১৯৭১ : মানচিত্রের জন্য লড়াই
জাহানারা ইমামের ‘একাত্তরের দিনগুলি’, আনিসুজ্জামানের ‘আমার একাত্তর’, মুক্তিযুদ্ধের দলিপত্র থেকে জানা যায়,
স্বাধীনতার যুদ্ধ ছিল প্রশাসনিক অধিকার বা অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে মুক্তির লড়াই—এই ব্যাখ্যা যথেষ্ট নয়। ১৯৭১ মূলত ছিল একটি মানচিত্রের জন্য যুদ্ধ। ‘এই ভূখণ্ড আমাদের’—এই ঘোষণা দৃশ্যমান করার জন্য প্রয়োজন ছিল একটি প্রতীকের, একটি পতাকার।

কেন এ দুই রং
বাংলার মাটি, পত্র-পল্লব, বর্ষার মাতাল সবুজ ধানক্ষেত—সবই যেন সবুজ রঙে সঞ্চিত। ফসল, গ্রাম, নদী, প্রকৃতি—এই জীবনধারার ওপরই দাঁড়িয়ে আছে বাঙালির সংস্কৃতি। আর লাল হলো সেই রক্তের স্মৃতি, ত্যাগের প্রতীক। শহীদদের রক্ত যেমন আমাদের বেদনাকে উজ্জ্বল করে, তেমনি ভবিষ্যতের আলোতে ভাসিয়ে দেয়। এর বিনিময়ে আমরা পেয়েছি দেশ; হলো নতুন সূর্যের মতো আশার জন্ম। এই রং দুটি তাই শুধু চিহ্ন নয়, হয়ে উঠল আমাদের ইতিহাসের সারাংশও।
এক ধীরলয়ের সাংস্কৃতিক বিপ্লব
লাল-সবুজ প্রথমে ছিল রাষ্ট্রীয় প্রতীক। তারপর তা ঢুকে গেল মানুষের উত্সব, অনুষ্ঠান, আচার, এমনকি দৈনন্দিন পোশাকে। এই যাত্রা ছিল এক আন্তরিক, প্রাণবন্ত ও গভীর সামাজিক পরিবর্তন। শুধু বিজয় দিবস বা স্বাধীনতা দিবসেই নয়, ফ্যাশন, ডিজাইন ও সাংস্কৃতিক উপস্থাপনার মধ্যেও তা হয়ে ওঠে এক অভ্যন্তরীণ শক্তি।

ক্রীড়াঙ্গনেও এই রঙের উপস্থিতি প্রতিদিন নতুন করে মনে করিয়ে দেয় আমাদের পরিচয়। ক্রিকেটাররা যখন লাল-সবুজ জার্সি গায়ে মাঠে নামেন, কিংবা ফুটবল স্টেডিয়াম বা হকি অ্যারেনায় যখন জাতীয় রঙের ঢেউ ওঠে, তখন মনে হয়, এই রং শুধু পোশাকে নয়, খেলোয়াড়দের ভেতরে প্রবাহিত মনোবলের প্রতিচ্ছবি। মাঠের ভেতর দোল খেয়ে যাচ্ছে আরেকটি পতাকা। গণিত অলিম্পিয়াডেও সেই একই আবেগ। ছোট-বড় প্রতিযোগীরা যখন লাল-সবুজ টি-শার্ট পরে একসঙ্গে দাঁড়ায়, তখন গণনার চেয়েও বড় হয়ে ওঠে দেশের প্রতি টান। যারা গণিতের সৌন্দর্য খুঁজে পেতে আসে, তাদের চোখেও লুকিয়ে থাকে এই দুই রঙের গর্ব, তাদের ছবিতেও ধরা পড়ে সমবেত এক পরিচয়ের দীপ্তি।
বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে দেশে দেশে ঘুরে বেড়ান নাজমুন নাহার। ২৫ বছর ধরে ঘুরছেন পৃথিবীর পথে পথে। এরই মধ্যে তিনি ১৮৪টি দেশ ঘুরে সৃষ্টি করেছেন ইতিহাস। তাঁর ভ্রমণে সব সময় সঙ্গী থাকে লাল-সবুজের পতাকা। তিনি বলেন, ‘এই পতাকা আমার পরিচয়, আমাদের শিকড় ও আত্মার অংশ। পৃথিবীর যে প্রান্তেই যাই না কেন, এই পতাকা আমাকে মনে করিয়ে দেয়, আমি কোথা থেকে এসেছি, কোন ইতিহাস ও ত্যাগের বিনিময়ে আমাদের দেশ জন্ম নিয়েছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের পর্বতশৃঙ্গ, মহাসমুদ্র কিংবা নগর-বন্দরের অপূর্ব সৌন্দর্যে যখনই আমি লাল-সবুজের পতাকা তুলে ধরি, তখন আমার ভেতরে এক শক্তি ও জাগরণের সৃষ্টি হয়।’

এভাবে যখন কোনো বিশ্ব পর্যটক, এভারেস্ট বিজয়ী কিংবা মডেলরা লাল-সবুজ টি-শার্ট পরে সারিবদ্ধ দাঁড়ান, তখন তাঁরা হয়ে ওঠেন এক টুকরা বাংলাদেশ।
ফ্যাশনে লাল-সবুজ যেন আরো উজ্জ্বল, আরো প্রাণবন্ত, স্বতঃস্ফূর্ত। বিবি রাসেলের মতো নন্দিত নকশাকাররা বহু আগেই বুঝেছেন, এ দুই রং শুধু নান্দনিকতার নয়, ইতিহাসেরও। তাঁদের সৃষ্ট পোশাকে লাল-সবুজের বিন্যাস যেন যুদ্ধজয়ের প্রতিধ্বনি। বড় বড় র্যাম্প শোতে মডেলরা গর্ব নিয়ে বহন করেন এই রঙের সংমিশ্রণ। কখনো শাড়ির আঁচলে, কখনো গাউনের বুকে, কখনো স্কার্টের প্রিন্টে, জুয়েলারিতে। উত্সব-পার্বণ থেকে শুরু করে কনসার্ট, করপোরেট ইভেন্ট—সব জায়গায় লাল-সবুজ হয়ে উঠছে স্টেটমেন্ট কালার।
লাল-সবুজের রঙে রাঙিয়ে টি-শার্টে অসংখ্য নকশা করেছেন নিত্য উপহারের স্বত্বাধিকারী বাহার রহমান। তিনি বলেন, ‘লাল-সবুজের স্মারক টি-শার্টের যাত্রা শুরু ২০০৪ সালে। নিজের দেশকে ভালোবেসে এই টি-শার্ট পরতে ভালোবাসেন অনেকেই। জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা যাত্রা, নানা প্রতিযোগিতা, পাহাড়-পর্বতে আরোহণ করতে গিয়ে অনেকেই এই টি-শার্ট পরেন ভালোবেসে। বিদেশের মাটিতে নিজের দেশকে চেনাতে অনেকে বেছে নেন।

রঙ বাংলাদেশের স্বত্বাধিকারী সৌমিক দাস বলেন, ‘আমাদের জাতীয় পতাকার লাল-সবুজ শুধু দুটি রং নয়, এটি আমাদের ইতিহাস, আত্মত্যাগ ও পরিচয়ের ভাষা। এই রঙের জন্ম হয়েছে স্বাধীনতার সংগ্রাম থেকে; তাই তা স্বাভাবিকভাবেই আমাদের আবেগ, স্মৃতি ও মূল্যবোধের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।
‘ফ্যাশন সেই আবেগকে দৃশ্যমান করার এক শক্তিশালী মাধ্যম। যখন মানুষ নিজের পরিচয়কে গর্বের সঙ্গে ধারণ করতে চায়, তখন পোশাক ছাড়িয়ে সেই রং জায়গা করে নেয় উত্সব, স্থাপনা, গ্রাফিকস, পণ্য নকশা, এমনকি দৈনন্দিন জীবনধারায়ও।
‘এটি আমাদের সংস্কৃতির ধারকও। লাল-সবুজ তাই আমাদের নকশায় বারবার ফিরে আসে কখনো সরাসরি, কখনো প্রতীকের ভাষায়। এভাবেই পতাকার রং আমাদের পোশাক ছাপিয়ে হয়ে উঠেছে আমাদের সামগ্রিক সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তির অংশ।’

সংস্কৃতির দিক থেকেও লাল-সবুজের যাত্রা বিস্ময়কর। জাতীয় দিবস ছাড়াও বিভিন্ন আয়োজনেই মানুষ এই রং পরতে ভালোবাসে। কারণ এটি শুধু দেশপ্রেম নয়, নিজের শিকড়ের প্রতি ভালোবাসা। মঞ্চনাটক, কনসার্ট, চলচ্চিত্র, বইয়ের প্রচ্ছদ, দেয়ালচিত্র, স্কুল-কলেজের অনুষ্ঠান, রাজনৈতিক পোস্টার, ফেস্টুন, ব্যানার, এমনকি নানা শিল্পকর্মেও এই রঙের আধিপত্য নজর কেড়ে নেয়। কখনো পতাকা, কখনো প্রতীকী রূপ, কখনো রঙের ক্ষুদ্র ইঙ্গিত। এতে সংস্কৃতি আরো দেশীয় হলো, হলো আরো স্বতন্ত্র।
পোশাকে লাল-সবুজ
ডিজাইনারদের চোখে লাল-সবুজ এক শক্তিশালী কনট্রাস্ট। সবুজ নরম ও বিস্তৃত, লাল তীক্ষ্ম ও কেন্দ্রীভূত। কেউ যখন সবুজ পোশাকে লালের ক্ষুদ্র অ্যাকসেন্ট দেন, তখন নজর এক জায়গায় আটকে যায়। রঙের এই ভারসাম্য ফ্যাশনে একটি স্বকীয় ট্রেন্ড গড়ে তোলে, যা একাধারে শৈল্পিক ও প্রতীকী। যখন কোনো র্যাম্পে মডেল লাল-সবুজের শাড়ি পরে হেঁটে যান অথবা কোনো তরুণ ক্রিকেটার জার্সি পরে উইকেটের সামনে দাঁড়ান কিংবা কোনো ছাত্র অলিম্পিয়াডে দেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করে, তখন তারা শুধু রং পরছে না, তারা ইতিহাসকে বহন করছে। এই রং স্মরণ করায় ১৯৭১ সালের সেই মানচিত্র, সেই নকশাকারদের রাত, সেই লড়াই, সেই রক্তভেজা ভোর। স্মরণ করায় আমরা একটি দেশ একটি পতাকার নিচে, একটি গল্পের ভেতর দিয়ে, অগণিত স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি। এই রং দুটি আমাদের ইতিহাসের উত্তরাধিকার, একটি ফ্যাশন স্টেটমেন্ট, মাঠের লড়াই, একটি সাংস্কৃতিক চেতনা ও বুদ্ধিবৃত্তিক উত্তরণের রং।