বাংলার কৃষি সংস্কৃতি, শস্যনির্ভর জীবনচর্চা এবং প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের চিরন্তন সম্পর্ক। সবকিছুর এক অনন্য প্রকাশ ঘটে নবান্নে। সেই প্রাচীনতম কৃষি পর্বকে কেন্দ্র করে গতকাল রোববার বিকেলে রাজধানীর ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবর মুক্তমঞ্চ রঙিন হয়ে ওঠে নৃত্য, সংগীত, আবৃত্তি এবং নবান্নকথনের সমবেত সুরে। ‘নবান্ন উৎসব ১৪৩২’ উপলক্ষে ষড়ঋতু উদযাপন জাতীয় পর্ষদের এ আয়োজন হয়ে উঠেছিল সংস্কৃতিকর্মী, কবি, শিল্পী ও নাগরিক সমাজের এক মিলনমেলা।
উৎসবের শুরুতে সম্মিলিত কণ্ঠে জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হলে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে উচ্ছ্বাস। এর পর সংক্ষিপ্ত উদ্বোধনী পর্বে বক্তব্য দেন উপস্থিত লেখক, শিল্পী ও সুধীজন। সভাপতিত্ব করেন ষড়ঋতু উদযাপন পর্ষদের আহ্বায়ক এহসান মাহমুদ। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন পর্ষদের সদস্য সচিব দীপান্ত রায়হান।
বক্তারা বলেন, নবান্ন নিছক মৌসুমি উৎসব নয়। এটি বাংলার পরিশ্রমী মানুষের জীবন চেতনা, সমবায়ের রীতি, প্রকৃতিনির্ভর কৃষ্টি এবং শিল্প-সংস্কৃতির উজ্জ্বল ও জীবন্ত দলিল। নতুন ধানের গন্ধ, সোনালি প্রকৃতির রূপ আর কৃষকের কঠোর পরিশ্রমকে সম্মান জানানোর মধ্য দিয়েই নবান্নের দর্শন তৈরি হয়েছে বলে তারা উল্লেখ করেন।
উদ্বোধনের পর মঞ্চে শুরু হয় বর্ণিল পরিবেশনা। একে একে পরিবেশিত হয় দলীয় ও একক নৃত্য, কবিতা আবৃত্তি, গান এবং কবিদের কণ্ঠে কবিতা পাঠ। উৎসবে সংগীত পরিবেশন করেন আলেয়া বেগম, কোহিনূর আক্তার গোলাপী, ডলি মণ্ডল ও সাগর বাউল। তাদের কণ্ঠে কৃষিজীবনের গল্প, লোকজ ঐতিহ্য ও নবান্নের আনন্দ ধ্বনিত হতে থাকে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকলেও অসুস্থতার কারণে গান পরিবেশন করতে পারেননি সংগীতশিল্পী ফেরদৌস আরা।
নৃত্যশিল্পীদের নাচের ভঙ্গিমায় ফুটে ওঠে কৃষকের মাঠ-জীবন, প্রকৃতির রূপবৈচিত্র্য ও গ্রামবাংলার আবহ। গানের সুরে ভেসে আসে ফসল তোলার আনন্দ, সহযোগিতা ও সমবায়ের চেতনা। কবিতায় উচ্চারিত হয় বাংলার প্রাচীন কৃষিরীতি, বুনিয়াদি অনুভব এবং উৎসবের অন্তর্নিহিত মানবিক দর্শন।
অগ্রহায়ণ মাসে যখন আমন ধান পাকে, তখনই নবান্ন উৎসব উদযাপিত হয়। গতকাল রবীন্দ্র সরোবরে আয়োজিত নবান্ন উৎসবে নানা বয়সী দর্শনার্থীর শাড়ি, পাঞ্জাবি ও হাতে ফুল নিয়ে জড়ো হতে দেখা যায় দুপুরের পর থেকে। বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া আয়েশা তাবাসসুম বলেন, এই আয়োজন শুধু একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়। এর মাধ্যমে বাংলার শিকড়, কৃষি-ঐতিহ্য সম্পর্কেও জানতে পারছি।
আয়োজন শেষ হতে হতে রবীন্দ্র সরোবরের আকাশে যখন গোধূলির আলো ফুরিয়ে আসে, তখনও উৎসবমুখর পরিবেশে দর্শকদের মুখে লেগে থাকে নতুন ধানের গন্ধের মতো স্নিগ্ধ হাসি।
ষড়ঋতু উদযাপন জাতীয় পর্ষদের সভাপতি এহসান মাহমুদ বলেন, নবান্ন কেবল ফসলের আনন্দ নয়; এটি সাংস্কৃতিক পরিচয়ের শক্তিশালী বাহক। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এ উৎসব প্রবহমান থাক– এটাই কামনা।
সদস্য সচিব দীপান্ত রায়হান বলেন, আমাদের লক্ষ্য কৃষিভিত্তিক বাংলার ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা এবং শহুরে ব্যস্ততার মাঝেও মানুষকে প্রকৃতির সঙ্গে গভীর সম্পর্ক অনুভব করানো।