দেশের স্বাস্থ্য খাত সংস্কারের জন্য সরকার একটি কমিশন গঠন করে। এ বছরের এপ্রিল মাসে কমিশন একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। কমিশন জনস্বাস্থ্য উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ পেশ করে। স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে সাফল্যের মধ্যে রয়েছে– টিকাদান কর্মসূচি, পুষ্টি কর্মসূচি, মা-শিশু স্বাস্থ্য কার্যক্রম, সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ প্রভৃতি।
স্বাস্থ্য ক্ষেত্রের আর্থসামাজিক সূচকের মধ্যে নারীর ক্ষমতায়ন, নারীশিক্ষায় অগ্রগতির হার, দারিদ্র্যের হার হ্রাস ইত্যাদি স্বাস্থ্য ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তবে এখন আবার দারিদ্র্যের হার বাড়তির দিকে। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পার হলেও আজ পর্যন্ত সবার জন্য স্বাস্থ্য অর্জিত হয়নি। ২০৩২ সালের মধ্যে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হলেও এখন পর্যন্ত অর্ধেকের মতো মানুষ স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে না।
বর্তমানে স্বাস্থ্য খাতের কিছু সমস্যা
সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে অগ্রগতি হলেও এখনও ডেঙ্গুর মতো কীটপতঙ্গবাহিত রোগ, কলেরাসহ ডায়রিয়া, পেটের অসুখ, অপুষ্টিতে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ বিশেষ করে শিশুরা ভুগছে।
অসংক্রামক ব্যাধিতে ভোগা মানুষ ও এতে মৃত্যুর সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে। এসব অসংক্রামক ব্যাধি হচ্ছে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, ক্যান্সার, কিডনি রোগ, হাঁপানির মতো শ্বাসকষ্ট ইত্যাদি। মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাও বাড়ছে।
পানি ও বায়ুদূষণ দিন দিন বেড়েই চলছে। ফলে পেটের ও শ্বাসতন্ত্রের অসুখ প্রতিযোগিতা করে বেড়ে চলেছে।
স্বাস্থ্য খাত ও গণতন্ত্র
তৃণমূল পর্যায়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও মাধ্যমিক পর্যায়ে জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হলে জনসম্পৃক্ততা অত্যাবশ্যক। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যের অন্তর্গত অভীষ্টের অন্যতম লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার সুরক্ষা নিশ্চিত করা, যা ২০১৫ সাল থেকে শুরু হয়ে ২০৩০ সালে বাস্তবায়ন শেষ হবে। গণতন্ত্র ছাড়া জনসম্পৃক্ততা অর্জন অসম্ভব।
কমিউনিটি ক্লিনিক
কমিউনিটি ক্লিনিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে জনগণের অংশগ্রহণের ভালো মডেল। এটি পরিচালনা করার জন্য কমিউনিটি গ্রুপ ও কমিউনিটি সাপোর্ট গ্রুপ জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে।
কমিউনিটি গ্রুপ: এর সদস্য সংখ্যা ১৩ থেকে ১৫। নেতৃত্ব দেন স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য, যেখানে নারী ইউপি সদস্য এতে অগ্রাধিকার পান।
কমিউনিটি সাপোর্ট গ্রুপ: এর সদস্যও ১৩ থেকে ১৭ জন। প্রতিটি কমিউনিটি ক্লিনিকের জন্য একটি কমিউনিটি গ্রুপ ও তিনটি কমিউনিটি সাপোর্ট গ্রুপ আছে।
কমিউনিটি ক্লিনিকের কাজের মধ্যে রয়েছে: সেবাদানকারী, কমিউনিটি গ্রুপ, স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিবৃন্দ, বেসরকারি সংস্থাসমূহ, বিদ্যালয়, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ইত্যাদির মাধ্যমে জনগণের সম্পৃক্ততা সৃষ্টি। স্বাস্থ্যকর আচরণের উদ্দেশ্যে তৈরি বিভিন্ন প্রচারসামগ্রীর সহায়তা নিয়ে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা।
চৌগাছা-ঝিনাইদহ মডেল
এটি পরীক্ষামূলক আরও একটি জনসম্পৃক্ত উদ্যোগের উদাহরণ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ডা. এমদাদুল হকের জনসম্পৃক্ত কর্মধারাকে এ মডেল বলে অভিহিত করেছে। ডা. এমদাদ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক দুটি হাসপাতালেই কাজ করেছেন এবং জনসম্পৃক্ততা ঘটিয়েছেন। স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভেতরে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের জন্যও কাজ করেছেন। এই জনসম্পৃক্ত মডেল স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা দেশের সব জেলা-উপজেলাতে বাস্তবায়নের জন্য ২০১৭-১৮ সালে বেশ কিছু মানসম্মত কর্মপদ্ধতি (এসওপি) প্রণয়ন করা হয়েছিল।
এসওপি-তে অন্তর্ভুক্ত কার্যক্রম
পৌরসভা, কমিউনিটি সাপোর্ট কমিটির অংশগ্রহণে যেসব কর্মপদ্ধতি সম্পাদনের কথা বলা হয়েছে, সেগুলো হলো–
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্যবর্ধন কার্যক্রম
নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিতকরণ কার্যক্রম
স্বাস্থ্যশিক্ষা কার্যক্রম
রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম
মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও জেলা হাসপাতালে জনপ্রতিনিধিদের নেতৃত্বে ব্যবস্থাপনা কমিটি বা স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়ন কমিটি রয়েছে। জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে রয়েছেন স্থানীয় এমপি (মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রী হলে অগ্রগণ্য), পৌর মেয়র প্রমুখ। তবে বর্তমানে জনপ্রতিনিধির পদগুলো শূন্য রয়েছে এবং ইতোপূর্বে যখন পদগুলো শূন্য ছিল না, তখনও সেগুলো খুব একটা সচল ছিল না। হাসপাতালকেন্দ্রিক ব্যবস্থাপনা কমিটির চাইতে জনস্বাস্থ্য উন্নয়ন জনগণের কমিটি গঠন করা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ, যা নেই।
চিকিৎসক থেকে শুরু করে জনপ্রতিনিধি পর্যন্ত অনেকেই মনে করেন স্বাস্থ্য হচ্ছে শুধু চিকিৎসা, ওষুধপত্র, অপারেশন, রোগের পরীক্ষা। কিন্তু জনস্বাস্থ্য কার্যক্রম তথা রোগ প্রতিরোধ, স্বাস্থ্য উন্নয়ন না হলে যে রোগের প্রকোপ বাড়তেই থাকবে– এ জাতীয় ধারণাকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। রোগের বিস্তার ও রোগী সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে আনার চিন্তা যদি চিকিৎসা ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বিত না করা হয়, সে স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় সংকট লেগেই থাকে।
জনসম্পৃক্ততা কখন সফল হতে পারে
জনসম্পৃক্ততা তখনই সফল হতে পারে যখন তা গণতান্ত্রিক ও কল্যাণধর্মী চেতনায় পরিচালিত হয়। এটি কতিপয় জনপ্রতিনিধির ব্যক্তিগত খেয়ালখুশি চরিতার্থ করা, স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের ওপর খবরদারি করা, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে হস্তক্ষেপ করে দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়া নয়।
জনপ্রতিনিধি ও নাগরিক সংগঠনগুলোর মাধ্যমে অবদানের সুযোগ রয়েছে–
সরকারি সম্পদ অপ্রতুল হলে সেখানে সম্পদের জোগান দেবার পথ খুঁজে বের করা
জনবলের ঘাটতি হলে স্থানীয় সরকারের বাজেট থেকে জনবল সহায়তা করা
স্বেচ্ছাসেবকদের স্বেচ্ছাশ্রম দিতে উদ্বুদ্ধ করা
স্বাস্থ্যকর জীবনাচরণ অনুসরণে জনগণকে উৎসাহিত করা
রোগ নজরদারিতে তৃণমূলের মানুষকে সহায়তা করতে উৎসাহিত করা
মহামারির মতো স্বাস্থ্য জরুরি পরিস্থিতিতে রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে মানুষের পাশে দাঁড়ানো
স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদেরও গণতান্ত্রিক ও কল্যাণধর্মী চেতনায় বিশ্বাসী হতে হবে। জনগণের কথা শোনার মতো গণতান্ত্রিক মানসিকতার প্রয়োজন স্বাস্থ্যকর্মী তথা সরকারি কর্মীদের।
স্বাস্থ্য সংস্কারে গণমাধ্যম
স্বাস্থ্য ব্যবস্থা পরিচালনায় জনসম্পৃক্ততার অন্যতম উপাদান হচ্ছে গণমাধ্যম। স্বাস্থ্য কার্যক্রম, স্বাস্থ্য বার্তা, রোগ প্রতিরোধ ও স্বাস্থ্য উন্নয়নে জনকরণীয় প্রচারে এবং স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের কাছে জনমতকে পৌঁছে দেবার জন্য গণমাধ্যম অপরিহার্য।
জনস্বাস্থ্যের অপরিহার্য অংশ হচ্ছে ‘স্বাস্থ্যঝুঁকি জনঅবহিতকরণ ও জনসম্পৃক্তকরণ’ (Risk Communication & Community Engagement)। এটি জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল, বিশেষ করে জরুরি পরিস্থিতিতে এবং এটি গণমাধ্যম ছাড়া সম্ভব নয়।
রিস্ক কমিউনিকেশন
এটি এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে জনগণকে সম্ভাব্য বিপদ, স্বাস্থ্যঝুঁকি বা জরুরি পরিস্থিতি সম্পর্কে সঠিক, সময়োপযোগী এবং কার্যকর তথ্য দেওয়া হয়। যেমন: মহামারির সময় মানুষকে জানানো হয়– ভাইরাস কীভাবে ছড়ায়, কীভাবে প্রতিরোধ করা যায়, কোন তথ্য বিশ্বাসযোগ্য ইত্যাদি।
রিস্ক কমিউনিকেশন শুধু তথ্য দেওয়ার বিষয় নয়, তা মানুষের আচরণেও প্রভাব ফেলে। যখন বলা হয়–
ভাইরাস ছড়ায় হাঁচি-কাশির মাধ্যমে
মাস্ক পরলে সংক্রমণ কমে
হাত ধোয়ার অভ্যাস আপনাকে সুরক্ষিত রাখে
তখন মানুষ শুধু তথ্য জানে না, তারা নিজের আচরণ পরিবর্তন করে মাস্ক পরে, দূরত্ব বজায় রাখে, হাত ধোয়।
রিস্ক কমিউনিকেশন সফল হলে–
মানুষ ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন হয়
তারা বিশ্বাসযোগ্য উৎস থেকে তথ্য নেয়
তারা নিজের এবং অন্যের সুরক্ষায় পদক্ষেপ নেয়
জনসমাজ বা কমিউনিটি যুক্ত থাকলে তারা নিজেরাই উদ্যোগ নেয়
ভুল তথ্য ছড়ানো কমে, আস্থা বাড়ে
কমিউনিটি এনগেজমেন্ট
এটি হলো জনগণকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়নের অংশীদার করা। এতে জনগণের বিশ্বাস বাড়ে এবং তারা স্বাস্থ্য নির্দেশনা মেনে চলে। স্থানীয় ধর্মীয় নেতা, শিক্ষক বা কমিউনিটি হেলথ ওয়ার্কারদের যুক্ত করে জনস্বাস্থ্য কার্যক্রম পরিচালনা করলে তারা নিজের এলাকার মানুষকে সচেতন করতে পারেন। জনসম্পৃক্ততা জনগণের আস্থা গঠনে সাহায্য করে।
রিস্ক কমিউনিকেশনে গণমাধ্যমের ভূমিকা
বিশেষ করে জনস্বাস্থ্য দুর্যোগ বা সংকটকালীন পরিস্থিতি মোকাবিলার সময় গণমাধ্যম একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে।
তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া: গণমাধ্যম দ্রুত ও ব্যাপকভাবে জনগণের কাছে ঝুঁকি সম্পর্কিত তথ্য পৌঁছে দিতে পারে। যেমন– রোগের লক্ষণ ও প্রতিরোধ, নিরাপদ আশ্রয়স্থল, জরুরি টেলিফোন নম্বর।
সচেতনতা ও শিক্ষা বৃদ্ধি: টিভি, রেডিও, সংবাদপত্র, অনলাইন নিউজ সবই জনগণকে ঝুঁকির ধরন, কারণ এবং প্রতিকার সম্পর্কে সচেতন করে।
আচরণ পরিবর্তনে সহায়তা: যখন গণমাধ্যমে বারবার বলা হয় ‘মাস্ক পরুন’, ‘হাত ধুয়ে নিন’; তখন মানুষ তা অনুসরণ করতে শুরু করে। এটি আচরণগত পরিবর্তনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
গুজব ও ভুল তথ্য মোকাবিলা: বিশ্বাসযোগ্য গণমাধ্যম ভুল তথ্য বা গুজবের বিপরীতে সত্য তথ্য তুলে ধরে– যা জনগণের আস্থা গঠনে সহায়ক।
জনসমাজের কণ্ঠ তুলে ধরা: গণমাধ্যম স্থানীয় মানুষের অভিজ্ঞতা, মতামত এবং চাহিদা তুলে ধরে– যা নীতিনির্ধারণে সহায়তা করে।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার করতে হলে জনস্বাস্থ্যকে কেন্দ্র করেই তা করতে হবে। মানুষ যেমন সমাজকে গড়ে তোলে, তেমনি মানুষ তার স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও কৃষিকেও গড়ে তোলে। স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের কাজ হলো মানুষের সৃজনশীলতা প্রকাশের জন্য অনকূল পরিস্থিতি তৈরি করা ও সহায়তা করা।
একটি কার্যকর গণতন্ত্র চালু না থাকলে মানুষের সঙ্গে কর্তৃপক্ষের বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার সম্পর্ক হতে পারে না। স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কর্তৃপক্ষ ও মানুষের সম্পর্ক হয় রাজা-প্রজার মতো বৈরী সম্পর্ক। গণমাধ্যম মানুষকে তার স্বরূপ চিনতে সাহায্য করে। তেমনি স্বাস্থ্যের স্বরূপ সম্পর্কেও গণমাধ্যম মানুষকে অবহিত করে, মানুষকে সামাজিক কর্মের জন্য পথ খুঁজতে সাহায্য করে। মানুষের সংঘবদ্ধ ও সামাজিক সক্রিয়তা ছাড়া জনস্বাস্থ্যের উন্নয়ন সম্ভব নয়।
জনস্বাস্থ্য, গণতন্ত্র ও গণমাধ্যম একে অপরের হাত ধরাধরি করে এগিয়ে যেতে পারে। কেউ কাউকে ছেড়ে দিলে হোঁচট খেতে হবে।