আশপাশে কয়েকটি কমলাবাগান আছে। এই বাড়িতেই দেখা হলো রূপাছড়ার স্থানীয় কৃষি উদ্যোক্তা এবং পরিবেশকর্মী তোফায়েল আহমেদের সঙ্গে। প্রায় ৫০ বছরের পুরনো ১০০ গাছের একটি কমলাবাগান রয়েছে তাঁর। বাগানটি তাঁর পিতামহ তৈরি করেছিলেন। আলাপচারিতার ফাঁকে বাগানের কমলা থেকে তৈরি জুস এলো। সুমিষ্ট, ফ্লেভারটাও দারুণ।
তিনি জানান, জুড়ীর কমলাবাগানগুলোর মূল কেন্দ্র মূলত সাতটি গ্রাম। এসব গ্রামের প্রায় ৯৮ ভাগ বসতি ফরেস্ট ভিলেজার। এখানকার শুকনাছড়া, হায়াছড়া, বেলবাড়ী, জরিছড়া, লাঠিছড়া, লালছড়া, রূপাছড়া এবং ডুমাবাড়ীতে প্রায় ৩০০ পরিবারের বাস। জুড়ীর মূল কমলাবাগানগুলো মূলত এসব পরিবারের মধ্যেই ছড়িয়ে আছে। গত এক দশকে নানা কারণে জুড়ীর কমলা চাষ কমে যাচ্ছিল। এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সম্পূর্ণ নিজের বুদ্ধিমত্তায় কমলা চাষে সাফল্য দেখিয়েছেন তোফায়েল আহমেদ। তিনি লক্ষ করেছিলেন, তিন-চার বছর ধরে নিজেদের বাগানে ফলন কমেছে। আশপাশের অনেক বাগানে মড়ক লেগে গাছ মরে যাচ্ছে। গাছে কিছু ক্ষতিকর পরজীবী উদ্ভিদের আক্রমণও কমলাগাছের উৎপাদনক্ষমতা ব্যাহত করছিল এসব উদ্ভিদ। তা ছাড়া ফলনের ভারে অনেক গাছের ডাল নিচের দিকে ঝুঁকে পড়েছিল। এতে গাছের নার্ভ সিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হয়, গাছ মরে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। আবার রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারে দু-এক বছর ভালো ফলন হলেও পরে গাছ মরে যায়। তোফায়েল আহমেদ এসব সমস্যা থেকে উত্তরণের একটি সহজ পথ বের করে কমলা চাষে সফল হয়েছেন। তাঁর বাগানের কমলা আকারেও বড়। চার থেকে পাঁচটিতে এক কেজি হচ্ছে।
সাধারণভাবে আমরা কমলাবাগান বলতে বুঝি বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে তৈরি করা কোনো পরিকল্পিত বাণিজ্যিক বাগান। কিন্তু জুড়ীর এসব বাগান ঠিক তেমন নয়। এখানে টিলাগুলোর ঢালে অন্যান্য গাছের পাশে কমলা চাষ করা হয়। যাঁরা সঠিকভাবে পরিচর্যা করেন, তাঁরা ভালো ফলন পান। তোফায়েল আহমেদ জানালেন, এ বছর তাঁর বাগানে গত বছরের তুলনায় ফলন কম হয়েছে। তবু প্রায় ১০০ গাছের এই বাগান থেকে তিনি এক লাখ টাকার কমলা বিক্রি করেছেন।
নানা কারণে এখানে কমলা চাষ ততটা বিকশিত হয়নি। অন্যতম প্রধান কারণ হলো, দুর্বল বাজার ব্যবস্থাপনা। চাষিদের অভিযোগ, মার্কেটিং পলিসি যথাযথ না হওয়ায় তাঁরা কমলার সঠিক মূল্য পান না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নানা রোগবালাই ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ। তবে কয়েক বছর ধরে চাহিদা বাড়লেও কমলা চাষ কমেছে বলে মনে করেন স্থানীয় সাংবাদিক কল্যাণ প্রসূন চম্পু। তিনি বলেন, বর্তমানে বাণিজ্যিকভাবে কমলা চাষ হয়—এমন বাগানের সংখ্যা ১৫০টির মতো। ২০০৮ সালের দিকে বাগানের সংখ্যা এর প্রায় দ্বিগুণ ছিল। তখন সবচেয়ে বেশি কমলা চাষ হতো জুড়ী-কুলাউড়া এলাকায়।
ধারণা করা হয়, কমলার আদি আবাস চীনের দক্ষিণাঞ্চল, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও মায়ানমার। সারা বিশ্বে অসংখ্য জাতের কমলা হলেও আমাদের দেশে মাত্র কয়েক জাতের কমলা দেখা যায়।
জুড়ীর কমলা প্রধানত খাসি ও নাগপুরি জাতের। বৃহত্তর সিলেট ছাড়াও দেশের তিন পার্বত্য জেলা ও সমতলের কোথাও কোথাও বিক্ষিপ্তভাবে কমলা চাষ হতে দেখা যায়। ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট উচ্চ ফলনশীল বারি-১ নামের একটি নতুন জাত আবিষ্কার করেছে। খাসিয়া জাতের কমলার ওজন ১৪০ থেকে ২২৪ গ্রাম, নাগপুরি জাতের ওজন ১১২ থেকে ১৬৮ গ্রাম ও বারি কমলা ১৮০ থেকে ২০০ গ্রাম ওজনের হয়।
কমলাগাছ আর বাতাবিলেবুগাছ প্রায় একই রকম। কমলাগাছের শাখা-প্রশাখা ছড়ানো, প্রায় ছয় মিটার উঁচু। পাতা কিঞ্চিৎ বাঁকা, ডিম্বাকৃতি ও অগ্রভাগ মোটা। ফুল সাদাটে, উভয় লিঙ্গ। ফল গোলাকার, উভয় দিকে খানিকটা চাপা। গা মসৃণ, খোসার আবরণের ভেতর টক-মিষ্টি স্বাদের কোষ থাকে। কমলার পুষ্টি ও ঔষধি গুণ অনেক। প্রতি এক শ ভাগ ফলে থাকে ০.৯ ভাগ প্রোটিন, ০.৩ ভাগ সহজপ্রাচ্য ফ্যাট, ১০.৪ ভাগ কার্বোহাইড্রেট, ০.৪ ভাগ খনিজ পদার্থ, ০.৫ ভাগ ক্যালসিয়াম, ০.২ ভাগ ফসফরাস, ০.১ ভাগ লৌহ। প্রতি ১০০ গ্রামে ভিটামিন ‘এ’ থাকে ৩৫০ আইইউ, বি-১ ১২০ মিলিগ্রাম ও ‘সি’ ৬৮ মিগ্রা। তা ছাড়া প্রতি কেজি ফলে ৪৯০ ক্যালরি শক্তি পাওয়া যায়। কমলার তাজা খোসা, শুকনা খোসা, পাতা, ফুলের নির্যাস—সব কিছুই নানা অসুখে ব্যবহার্য। পাতা ও ফলের খোসা থেকে তৈরি হয় সুগন্ধি তেল। বংশবৃদ্ধি বীজ ও কলমে।