পর্যন্ত পুলিশের অবরোধ ভেঙে আমরা মিছিল বের করতে সক্ষম হই। অবশ্য পুলিশের জল কামানের কারণে আমাদের সবার জামাই লাল হয়ে যায়। ১৯ জানুয়ারি রোববার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ। সেদিন প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একটা মিছিল বের হয়। মিছিলের ওপর গুলি হলে আবদুল হক নামে একজন নিহত হন।

২০ জানুয়ারি আবার সমাবেশের কর্মসূচি নেওয়া হয়। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সূচনালগ্নে এক অবিস্মরণীয় দিন ২০ জানুয়ারি। সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনে এক বিশাল সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সভা শেষে ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে আমরা মিছিল বের করি। মিছিলটা কলা ভবন থেকে বের হয়ে মেডিকেল কলেজের সামনে দিয়ে যখন চাঁনখারপুল পার হচ্ছে, তখন হঠাৎ প্রচুর সংখ্যক পুলিশ মিছিলের মাঝখানে আক্রমণ চালায়। ফলে মিছিলটা দুই ভাগে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সামনের অংশ চাঁনখারপুল পার হয়ে নাজিমুদ্দিন রোড ধরে পুরান ঢাকার দিকে এগিয়ে যায়। বাকি অর্ধেক মেডিকেল কলেজের সামনে অবস্থান নেয়। এই অংশেই আসাদ ছিল, আমিও ছিলাম।

আমরা মেডিকেল কলেজের মধ্যে অবস্থান নিয়ে পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট ছুড়তে থাকি এবং আবার মিছিল বের করার চেষ্টা চালাই। পুলিশও পাল্টা ধাওয়া করে। ঘণ্টাখানেক ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলতে থাকে। এ অবস্থায় খালেদ মোহাম্মদ আলী ও আমি সিদ্ধান্ত নিই যে, যেকোনো অবস্থাতেই আমাদের মিছিল বের করতে হবে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সবাইকে জড়ো করে আমরা মেডিকেল কলেজ থেকে বের হয়ে পুলিশের বেষ্টনীর দিকে ধেয়ে যাই। তখন আসাদ আমার পাশেই ছিল। পুলিশের ওপর এই হঠাৎ আক্রমণ আর আক্রমণকারীদের জঙ্গিরূপ দেখে পুলিশ পিছু হটতে বাধ্য হয়। আমরা যখন প্রায় পুলিশের কাছাকাছি চলে এসেছি, তখন হঠাৎ কয়েকটা গুলির শব্দ শুনতে পাই। দৌড়ানো অবস্থায়ই দেখলাম আসাদ মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে। আসাদের মৃত্যুর খবর বিদ্যুৎগতিতে সারা ঢাকা শহরে ছড়িয়ে পড়ে। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই মেডিকেল কলেজের ভেতরে-বাইরে জনতার ঢল নামে। এ সময় ছাত্র ইউনিয়নের (মেনন) পক্ষ থেকে প্রথম উচ্চারিত হয় এক নতুন সেøাগানÑ ‘আসাদের মন্ত্র, জনগণতন্ত্র’।

বিকেল তিনটায় মেডিকেল কলেজের সামনে থেকে এক বিশাল নগ্নপদ শোক মিছিল শহর প্রদক্ষিণ করে। এই মিছিলের প্রথম সারিতেই ছিল দীপা দত্ত। পরদিন প্রায় সকল দৈনিক পত্রিকাসহ দৈনিক আজাদ-এর প্রথম পৃষ্ঠায় এই মিছিলের একটা ছবি ছাপা হয়েছিল। মিছিল শেষ করে আমি আর জামাল ভাই ফিরে এলাম মেডিকেল কলেজে। সে সময় ঢাকা মেডিকেল কলেজ ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি ছিলেন ডা. রুহুল হক এবং সাধারণ সম্পাদক ছিলেন ডা. আশিক। ডা. আশিক আমাদের জানালেন, তাদের কাছে খবর এসেছে, আর্মি মেডিকেল কলেজে ঢুকে আসাদের মৃতদেহ নিয়ে যাবে। সে জন্য তারা আসাদের মৃতদেহ লুকিয়ে ফেলেছে। রাত বারোটার দিকে ঠিকই আর্মি এসে তল্লাশি চালায়। কিন্তু তারা আসাদের মৃতদেহ খুঁজে পায়নি। পরদিন ভোরে আসাদের বড় ভাই ও পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্য এসে আসাদের মৃতদেহ দেশের বাড়ি শিবপুরের ধনুয়া গ্রামে নিয়ে যায়।

আসাদের মৃত্যুর পর আন্দোলন বিদ্রোহের দাবানলে রূপান্তরিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। এক উত্তাল গণঅভ্যুত্থানে শামিল হয় ছাত্র-শ্রমিক-কৃষক-জনতা। এই অভ্যুত্থান যারা প্রত্যক্ষ করেনি, বর্ণনা দিয়ে তাদের এর তীব্রতা আর ব্যাপকতা বোঝানো অসম্ভব। সংগ্রামরত জনতা আইয়ুব নামফলক ভেঙে তা শহীদ আসাদের নাম অনুযায়ী আসাদগেট নামকরণ করে। ২৩ জানুয়ারি বিকেল থেকেই ঢাকার বিভিন্ন এলাকার ছাত্র-জনতা খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জমায়েত হতে থাকে। ঠিক সন্ধ্যার সময় পাঁচ ছয়শ’ মশাল জ্বলে ওঠে। মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের তুলনায় মশালের সংখ্যা ছিল খুবই কম। কিন্তু মিছিল যে এলাকা দিয়ে পার হচ্ছিল, সেসব এলাকার জনগণ স্থানীয়ভাবে মশাল জ্বালিয়ে মিছিলে অংশ নেয়। শেষ পর্যন্ত একটা বিশাল মশাল মিছিল পাক মটর (এখন বাংলা মটর), মগবাজার, শান্তিনগরসহ বিভিন্ন এলাকা প্রদক্ষিণ করে। মিছিল থেকে সেøাগান উচ্চারিত হতে থাকে ‘জ্বালো জ্বালো, আগুন জ্বালো’, ‘আসাদের মৃত্যু বৃথা যেতে দেবো না’, ‘আসাদের মন্ত্র, জনগণতন্ত্র’, ‘শ্রমিক কৃষক অস্ত্র ধরো, পূর্ব বাংলা স্বাধীন করো’, ‘স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলা কায়েম করো’।

২৪ জানুয়ারি। সেদিনও ১৪৪ ধারা বলবৎ ছিল। রাস্তায় রাস্তায় মেশিনগান হাতে মিলিটারি টহল দিচ্ছে। কিন্তু সব কিছু উপেক্ষা করে ঢাকা পরিণত হয়েছে মিছিলের শহরে। আজিমপুরে ইডেন কলেজের হোস্টেলের সামনে পুলিশের সঙ্গে ছাত্রীদের সংঘর্ষ হয়। সারা শহরে মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের অনেকের হাতেই ছিল লাঠি ও অন্যান্য দেশি অস্ত্র। সেদিন পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত হয় তেরো বছরের রুস্তম, সতেরো বছরের মতিউর, পনেরো বছরের মকবুলসহ আরও অনেক তরুণ প্রাণ। এসব মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে বিভিন্ন অফিসের বড়কর্তা থেকে শুরু করে সাধারণ কর্মচারীরা সবাই রাস্তায় নেমে আসে। প্রশাসন সম্পূর্ণ অচল হয়ে যায়। মনে হলো ক্ষমতা যেন জনতার হাতে চলে এসেছে। ২৪ তারিখ সন্ধ্যার পর থেকে ঢাকা শহরে কারফিউ জারি করা হয়।

২৪ জানুয়ারি ঢাকায় যে গণঅভ্যুত্থান হয়, পরবর্তী সময়ে তার উত্তাপ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। প্রবল আন্দোলনে উত্তাল পূর্ব বাংলা। চারদিকে বিক্ষোভ আর বিক্ষোভ। ভাসানীর আহ্বানে বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলে হাট হরতাল চলছে। গ্রামে সাধারণ মানুষ সংগঠিত হয়ে গরু চোর আর স্থানীয় শোষকদের উচ্ছেদ করছে। পূর্ব পাকিস্তান শ্রমিক ফেডারেশনের (সভাপতি মোহাম্মদ তোয়াহা ও সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল হোসেন খান) নেতৃত্বে শ্রমিক এলাকায় চলছে ঘেরাও আন্দোলন। বামদের মুখে উচ্চারিত হচ্ছেÑ ‘শ্রমিক-কৃষক অস্ত্র ধরো, পূর্ব বাংলা স্বাধীন করো’, ‘স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলা কায়েম করো’ সেøাগান। অপর দিকে আওয়ামী লীগ সেøাগান দিচ্ছে ‘জয় বাংলা’, ‘তোমার আমার ঠিকানা-পদ্মা মেঘনা যমুনা’। এ সময় ভাসানী সারা দেশে বক্তৃতা দিয়ে বেড়াচ্ছেন। তিনি নতুন সেøাগান তুললেন ‘কেউ খাবে আর কেউ খাবে না; তা হবে না, তা হবে না’।

আজ আমরা যখন ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের আত্মদানকারী আসাদকে স্মরণ করি, তখন প্রকৃতপক্ষে আমরা আসাদের চেতনাকে স্মরণ করি। কী ছিল সেই চেতনা! ছাত্র অবস্থাতেই তিনি গ্রামাঞ্চলে কৃষকদের মধ্যে কাজ করতেন। কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন, শহরের মধ্যবিত্তের মধ্যে তিনি যত কাজই করুন না কেন, নিজস্ব শ্রেণির দুর্বলতাগুলো রয়ে যায়। কৃষকের মধ্যে কাজ করে তিনি নিজেকে পরিশোধিত করতে চেয়েছেন। আসাদ বিশ্বাস করতেন, পূর্ব বাংলার জনগণের মুক্তির জন্য প্রয়োজন পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করা। কিন্তু শুধু বিচ্ছিন্ন হওয়াই যথেষ্ট নয়। ‘জাতীয় মুক্তি’ ও ‘শোষণমুক্তি’ দুটো লক্ষ্যই অর্জন করতে হবে। একমাত্র সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়েই তা অর্জন করা সম্ভব। সে জন্য গ্রামাঞ্চলে কৃষকদের মাঝে কাজ করতে হবেÑ গড়ে তুলতে হবে সশস্ত্র গেরিলা ঘাঁটি। আসাদ তার স্বপ্নের বাস্তব রূপ দেখে যেতে পারেননি।

পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আমরা স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করেছি। কিন্তু স্বাধীনতার ৪৮ বছর পরে আজও শ্রমিক কৃষকের অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জিত হয়নি। আজও শ্রমিক কৃষককে বিভিন্ন আন্দোলনে প্রাণ দিতে হচ্ছে। আজ যদি আমরা শোষণ-মুক্তির সংগ্রামে নিজেদের আত্মনিয়োগ করতে পারি, তবেই আসাদের আত্মদানের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জানানো হবে।

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com