বাংলাদেশের কৃষিনির্ভর অর্থনীতিতে প্রাণিসম্পদ খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এ খাত দুধ, ডিম ও মাংস উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, পুষ্টি নিশ্চিতকরণ, দারিদ্র্য হ্রাস, নারী উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং রপ্তানির সম্ভাবনায় একটি শক্তিশালী চালিকা শক্তি। ঠিক এই প্রেক্ষাপটে উদযাপিত হচ্ছে ‘জাতীয় প্রাণিসম্পদ সপ্তাহ ২০২৫’, যার প্রতিপাদ্য ‘দেশীয় জাত, আধুনিক প্রযুক্তি: প্রাণিসম্পদে হবে উন্নতি’। দেশীয় জাতের সংরক্ষণ ও উন্নয়ন, আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সঠিক প্রয়োগ, রোগ প্রতিরোধ ও প্রাণীর সমন্বিত স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি বিষয়ে দেশের খামারি ও উদ্যোক্তাদের সচেতনতা বৃদ্ধিতে এবার প্রথমবারের মতো দিবসটি আয়োজন করা হচ্ছে।
স্থির মূল্যে জিডিপিতে প্রাণিসম্পদ খাতের অবদান ১ দশমিক ৮১ শতাংশ, জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৩ দশমিক ১৯ শতাংশ, কৃষিজ জিডিপিতে এ খাতের অবদান ১৬ দশমিক ৫৪ শতাংশ। অর্থমূল্যে প্রাণিসম্পদ জিডিপির আকার দাঁড়িয়েছে ৯১ হাজার ৩৬ কোটি টাকা, যা গ্রামীণ অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখার পাশাপাশি জাতীয় প্রবৃদ্ধিতেও সরাসরি অবদান রাখছে। সব মিলিয়ে অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও পুষ্টি নিরাপত্তায় প্রাণিসম্পদ খাত অনন্য ও ক্রমবর্ধমান শক্তি। এসব তথ্য প্রমাণ করে– কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে প্রাণিসম্পদ একটি দ্রুত বর্ধনশীল ও সম্ভাবনাময় উপখাত।
বাংলাদেশে মাংস ও দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাত শিল্প সম্প্রসারিত হয়েছে; দেশে রয়েছে ১১টি মাংস এবং ১২টি দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রাণিসম্পদ খাতের ওপর নির্ভরশীল, যা প্রমাণ করে– দারিদ্র্য হ্রাস, টেকসই কর্মসংস্থান ও জাতীয় অর্থনীতির জন্য খাতটি একটি শক্তিশালী চালিকা শক্তি। দেশের প্রাণিসম্পদ খাতে সাম্প্রতিক সময়ে যে অগ্রগতি দৃশ্যমান, তার পেছনে রয়েছে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের বিভিন্ন উৎপাদনমুখী প্রকল্প এবং বেসরকারি উদ্যোক্তাদের ক্রমবর্ধমান বিনিয়োগ। এসব উদ্যোগের ফলে দেশে ডিম, দুধ ও মাংস উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা জনগণের প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
তবে উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রাণিস্বাস্থ্যের যত্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন রোগবালাই এখনও খাতটির বড় চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রাণিসম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রতিবছর ১৭ ধরনের বিভিন্ন রোগের প্রায় ৩৪ কোটি ডোজ টিকা উৎপাদন ও সারাদেশে বিতরণ করছে।
সাম্প্রতিক সময়ে উদ্ভূত লাম্পি স্কিন ডিজিজ নিয়ন্ত্রণে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে প্রায় ১৭ লাখ ডোজ টিকা প্রয়োগের মাধ্যমে রোগটির বিস্তার রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখা হচ্ছে। একই সঙ্গে ক্ষুরা রোগ নির্মূলের লক্ষ্যে সিরাজগঞ্জ, পাবনা, মানিকগঞ্জ ও ভোলা জেলাকে ‘মুক্ত অঞ্চল’ হিসেবে চিহ্নিত করে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ছাগলের অন্যতম প্রাণঘাতী সংক্রামক রোগ পিপিআর নিয়ন্ত্রণেও অগ্রগতি উল্লেখযোগ্য। সাম্প্রতিক সময়ে প্রায় ৬ কোটি ডোজ টিকা মাঠ পর্যায়ে প্রয়োগ করা হয়েছে, যা রোগটি নির্মূলে বড় ধরনের আশার বার্তা দিচ্ছে। সামগ্রিকভাবে, উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি প্রাণিস্বাস্থ্যের উন্নয়ন–উভয় দিকেই ধারাবাহিক অগ্রগতি দেশের প্রাণিসম্পদ খাতকে আরও শক্ত ভিত্তির দিকে এগিয়ে নিচ্ছে।
গবাদি পশু ও হাঁস-মুরগি উৎপাদন বাড়ার অন্যতম প্রধান শর্ত হলো সুষম খাদ্যের নিশ্চয়তা। দেশে এ খাদ্য ঘাটতি মোকাবিলায় উন্নতজাতের ঘাস, ফডার শস্য ও ভুট্টা চাষে খামারিদের উৎসাহিত করা এবং প্রয়োজনীয় বীজ-কাটিং সরবরাহে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। পাশাপাশি অঞ্চলভিত্তিক উন্নয়নেও রয়েছে বড় সম্ভাবনা। তবে সকল অগ্রগতির পরও প্রাণিসম্পদ খাতটি জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব, প্রাণিজাত খাদ্যের অপ্রতুলতা, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স, জুনোটিক রোগ এবং উদীয়মান-পুনঃউদীয়মান রোগ নিয়ন্ত্রণের মতো বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। বিশেষজ্ঞদের মতে, উদ্ভাবনী প্রযুক্তির ব্যবহার ও নতুন উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে প্রাণিসম্পদ খাতকে আরও শক্তিশালী ভিত্তির দিকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।
মো. মামুন হাসান: জ্যেষ্ঠ তথ্য কর্মকর্তা, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়