বাংলাদেশ চিকিৎসা গবেষণা পরিষদ (বিএমআরসি) দেশের স্বাস্থ্য খাতে গবেষণায় একটি প্রভাবশালী ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। স্বাধীনতার অব্যবহিত পর, ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠানটি দেশের চিকিৎসা শিক্ষা গবেষণাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার তাগিদে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশবলে প্রতিষ্ঠা করা হয়। অনেকটা মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিল ইউকে (এমআরসি, ইউকে), ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিকেল রিসার্চ (আইসিএমআর, ইন্ডিয়া) ও তৎকালীন পাকিস্তান মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিলের (পিএমআরসি) আদলে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলা হয়। কিন্তু দুঃখের বিষয়, প্রতিষ্ঠার ৫৩ বছর পরও প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে গবেষণায় তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারেনি। যোগ্য নেতৃত্ব এবং চিকিৎসাবিজ্ঞান নিয়ে গবেষকের অভাব এর কারণ। এ প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি প্রণীত বাংলাদেশ চিকিৎসা গবেষণা পরিষদ অধ্যাদেশ-২০২৫ এর খসড়া নিয়ে কিছু কথা বলা দরকার।
১) খসড়াতে ৩(২) উপাধারায় বিএমআরসিকে একটি স্ব-শাসিত সংস্থা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং ছয়(৬) ধারায় পরিষদের সভাপতিকে সিনিয়র সচিব পদমর্যাদা এবং সিনিয়র সহসভাপতিকে সচিব পদমর্যাদা গণ্য করার কথা বলা হয়েছে। এ দুটি পূর্ণকালীন পদ এবং তারা তদনুযায়ী বেতন-ভাতা পাবেন। বিএমআরসিকে শক্তিশালী করার স্বার্থে ধারা দুটো যুগোপযোগী এবং প্রশংসনীয় উদ্যোগ। তবে কোনো অবসরের বয়সসীমা নির্ধারণ করা হয়নি। বাংলাদেশে যে কোনো সাংবিধানিক পদেও অবসরের বয়সসীমা থাকে। তাই বিএমআরসিতেও পূর্ণ পদে অবসরকালীন বয়সসীমা থাকা অবশ্যই বাঞ্ছনীয়। তবে কাউন্সিল বা অন্যান্য কমিটিতে বয়সের শিথিলতা থাকতে পারে, যা বিশ্বের অন্যান্য দেশেও রয়েছে।
২) ধারা সাত(৭)-এ সভাপতি, সিনিয়র সহসভাপতি ও কোষাধ্যক্ষ পদে নিয়োগদানের যোগ্যতা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানী হিসেবে স্বাস্থ্য গবেষণায় কী ধরনের ন্যূনতম অবদান থাকতে হবে, তার উল্লেখ নেই। যোগ্যতার মাপকাঠিতে চিকিৎসাবিজ্ঞানী হিসেবে অবদানের মাপকাঠি থাকা বাঞ্ছনীয়। তা না হলে অনভিজ্ঞ নেতৃত্বের ভিড় বাড়বে আগের মতো।
৩) প্রতিটি চিকিৎসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিসেবে শক্তিশালী ও সক্ষম করে তোলার স্বার্থে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপরই ইনস্টিটিউশনাল রিভিউ বোর্ড (আইআরবি) ধারণার প্রচলন হয়। সত্তরের দশকে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের স্বাধীন বোর্ড প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দেওয়া হয় এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সে সময় এই বিষয়ের ওপর আলাদাভাবে গুরুত্ব প্রদান করে। অথচ বিএমআরসির প্রস্তাবিত আইনের খসড়ায় জাতীয় গবেষণা সংক্রান্ত নৈতিক কমিটি গঠন করে তাকে, অন্য যে কোনো আইনে যা-ই থাকুক না কেন, দেশে অবস্থিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আইআরবি দেখভালের দায়িত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এ ধরনের ধারা-উপধারা স্বাস্থ্যবিজ্ঞান গবেষণাকে বিকেন্দ্রীকরণের পরিবর্তে আরও কেন্দ্রীভূত ও দুর্বল করবে। চিকিৎসা গবেষণা পরিষদের মূল কাজ শুধু গবেষণা অনুদান প্রদান এবং তা দেখভাল করা; গবেষণার কাজ নিয়ন্ত্রণ নয়।
৪) এই খসড়া আইনের ১৩(ড) ধারায় আইআরবি অনুমোদনের পাশাপাশি যে কোনো ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল/ ড্রাগ ট্রায়ালের জন্য বিএমআরসির নিবন্ধন ও নৈতিক অনুমোদনের শর্ত নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। এটা বাংলাদেশের ঔষধ ও প্রসাধন সামগ্রী আইন ২০২৩ এবং বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ছোট পরিসরের ফেজ-২ ট্রায়ালের নৈতিক অনুমোদনের শর্ত নির্ধারণের জন্য কেন বিএমআরসিতে যেতে হবে, তা বোধগম্য নয়।
৫) এই আইনের ২০(ঘ, ঙ) উপধারায় গবেষণা উদ্যোগ থেকে প্রাপ্ত আয় এবং নীতিগত অনুমোদন প্রদান সংক্রান্ত ফি, বিভিন্ন গবেষণা প্রকল্প থেকে প্রাপ্ত সার্ভিস চার্জকে বিএমআরসির আয়ের উৎস বলা হয়েছে। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। বর্তমানে বিএমআরসি বিভিন্ন গবেষণা প্রকল্পের গবেষকদের কাছ থেকে ১২ থেকে ১৫ শতাংশ টাকা ওভারহেড ব্যয় হিসেবে রেখে দেয়। বাইরের কোনো গবেষণা প্রকল্প জমা দিলে সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা নীতিগত অনুমোদনের জন্য চার্জ করে। বিশ্বের কোনো নীতিগত অনুমোদনকারী সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান এত বিপুল অঙ্কের সার্ভিস চার্জ রাখে কিনা, আমার জানা নেই। বিএমআরসির এই আয়ের মডেল থেকে বের হয়ে আসা প্রয়োজন। বরং সরকারকেই বিএমআরসির অফিস ও লোকবলের বেতন প্রদানের অর্থ দিতে হবে। গবেষণার অর্থ থেকে অফিস ও কর্মচারীর বেতন নির্বাহের ব্যয় কেটে রাখা খুবই দুঃখজনক।
বিগত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এমআরসি (ইউকে) ১০০ মিলিয়ন পাউন্ড এবং আইসিএমআর (ইন্ডিয়া) দুই হাজার ৩৫০ কোটি রুপি বিভিন্ন গবেষণায় অনুদান প্রদান করেছে। স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত গবেষণায় এ রকম বরাদ্দ ও অঙ্গীকার প্রদর্শনই কেবল পারে স্বাস্থ্য খাতে আমাদের অগ্রযাত্রা নিশ্চিত করতে। বিএমআরসির নতুন নেতৃত্ব ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে নতুন বছরের শুরুতে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
ড. ফজলে রাব্বি চৌধুরী: সহযোগী অধ্যাপক, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়; রিসার্চ
ফেলো, এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাজ্য