সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১২:৩১ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

বিশ্ব মৃত্তিকা দিবস : সুস্থ শহরের জন্য সুস্থ মাটি

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: শুক্রবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ২২ বার পড়া হয়েছে
আমাদের প্রকৃতিতে মাটি একটি মূল্যবান সম্পদ। এটি ক্ষুদ্র অণুজীব থেকে শুরু করে মানবগোষ্ঠী পর্যন্ত সবাইকে প্রয়োজনীয় নানা উপাদানের জোগান দিয়ে যাচ্ছে। যেখানে মাটি আছে, সেখানেই মানবসভ্যতা গড়ে উঠেছে। মাটি নিয়ে থাইল্যান্ডের রাজা আদুলিয়াদেজ ভূমিবলের ভাবনা ও আন্তরিকতা এবং এই সম্পদের প্রতি তাঁর আবেগ সারা বিশ্বের মৃত্তিকাবিজ্ঞানীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল।

তিনি ১৯২৭ সালের ৫ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৩ অক্টোবর ২০১৬ সালে মারা যান। প্রয়াত রাজার সম্মানার্থে, তাঁর জন্মদিন স্মরণে প্রতিবছর ৫ ডিসেম্বর বিশ্ব মৃত্তিকা দিবস পালন করা হয়। ২০২৫ সালের প্রতিপাদ্য হলো ‘সুস্থ শহরের জন্য সুস্থ মাটি’। ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের দুই-তৃতীয়াংশ জনসংখ্যা শহরে বাস করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মাটি হলো টেকসই এবং স্থিতিস্থাপক শহরের একমাত্র ভিত্তি। 

আমাদের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য যেমন একটি শক্তিশালী ভিত্তির ওপর নির্ভর করে, তেমনি আমাদের শহরবাসীর কল্যাণ আমাদের পায়ের নিচের মাটির প্রাণশক্তির ওপর নির্ভর করে। এটি কেবল পার্ক এবং বাগান সম্পর্কে নয়, এটি কংক্রিটের নিচে অদৃশ্য জগৎ, যা নীরবে নগরজীবনকে সাহায্য করে যাচ্ছে। মাটি ব্যবহারের একেবারে অনুপযুক্ত হয়ে পড়লে অর্থাৎ মাটির মৃত্যু হলে মানুষেরও বাঁচার সুযোগ থাকবে না।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, এক টেবিল চামচ মাটিতে পৃথিবীর সব মানুষের চেয়ে বেশিসংখ্যক জীবাণু বাস করে, যাদের অনুপস্থিতিতে পৃথিবী অচল হয়ে পড়বে। মৃত মাটিতে তারা বসবাস করতে পারে না, তাদের জন্য দরকার জৈব পদার্থ, পানি ও বাতাস। যেমন—মরুভূমির বালু মৃত, সেখানে জীবনের কোনো অস্তিত্ব নেই। 

জীবন্ত মাটি নগরবাসীকে পানি পরিশোধন, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, বায়ুর মান উন্নত করা এবং নগর কৃষির জন্য স্থান প্রদান করে থাকে। এগুলোর পাশাপাশি সুস্থ শহুরে মাটির একটি গুরুত্বপূর্ণ মানসিক দিকও রয়েছে।

তথ্য অনুযায়ী পার্ক এবং বাগানে খালি পায়ে সবুজ ঘাসের ওপর হাঁটা হলো আর্থিং বা গ্রাউন্ডিং করার একটি উপায়, যা আপনাকে পৃথিবীর শক্তির সঙ্গে সংযুক্ত করে। সবুজ ঘাসের ওপর খালি পায়ে হাঁটার সুবিধাগুলোর মধ্যে রয়েছে মানসিক চাপ কমানো, মেজাজ উন্নতি করা, শক্তির মাত্রা বৃদ্ধি করা, ঘুমের মান উন্নত করা, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধি করা, ট্রেস হরমোন কমানো, পায়ের পেশি শক্তিশালী করা ইত্যাদি। 

অপরিকল্পিত নগরায়ণ, শিল্পায়ন এবং নগরীর বর্জ্যের অব্যবস্থাপনা মাটির স্বাভাবিক গঠন, জল ধারণক্ষমতা এবং উর্বরতাকে নষ্ট করে দেয়। বর্তমানে প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে। বছরে প্রায় ১০ লাখ টন প্লাস্টিকবর্জ্য তৈরি হচ্ছে, যেগুলো বড় বড় শহরের জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ। তা ছাড়া প্লাস্টিকবর্জ্য অপচনশীল হওয়ায় পরিবেশে দীর্ঘদিন অবস্থানের কারণে আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান এবং সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদ মৃত্তিকার স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মৃত্তিকার প্রাণ হচ্ছে মৃত্তিকার অণুজীবসমগ্র (মাইক্রোবায়োম), যা প্লাস্টিকদূষণে উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে এবং টেকসই ফসল উৎপাদনের অন্তরায়। তা ছাড়া এগুলোর ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থের কারণে জীবজগৎ ও উদ্ভিদকুল উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

সবুজ ছাদ এবং নগর কৃষির মতো সবুজ অবকাঠামো কিভাবে শহরগুলোকে উন্নত করে, তার ওপর বিশ্ব মৃত্তিকা দিবস বিশেষ জোর দিয়েছে। এই গ্রহে সুস্থভাবে বেঁচে থাকা নির্ভর করছে মাটির সঙ্গে তার মূল্যবান সংযোগের ওপর। আমাদের খাদ্যের ৯৫ শতাংশের বেশি মাটি থেকে আসে, যা আমরা উদ্ভিদের মাধ্যমে পেয়ে থাকি। খাদ্য হলো একটি শক্তিশালী ওষুধ। এ প্রসঙ্গে একটি প্রাচীন বৈদিক প্রবাদে বলা হয়েছে, ‘যখন খাদ্য ঠিক থাকে, তখন ওষুধের প্রয়োজন হয় না; খাদ্য ঠিক না থাকলে ওষুধ সেবনে কোনো লাভ হয় না।’ বাংলাদেশে যেহেতু প্রতিটি বাড়ির সামনে শাক-সবজির চাষ ও গাছপালা রোপণের পর্যাপ্ত জায়গা নেই, সেহেতু একমাত্র ছাদ বাগানই আমাদের পরিবেশগত সুবিধাগুলো; যেমন—তাপ হ্রাস, উন্নত বায়ুর মান, বিনোদন, শাক-সবজি ও ফলমূলের চাহিদা মেটানো এবং প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক প্রদান করতে পারে। বাসিন্দারা মাটির টব, প্লাস্টিকের টব এবং বস্তার মতো পাত্র ব্যবহার করে শাক-সবজি, ফল, ফুলসহ বিভিন্ন ধরনের গাছপালা দিয়ে বাগান তৈরি করে একটি সুস্থ শহর উপহার দিতে পারে। পুষ্টির একমাত্র উৎস হিসেবে ছাদ বাগানের গাছের বৃদ্ধির জন্য সাধারণত রাসায়নিক সার ব্যবহার না করাই ভালো, তাতে মাটির ক্ষয় বৃদ্ধি, বাতাস চলাচলে বাধা প্রদান এবং উপকারী অণুজীবের ক্ষতি হতে পারে।

এই দিবসের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে আমাদের করণীয় :

১. এই দিবস উদযাপনে কোনোভাবেই  প্লাস্টিকের ব্যানার বা ফেস্টুন ব্যবহার করা উচিত নয়। কারণ এটি পরিবেশ সুরক্ষার অনুষ্ঠানের বার্তা এবং মাটিতে প্লাস্টিকদূষণ সম্পর্কে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের বিরুদ্ধে যায়। তা ছাড়া আমাদের সরকারের পলিথিন ব্যবহার কমানোর সিদ্ধান্তের পরিপন্থী। দিবসটির সম্মানার্থে প্লাস্টিকবর্জ্য হ্রাসের লক্ষ্যে পরিবেশবান্ধব বিকল্প; যেমন—কাগজ, কাপড়, হাতে আঁকা পোস্টার, ডিজিটাল ডিসপ্লে ব্যবহার করা যেতে পারে।

২. শহরের বর্জ্যকে প্রাথমিকভাবে পচনশীল এবং অপচনশীল এই দুটি ভাগে বিভক্ত করে জৈব সার ও বিদ্যুৎ উৎপাদন করার ব্যবস্থা করা। আমার অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, ব্ল্যাক সোলজার ফ্লাই (মাছির) ব্যবহারের মাধ্যমে পচনশীল বর্জ্য থেকে (এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন, চট্টগ্রাম, বিএসএফ মডেলের আদলে) জৈব সারসহ উচ্চ মানের প্রোটিনসমৃদ্ধ হাঁস-মুরগি ও মাছের খাবার তৈরি করা, যা কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও জলাবদ্ধ নিরসনে ভূমিকা রাখবে।

৩. জৈব সার বা জৈব পদার্থ মাটির প্রাণ। বাংলাদেশে প্রায় ৮৫ শতাংশ জমিতে তার ঘাটতি রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এর পরিমাণ ১ শতাংশেরও নিচে (এসআরডিআই, ২০২০) অথচ সুস্থ মাটিতে তার পরিমাণ ৫ শতাংশ থাকা উচিত। আমরা দুটি উৎস; যেমন—গরুর গোবর ও গৃহস্থালির পচনশীল আবর্জনা থেকে জৈব সার পেতে পারি, যেগুলোর অব্যবস্থাপনার কারণে শহরে জলাবদ্ধতা, নালা-নর্দমা, খাল-বিল, নদী ভরাট হয়ে দূষণ ছড়াচ্ছে। মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের উচিত মাটির উর্বরতা শক্তি রক্ষার্থে অন্যান্য সংশ্লিষ্ট মহলের সহযোগিতা নিয়ে পচনশীল আবর্জনার পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জৈব সার তৈরি এবং আবাদি জমিতে ব্যবহার নিশ্চিত করে মাটির উৎপাদনশক্তি বৃদ্ধি করা, তাতে প্রতিষ্ঠানের (উন্নয়ন ইনস্টিটিউট) নামের সার্থকতা রক্ষা হবে।

৪. বৃক্ষরোপণ মাটি সংরক্ষণের জন্য একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। বৃক্ষ মাটির ক্ষয়রোধ, শিকড় নোঙর এবং তার লতাপাতা মাটির সঙ্গে মিশিয়ে মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করে। তা ছাড়া উদ্ভিদ জীববৈচিত্র্যকে লালন এবং পরিবেশকে ঠাণ্ডা ও শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ করে। তাই সঠিক জায়গায় এবং মাটিতে বৃক্ষরোপণে উৎসাহ প্রদান করা উচিত।

৫. প্লাস্টিকবর্জ্য মাটিতে ক্ষয় হতে ৪০০ থেকে পাঁচ হাজার বছর লাগে। পলিব্যাগ ও একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের সরবরাহ, ব্যবহার ও দূষণ নিয়ন্ত্রণে সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সহায়তা করা।

বিশ্ব মৃত্তিকা দিবসের প্রতিপাদ্য অনুযায়ী গ্রিন সিটির জন্য স্বাস্থ্যকর মাটি তৈরির লক্ষ্যে কৃষি মন্ত্রণালয়, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, সিটি করপোরেশন এবং জনসাধারণ এগিয়ে আসি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি স্বাস্থ্যকর সবুজ শহর রেখে যাই।

লেখক : অধ্যাপক, মৃত্তিকাবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com