সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১০:০৫ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন বছরব্যাপী পরিকল্পনা

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: সোমবার, ১ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৯ বার পড়া হয়েছে
ডেঙ্গু এখন বাংলাদেশের শহর-গ্রাম-নির্বিশেষে সব মানুষের কাছে চিরচেনা আতঙ্ক। বছরের পর বছর এর সংক্রমণ বাড়ছে, মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। আর আমরা বহুদিন ধরে এর চিকিৎসায় প্রায় একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি। কীটনাশক স্প্রে, ফগিং, মাইকিং, জরুরি সভা করছি, কিন্তু সামগ্রিকভাবে ডেঙ্গু দমছে না।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আমাদের পরিকল্পনা মৌসুমি, কিন্তু ডেঙ্গু এখন বারোমাসি রোগ। তাই এর নিয়ন্ত্রণে সমাধানও হতে হবে সারা বছরের সমন্বিত উদ্যোগে। 

দ্রুত ডেঙ্গুকে একটি জাতীয় স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে স্বীকার করা উচিত। এটি কেবল নগর সমস্যা  নয়, গোটা দেশের সমস্যা।

আমাদের বেশির ভাগ উদ্যোগ শুরু হয় বর্ষা মৌসুমের পরে বা সংক্রমণ বাড়ার পর। কিন্তু প্রয়োজন আগে থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া, বারোমাসি পরিকল্পনায় এনে এর জন্য সারা বছরের বাজেট এবং নতুনভাবে প্রশিক্ষিত স্থায়ী কর্মী নিয়োগ করা। 

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন বছরব্যাপী পরিকল্পনাডেঙ্গুকে মৌসুমি সমস্যা হিসেবে দেখার ভুলটি আমাদের বারবার ব্যর্থ করছে। সংক্রমণ বাড়লেই তৎপরতা, কমলেই কাজের মধ্যে নিস্তব্ধতা নেমে আসে।

এই চক্র বহু বছর ধরে চলছে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন এডিস মশার প্রজননকে এমনভাবে বদলে দিয়েছে যে শীতকালেও সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে। সুতরাং যে রোগ সারা বছর সক্রিয়, তার সমাধান মৌসুমি পদ্ধতিতে সম্ভব নয়। 

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আমাদের পরিকল্পনার মূলভিত্তি হওয়া উচিত এর উৎস ধ্বংসের কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা। ফগিং বা স্প্রেতে মশা সাময়িক কমে, কিন্তু জন্মস্থান অক্ষত থাকলে কয়েক দিনের মধ্যে আবার বাড়ে।

তাই প্রতিটি ওয়ার্ডে স্থায়ীভাবে সাপ্তাহিক উৎস শনাক্ত অভিযান ও মাসিক উৎস ধ্বংস টাস্কফোর্স চালু করতে হবে। নাগরিকদের বাধ্যতামূলক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সিটি করপোরেশনের তদারকি আরো কঠোর হওয়া জরুরি। 

এ ছাড়া কীটনাশকের মান নিয়ন্ত্রণ এবং বৈজ্ঞানিক তত্ত্বাবধান ছাড়া ডেঙ্গু দমন হবে না। অতীতে অকার্যকর ওষুধ ব্যবহারের অভিযোগ ছিল, আবার অনেক সময় পুরনো ফর্মুলা দিয়েই অভিযান চলে। প্রয়োজন আন্তর্জাতিক মানসম্মত কীটনাশক ব্যবহার, গবেষণাপ্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করা এবং তদারকিতে বিশেষজ্ঞদের বাধ্যতামূলক উপস্থিতি।

জলাবদ্ধতা, বন্ধ ড্রেন, নির্মাণাধীন ভবনের খোলা পানি—এগুলো এডিস মশার স্থায়ী আবাসস্থল। বারোমাসি পরিকল্পনার একটি বড় অংশ হওয়া উচিত ড্রেনেজ সংস্কার, নির্মাণকাজে নিয়মিত পরিদর্শন এবং দু-একটি প্রোজেক্টভিত্তিক না করে সারা বছরের জন্য সব অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ করার উদ্যেগ নেওয়া।

আমাদের দেশে নগর পরিকল্পনায় চিরায়ত বিশৃঙ্খলা বিরাজমান। প্রশাসনের তদারকির অভাব এবং নাগরিকদের উদাসীনতা মিলিয়ে এডিস মশা যেন রাজ্যের মালিকানা পেয়েছে। শহর ও পৌরসভা, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তর—প্রতিটি সংস্থা আলাদাভাবে কিছু করছে, কিন্তু একীভূত কর্মপরিকল্পনা নেই। সরকারের বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে দায় ঠেলাঠেলি করা যেন প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বারোমাসি প্রস্তুতি না থাকলে রোগ বাড়লে হাসপাতালগুলো হিমশিম খেতেই থাকবে। যেমনটি কয়েক বছর ধরে হচ্ছে। প্রতিটি জেলা হাসপাতালে স্থায়ী ডেঙ্গু কর্নার, সারা বছর নার্স-চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ, পর্যাপ্ত স্যালাইন, প্লাটিলেট টেস্ট সুবিধা এবং দ্রুত রেফারেল ব্যবস্থা থাকতে হবে।

পুরো দেশে বা সিটি করপোরেশনগুলোতে প্রতিটি ওয়ার্ডের অলিগলিতে সংক্রমণের ডেটাভিত্তিক সিদ্ধান্তই হতে পারে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের মূল অস্ত্র। কোন এলাকায় কত সংক্রমণ, কোন ঋতুতে কোন প্রজাতির মশা বাড়ছে, কোন ওষুধ বেশি কার্যকর—এসব তথ্য নিয়মিত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ জরুরি। কিন্তু আমরা এখনো তথ্য-প্রতিবেদনের অভাবে নীতি গ্রহণ করি আন্দাজে।

ডেঙ্গুর পরিবর্তনশীল চরিত্রের ওপর নজর রেখে মাঠ পর্যায়ে এর গবেষণা বাড়াতে হবে। ডেঙ্গুর ভাইরাসের ধরন প্রতিবছর বদলায়, সংক্রমণের গতি বদলায়, রোগীর প্রতিক্রিয়াও পরিবর্তিত হয়। অথচ দেশে গবেষণা সীমিত, নীতি প্রণয়নে গবেষণাভিত্তিক সিদ্ধান্তের অভাব আরো সীমিত। প্রতিবছর একই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, কিন্তু রোগের আচরণ সে অনুযায়ী ধরা পড়ছে না।

এবারের সংক্রমণ পরিস্থিতি সবকিছু ছাপিয়ে ভয়াবহতা জানান দিচ্ছে। শীতের আমেজ এসে পড়লেও এর সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি, হাসপাতালজুড়ে রোগীর চাপ, মৃত্যুর মর্মান্তিক খবর অনেক বেশি। ১৭ নভেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে ৮৪ হাজার ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। মারা গেছে ৩৩১ জন, যা স্মরণকালে যেকোনো বছরের মৃত্যুসংখ্যার চেয়ে বেশি।

আমরা কি ডেঙ্গুকে সত্যিকারভাবে গুরুত্ব দিচ্ছি? যদি যথাযথ গুরুত্ব দিতাম, তাহলে বছর বছর একই ভুল, একই মৃত্যু, একই আতঙ্ক দেখতাম না। যেকোনো গণ সম্পর্কিত সমস্যা মোকাবেলায় নাগরিক আচরণ নিয়ন্ত্রণ রাখা সবচেয়ে কঠিন কাজ। এডিস মশা মানুষের ঘরেই জন্মায়। ফুলদানি, টব, ছাদ, বারান্দার টব, অল্প পানি জমা কোনো পাত্র পেলেই এডিসরা খুশি হয়ে বংশবিস্তার শুরু করে। তাই নাগরিকদের বাধ্যতামূলক সাপ্তাহিক ঘর পরিষ্কার কার্যক্রমকে আইনি কাঠামো ও সামাজিক আন্দোলনের পর্যায়ে নিতে হবে।

যত দিন আমরা আগের বছরের মতো একই মৌসুমি প্রচারণায় আটকে থাকব, তত দিন ডেঙ্গু দমবে না। ডেঙ্গু চরিত্র এখন বারোমাসি, তাই সমাধানও বারোমাসি হওয়া ছাড়া উপায় নেই। এটি কেবল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বা সিটি করপোরেশনের কাজ নয়। এটি সমগ্র রাষ্ট্র ও নাগরিক সমাজের যৌথ দায়িত্ব। সমন্বিত উদ্যোগ, বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা, কঠোর তদারকি এবং নাগরিক অংশগ্রহণ—এই চারটি স্তম্ভে পরিকল্পনা দাঁড়ালেই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। ডেঙ্গুকে নিয়ন্ত্রণ করতে হলে এখনই সময় সুসংগঠিত উপায়ে সারা বছরের জন্য গবেষণাভিত্তিক, কঠোর এবং জবাবদিহিমূলক বারোমাসি ডেঙ্গু পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের। জরুরি ভিত্তিতে তা করা না হলে আগামী বছরও আমরা একই প্রশ্ন করব, কোনো অবস্থায়ই দমছে না কেন ডেঙ্গু?

লেখক : অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com