প্রতিবেশী ভারত (৫৫তম থেকে ৩৯তম) ও শ্রীলঙ্কার (৯৪তম থেকে ৬৩তম) উল্লেখযোগ্য উন্নতি বাংলাদেশের আপেক্ষিক পিছিয়ে পড়াকে আরো স্পষ্ট করে তোলে।
বিদেশি পর্যটকে আয় কমেছে, ভরসা অভ্যন্তরীণ পর্যটনে : দেশের পর্যটন ব্যবসার বড় অংশই এখন দেশি পর্যটকনির্ভর হয়ে পড়েছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বাংলাদেশ বিদেশি পর্যটকদের কাছ থেকে আয় করেছিল ৪৫ কোটি ৩০ লাখ ডলার। ২০২৪ সালে এই আয় কমে দাঁড়িয়েছে ৪৪ কোটি ডলারে। প্রতি ডলারের বিনিময় মূল্য ১২২ টাকা হিসাবে দেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ১৫৯ কোটি টাকা কমেছে। অথচ একই সময়ে ভারতের আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে তিন হাজার ৫০২ কোটি ডলার এবং শ্রীলঙ্কার প্রায় ৩১৭ কোটি ডলারে।
ট্যুর অপারেটররা জানিয়েছেন, গত বছরের তুলনায় চলতি বছর বিদেশি পর্যটকদের বুকিং ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ কমেছে। কক্সবাজার, সুন্দরবন বা সিলেটের মতো আন্তর্জাতিক মানের গন্তব্যগুলোতে ইউরোপ-আমেরিকার পর্যটকদের আনাগোনা এখন নেই বললেই চলে।
ব্যবসায়ীরা যা বলছেন : পর্যটনশিল্পের বাণিজ্য সংগঠন ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (টোয়াব) সভাপতি মোহাম্মদ রাফিউজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সম্মিলিত উদ্যোগের অভাবে বিকাশ ঘটছে না পর্যটনে। সংকট থেকে উত্তরণে পর্যটনবান্ধব নীতিমালা তৈরিসহ সরকারি সহায়তা প্রয়োজন।’
গ্যালাক্সি বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও টোয়াবের সাবেক সভাপতি তৌফিক উদ্দীন আহমেদ বলেন, “বিদেশি পর্যটকরা নিরাপত্তা, যোগাযোগ, স্বাস্থ্য সুবিধা ও ভিসা সুবিধা বিবেচনা করে গন্তব্য বেছে নেয়। আমাদের প্রস্তুতি এখনো আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছায়নি। একটি কেন্দ্রীয় ‘ডেস্টিনেশন বাংলাদেশ’ প্রচারাভিযান দরকার, যেখানে সরকার ও বেসরকারি খাত একসঙ্গে কাজ করবে।”
রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ভ্রমণ সতর্কতা : রাজনৈতিক অস্থিরতা পর্যটন খাতের জন্য একটি গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং বেশ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের জন্য ভ্রমণ সতর্কতা জারি রেখেছে।
প্যাসিফিক এশিয়া ট্র্যাভেল অ্যাসোসিয়েশন (পাটা) বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের মহাসচিব তৌফিক রহমান বলেন, ‘দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের খবর এবং তৎপরবর্তী কিছু সহিংসতার চিত্র আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। এর ওপর মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে এসেছে প্রায় ২০টি দেশের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা। আমেরিকা, ইংল্যান্ড, জার্মানি, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলো তাদের নাগরিকদের জন্য সতর্কতা জারি রেখেছে। ফলে বিদেশি পর্যটক ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ কমে গেছে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. শাকের আহমেদ বলেন, ‘পর্যটন র্যাংকিং শুধু সংখ্যা নয়, এটি একটি দেশের সামগ্রিক সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির প্রতিফলন। অপ্রতুল বিপণন, দুর্বল অবকাঠামো, নিয়ন্ত্রণমূলক জটিলতা এবং নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ—এই ফাঁকগুলোই আমাদের নিচের দিকে রাখছে।’
নামেই অগ্রাধিকার খাত, বাস্তবে অবহেলা : ২০২৩ সালে পর্যটন খাতকে জাতীয় শিল্পনীতিতে ‘অগ্রাধিকার খাত’ ঘোষণা করা হলেও বাস্তবায়নের দিক থেকে চিত্রটি খুবই ম্লান। বাজেটে বরাদ্দ কম। উন্নয়ন প্রকল্প, বিদেশে ব্র্যান্ডিং ক্যাম্পেইন এবং অবকাঠামো উন্নয়নের চাহিদার তুলনায় নিতান্তই অপ্রতুল। বিপরীতে থাইল্যান্ডের পর্যটন কর্তৃপক্ষ শুধু আন্তর্জাতিক বিপণনের জন্যই বছরে প্রায় সাত হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে।
বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ডের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমাদের বার্ষিক বিপণন বাজেট মাত্র ২০ থেকে ৩০ কোটি টাকা মধ্যে আবদ্ধ। এই বাজেট দিয়ে বৈশ্বিক পরিসরে বড় আকারে বিজ্ঞাপন, ক্যাম্পেইন চালানোই সম্ভব নয়।’
কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ঘোষণার পরও তা আবার স্থগিত করা হয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলেছেন, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হলে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরাসরি ফ্লাইট আসবে, পর্যটকের আগমন বাড়বে কয়েক গুণ।’
পর্যটন বিচিত্রার সম্পাদক ও পর্যটন করপোরেশন বোর্ডের পরিচালক মহিউদ্দিন হেলাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কক্সবাজারে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট নেপাল, ভুটান, কুনমিং, ভারতের সেভেন সিস্টারের মতো এলাকা থেকে পর্যটক আগমনের সুযোগ করে দেবে। কক্সবাজারে যেসব আকর্ষণ রয়েছে, তা এখনো কাঁচামাল হিসেবে রয়েছে, সেগুলোকে পর্যটনপণ্য হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।’
কাঠামোগত সমস্যা ও ভিসা জটিলতা : পর্যটন ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিদেশি পর্যটকের অভাবের পেছনে কাঠামোগত সমস্যাগুলোও সমানভাবে দায়ী। ভিসা প্রাপ্তির জটিলতা একটি বড় অন্তরায়। বাংলাদেশ অনেক দেশের জন্য অন-অ্যারাইভাল ভিসা সুবিধা চালু করলেও এখনো ইউরোপ ও আমেরিকার বেশির ভাগ দেশের নাগরিকদের জন্য ভিসা আগে থেকে নেওয়া বাধ্যতামূলক। প্রক্রিয়াটি সময়সাপেক্ষ এবং স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে বলে অভিযোগ করে অনেক ট্যুর অপারেটর। ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে ই-ভিসা চালুর দাবি জানিয়ে এলেও তা এখনো চালু হয়নি।
সমাধানের পথ : খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বাংলাদেশের পর্যটনের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে সরকারি-বেসরকারি খাতের সমন্বিত ও সাহসী উদ্যোগ প্রয়োজন। পর্যটন খাতে বাজেট বরাদ্দ অন্তত পাঁচ গুণ বাড়ানো, কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে কার্যক্রম শুরু, নিরাপত্তা বেষ্টনী জোরদার করতে পর্যটন পুলিশের কাভারেজ বৃদ্ধি, ভিসা নীতিতে উদারতা এনে আরো বেশি দেশের জন্য ই-ভিসা সুবিধা চালু, আন্তর্জাতিক মানের হোটেল-রেস্তোরাঁসহ পর্যটনসেবায় কর ছাড় ও প্রণোদনার কথা বলছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁরা বলছেন, শক্তিশালী আন্তর্জাতিক বিপণন ক্যাম্পেইন চালু, যেখানে বাংলাদেশের ‘ইকো-ট্যুরিজম’, ‘কালচারাল ট্যুরিজম’ এবং ‘অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজম’-এর ওপর ফোকাস করে স্থানীয় সম্প্রদায়কে পর্যটন কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত করে তাদের জন্য আয়ের পথ সৃষ্টি করতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
টোয়াব সভাপতি মোহাম্মদ রাফিউজ্জামান বলেন, ‘ট্যুরিজম সাসটেইন করতে শুধু সরকার বা শুধু প্রাইভেট স্টেকহোল্ডার বা অন্য কোনো স্টেকহোল্ডারদের একার পক্ষে সম্ভব নয়, জনগণ যদি সচেতন না হয়।’
বেসরকারি খাত—বিনিয়োগ আছে, ভরসা নেই : দেশে পর্যটন খাতে বেসরকারি উদ্যোক্তারাই মূল চালিকাশক্তি। কক্সবাজার, সিলেট, পার্বত্য চট্টগ্রামে তারকা মানের হোটেল-রিসোর্ট নির্মাণে অনেকেই বিনিয়োগ করেছেন। কিন্তু বিনিয়োগের জন্য যে আস্থার পরিবেশ দরকার, তা এখনো তৈরি হয়নি। উদ্যোক্তারা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব, হয়রানিমূলক আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, দুর্বল যোগাযোগব্যবস্থা এবং পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে নিরাপত্তা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার অভাবে তাঁরা বিনিয়োগের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারছেন না।
পর্যটন বিশ্লেষক ড. শাকের আহমেদ বলেন, ‘আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ আছে, কিন্তু সেটাকে বিশ্ববাজারে ‘সেল’ করার দক্ষতা ও বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।’
আশার কথা বলছেন নীতিনির্ধারকরা : বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দিন সম্প্রতি বলেছেন, ‘আমরা একটি নীতিমালা প্রণয়নের চূড়ান্ত পর্যায়ে আছি। সারা দেশের যত পর্যটন স্থান রয়েছে, পর্যটনসংশ্লিষ্ট যত কর্মকাণ্ড আছে; সে ক্ষেত্রে সবার জন্য আমরা আচরণবিধি তৈরি করছি।’
বিদেশি পর্যটকদের হার বেড়েছে কি না জানতে চাইলে উপদেষ্টা বলেন, ‘আমাদের নিজস্ব পর্যটকদের জন্য আমরা আরো ভালো কী ব্যবস্থা নিতে পারি। ভিসা জটিলতা আমাদের মনে হয় খুব একটা নেই। লজিস্টিক সমস্যা আছে। সামগ্রিকভাবে যখন আমাদের অবস্থার উন্নতি ঘটবে, আমরা মনে করি পর্যটনশিল্পের উন্নতি ঘটবে।’