ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ [১০ জুলাই ১৮৮৫–১৩ জুলাই ১৯৬৯] বহুভাষাবিদ পণ্ডিত ব্যক্তি। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস অনুধাবনে তাঁর অবদান কখনও মুছে যাওয়ার নয়। চিরজীবন জ্ঞানসাধনা করে গেছেন। অধ্যাপনা, লেখালেখি ও কর্ম সুবাদে আত্মজ্ঞান ও আত্মোপলব্ধি সবার মধ্যে সঞ্চারে ছিলেন ব্যাকুল। সেটি হোক তাঁর ধর্মচেতনা কিংবা সমাজদর্শন, দুইয়ের মিলনে-মিশ্রণে বঙ্গীয় সমাজের জন্য অনন্য উদাহরণ রেখে গেছেন; যা আমরা সম্যক উপলব্ধি করতে পেরেছি বলে মনে হয় না। বিশ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত তাঁর কর্মের বিচরণকাল ছিল উপমহাদেশে, বিশেষভাবে বাংলা যখন সাম্প্রদায়িকতার উত্থান ও দংশন দ্বারা জর্জরিত। এই অভিঘাত বাংলার পতনশীল মুসলিম অভিজাত সমাজ ও উদীয়মান মুসলিম মধ্যবিত্ত নানাভাবে অনুভব করেছে। সেসবের মধ্য দিয়ে অন্তরের আলোয় চলবার পথ তৈরি সহজ ছিল না। সাম্প্রদায়িক চিন্তার আবর্তে তলিয়ে যাওয়ার অবকাশ তো নানাভাবে তৈরি হয়। সেসবের খানাখন্দে পা কাটলেও পথভ্রষ্ট কখনও হননি মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্। ‘গ্রন্থে আছেন শহীদুল্লাহ্’ শীর্ষক কবিতায় অনুপমভাবে লিখেছিলেন শামসুর রাহমান তাঁর মগজের নন্দিত নিকুঞ্জে আধ্যাত্মিক পাখির অমর্ত্য গান গুঞ্জরিত হওয়ার কথা। লিখেছিলেন ‘দুশ্চরিত্র সময়ের কাছে আপনাকে নতজানু হতে কেউ/দ্যাখেনি কখনো, আপনার আচকান পেয়েছে অক্ষয় পাখা/নিষ্কলুষ নীলিমায়।’
শহীদুল্লাহ্র জীবনের দুএকটি ঘটনার উল্লেখ এখানে আমরা করতে পারি। অভাবী পরিবারের মেধাবী ছাত্র হিসেবে বারবার ছেদ দিয়ে হলেও কৃতিত্বের সঙ্গে উচ্চশিক্ষার পথে চলছিলেন শহীদুল্লাহ্। কলকাতা মাদ্রাসা ও প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে স্নাতকের পাঠ সমাপন করে তাঁর ইচ্ছা ছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সংস্কৃতে এম.এ-র পাঠগ্রহণ করবেন। সবরকম যোগ্যতা তাঁর ছিল, তবে বাদ সাধলেন বিভাগীয়প্রধান বেদজ্ঞ পণ্ডিত সত্যব্রত সামশ্রমী। তিনি জানালেন, অহিন্দুকে শাস্ত্রের পাঠ তিনি দিতে পারবেন না। এই ঘটনা সেই সময়ে বিশেষ তোলপাড় জাগিয়েছিল। সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি ও মাওলানা মুহম্মদ আলী বেদজ্ঞ পণ্ডিতের এহেন আচরণের প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। তবে শিক্ষার্থী শহীদুল্লাহ্ ছিলেন অন্য অবস্থানে। তিনি এ নিয়ে বিশেষ উচ্চবাচ্য করেননি। কেবল বলেছিলেন, পণ্ডিতমশাই তাঁর অবস্থান থেকে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যেটা তিনি বুঝতে সক্ষম। ইতিহাসের কি বিচিত্র গতি, ছাত্র শহীদুল্লাহ্ সংস্কৃতি অধ্যয়নের বাসনা পূরণে অন্যতর ব্যবস্থা নিলেন উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখার্জি, তিনি তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ববিষয়ক নতুন বিভাগ খুললেন বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং এর প্রথম ছাত্র হিসেবে ভর্তি হলেন মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্। শহীদুল্লাহ্ যেন সংস্কৃত অধ্যয়ন করতে পারেন সে জন্য এমন অভিনব ব্যবস্থা নিয়েছিলেন স্যার আশুতোষ।
আমরা জানি, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর এর ফ্যান্টাসি সবচেয়ে স্বচ্ছভাবে ধরা দিয়েছিল ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র দৃষ্টিতে। ১৯৪৮ সালের ডিসেম্বরে পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সম্মেলনে তাঁর ভাষণ বুদ্ধিজীবীর সামাজিক ভূমিকার অনন্য উদাহরণ হয়ে আছে। তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা হিন্দু ও মুসলমান যেমন সত্য, তার চেয়ে বেশি সত্য আমরা বাঙালি। এটি কোনো আদর্শের কথা নয়, এটি একটি বাস্তব সত্য। মা প্রকৃতি নিজের হাতে আমাদের চেহারায় ও ভাষায় বাঙালিত্বের এমন ছাপ মেরে দিয়েছে যে, মালা-তিলক-টিকিতে কিংবা টুপি-লুঙ্গি-দাড়িতে ঢাকবার জো-টি নেই।’ এই অমোঘ বাণী অনেকের কানেই ভালো শোনায়নি। আজাদ পত্রিকা বিস্ময় প্রকাশ করে লিখেছিল, সাত্ত্বিক এই মুসলিম অধ্যাপক কবে আবার প্রকৃতির পূজারি হয়ে উঠলেন? এরপর ১৯৫০ সালের দাঙ্গা পূর্ববাংলা ও ভারতের পশ্চিমবাংলায় সমাজ-সংহতি টলিয়ে দিতে উদ্যত হয়। ঢাকার বুদ্ধিজীবী ও সারস্বত সমাজ দাঙ্গা প্রতিরোধে এগিয়ে আসে। ‘পূর্ব পাকিস্তানের নাগরিকগণের নিকট আবেদন’ শীর্ষক প্রচারপত্রে ৩৮ জন বুদ্ধিজীবী ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের বক্তব্য উচ্চারিত হয় এবং তারা দাঙ্গা প্রতিরোধে মিছিলের আয়োজন করেন। এই স্বাক্ষরদাতাদের মধ্যে সর্বাগ্রে রয়েছে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র নাম। তিনি স্বাক্ষর করেছেন ‘পূর্ববঙ্গ শান্তি ও পুনর্বসতি কমিটি’র প্রেসিডেন্ট হিসেবে। পাঠান্তে মনে হবে এই আবেদনও ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র মুসাবিদা করা। এখানে বলা হয়েছে, হজরত রসুল্লাহর (দ.) বক্তব্যে বলিয়াছেন, ‘উৎপীড়িত (মজলুম) যদি বিধর্মীও হয়, তাহার আর্তনাদ হইতে সাবধান হও।’ অন্যত্র বলা হয়েছে, ‘হিন্দু ভাইগণকে আমরা বলিব, আপনারা জননী জন্মভূমির স্বর্গাদপি গরিয়সী, সেই জন্মভূমিকে আতঙ্কগ্রস্ত হইয়া সহসা পরিত্যাগ করিবেন না।’ উভয় সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে বলা হয়েছে, ‘আমরা আমাদের হিন্দু মুসলমান ভাইগণকে এই বলিয়া সতর্ক করিয়া দিতে চাই যে, অতীতে পরস্পরের প্রতি হিংসা বিদ্বেষ প্রচার ও ঘৃণা প্রদর্শনের ফলে আমরা বহু কষ্ট পাইয়াছি, বর্তমানেও পাইতেছি অনেক হইয়াছে, আর নয়।’ শহীদুল্লাহ্ ও তাঁর সতীর্থদের বাণী আমাদের স্মরণ করতে হয়, অনেক হইয়াছে, আর নয়।
জীবনভর নানা ধরনের সামাজিক ভূমিকা পালন করেছেন মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্। তবে সেসব নিয়ে কখনও সোচ্চার হননি, কিংবা আত্মতৃপ্তি অনুভব করেননি। তাঁর সামাজিক ভূমিকার উৎস ছিল বুদ্ধিবৃত্তিক সাধনা, জ্ঞানার্জনে বিচরণের মধ্য দিয়ে তিনি আত্মোপলব্ধির চেষ্টা করেছেন এবং সেই উপলব্ধি থেকে নিজের অবস্থান নির্ধারণ করে বক্তব্য প্রচারে উদগ্রীব হয়েছেন। ১৯২১ সালে বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদে তিনি সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। বাংলা সাহিত্যে কাজী নজরুল ইসলামের আবির্ভাবের সঙ্গে তাঁর যুক্ততা রয়েছে। যে ‘মোসলেম-ভারত’ পত্রিকায় নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা পত্রস্থ হয়েছিল, তার সহসম্পাদক ছিলেন মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্। নজরুল ইসলামকে শান্তিনিকেতনে নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন শহীদুল্লাহ্। পরিচয়ের ফলে তাঁর সঙ্গে নিশ্চয় আরও কিছু কার্যকারণ যুক্ত হয়েছিল, আমরা দেখি নজরুলের ‘ধূমকেতু’ পত্রিকা প্রকাশ পেল রবিঠাকুরের অমন ব্যতিক্রমী আশীর্বাণী ঘিরে। বিশ্বখ্যাত প্রবীণ বাঙালি কবি প্রান্তিক বাংলা থেকে উঠে আসা নবীন কবির প্রতি আহ্বান জানালেন, চাবুক মেরে জাগিয়ে দিতে আছে যারা অর্ধচেতন, যা রবীন্দ্রনাথের স্বভাবসিদ্ধতার বাইরে কিছুটা যেন নজরুলীয়। পরের বছর দেখা গেল রাজদ্রোহিতার জন্য কারাদণ্ডপ্রাপ্ত নজরুলকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর উৎসর্গ করেছেন তাঁর ‘বসন্ত’ নাটক।
ঢাকায় মুসলিম সাহিত্য সংসদ যখন ‘বুদ্ধির মুক্তি’ আন্দোলন সূচনা করে, গোড়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবীন অধ্যাপক মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ তাঁর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তবে ধর্মের প্রশ্নে গোষ্ঠীর কোনো কোনো সদস্যের কটাক্ষ ও সমালোচনা শহীদুল্লাহ্র মনঃপূত ছিল না। তিনি একদিকে ছিলেন নিজ ধর্মে অটল আস্থাবান, পাশাপাশি অন্য ধর্মের প্রতি সহনশীল ও সমঅধিকারে বিশ্বাসী। এর অসাধারণ পরিচয় আমরা পাই জীবন-উপান্তে রচিত তাঁর এক ক্ষুদ্র নিবন্ধ ‘মরমী রবীন্দ্রনাথ’-এ। এই রচনারও রয়েছে এক কাহিনি।
১৯৬১ সালে রবীন্দ্রজন্মশতবর্ষ পূর্ববঙ্গে পালন নিয়ে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বৈরিতার মুখে শিল্প-সাহিত্যমনস্ক বাঙালি সারস্বত সমাজ বিপুল উদ্দীপনা নিয়ে তা পালন করে। বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবীদের বিবৃতি প্রকাশের মাধ্যমে সাংস্কৃতিক এই প্রতিরোধের সূচনা হয়েছিল এবং এই বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে সর্বাগ্রে ছিলেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্। পরে ১৯৬৭ সালে পাকিস্তানি তথ্যমন্ত্রী খাজা শাহাবুদ্দিন বেতার-টেলিভিশনে রবীন্দ্রসংগীত সম্প্রচার নিষিদ্ধ ঘোষণা করলে একটি বিবৃতির খসড়া নিয়ে ড. আনিসুজ্জামান তাঁর সমীপে হাজির হন। অনুজ প্রিয় ছাত্রকে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ বলেছিলেন, ‘আনিস, জীবনভর আমি বহু গালমন্দ হজম করেছি, এখন এই শেষ বয়সে নতুন করে আর গালিগালাজ শুনতে চাই না।’ আনিসুজ্জামান তাঁর গুরুর মানস সম্যক উপলব্ধি করতেন। তাই সে যাত্রা ফিরে এলেও পরে আবার এসেছিলেন রবীন্দ্রনাথবিষয়ক পূর্ববঙ্গের বুদ্ধিজীবীদের একটি সংকলন গ্রন্থের জন্য লেখা চেয়ে। শহীদুল্লাহ্ তখন বেশ অসুস্থ, তবু লেখা দেওয়ার তাগিদ নিজেই অনুভব করেছিলেন। আনিসুজ্জামানকে বলেছিলেন, তিনি প্রায় শয্যাগত, লেখার সামর্থ্য নেই, তবে তিনি মুখে মুখে বলবেন এবং আনিস যেন তা লিখে নেয়। এভাবে জন্ম নিয়েছিল রবীন্দ্রনাথের ওপর সুফি দর্শনের প্রভাব বিষয়ে সাড়ে চার পৃষ্ঠার নাতিদীর্ঘ অথচ বিপুল চিন্তাশীলতার বাহক রচনা, সাহিত্য-বিশ্লেষণে ইতিহাস-ঐতিহ্য কীভাবে কার্যকর হতে পারে তার অনন্য উদাহরণ এই রচনা। রবীন্দ্রনাথের তিনটি কবিতা বিশেষভাবে ‘উর্বশী’ ও ‘কৃপণ’ ঘিরে তিনি রবীন্দ্রচেতনার সঙ্গে পারস্যের কবি হাফেজের ভাব দর্শন ব্যাখ্যা করেছেন। অনায়াসে উদ্ধৃতি টেনেছেন কোরআন শরিফের আয়াতের, হাদিসের। সূচনায় তিনি ঠাকুর পরিবার, বিশেষভাবে রবীন্দ্রনাথের পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাফেজ-প্রীতির কিছু নিদর্শন দিয়ে রবীন্দ্রনাথের উদ্ধৃতির স্মরণ নিয়েছেন। লিখেছেন, ‘উপনিষদ তাহার ক্ষুধা মিটাইত, হাফেজ তাহার তৃষ্ণা।’
ধর্মাদর্শে ভালোবাসার অপার উৎস খুঁজে পেয়েছিলেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্। জ্ঞানসাধনায় গ্রন্থে সদা বুঁদ হয়েছিলেন তিনি। শামসুর রাহমান লিখেছিলেন, ‘গ্রন্থাবলী পড়ে আছে, লেখার টেবিলে, চশমা, কালো টুপিটায়/জমছে মসৃণ ধুলো এবং জায়নামাজ, পুণ্য স্মৃতিময়/নিবিড় গোছানো একপাশে।’ কিন্তু আমরা কিছুই শিখিনি, শুনিনি শহীদুল্লাহ্ সতর্কবাণী। আর তাই কবির মনে হয়েছে, ‘পেছনে সীমাহীন অন্ধকার ফেলে, শুধু/কতিপয় গ্রন্থ হয়ে উদাস গেলেন চলে অন্য অন্ধকারে।’ গ্রন্থে তিনি আছেন বটে, তবে সেই গ্রন্থের আলোয় পথ দেখার প্রচেষ্টা গ্রহণ না করে আমরা তো এখন বাংলা একাডেমির গ্রন্থভান্ডার দাঁড়িপাল্লায় ওজন দরে বিক্রি করে দিচ্ছি। সবার জন্য সমাজ গড়তে শহীদুল্লাহ্র অমোঘ সতর্কবাণীর দিকে মুখ ফেরানো ব্যতীত আমাদের উপায় নেই।