সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১২:৪৩ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

নারীর নিজস্বতা এবং পোশাকের রাজনীতি

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: সোমবার, ১০ নভেম্বর, ২০২৫
  • ২১ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশ হচ্ছে নদী, জোয়ার ও ঝড়-বৃষ্টির দেশ। এখানকার নারীরাও আবহমানকাল থেকে এই বদ্বীপের প্রাকৃতিক ও আবহাওয়াগত গতিপ্রকৃতি মেনে জীবন যাপন করে আসছেন; ভোরের আলো ফোটার আগে ধান বুনেছেন, বাদলের ধারায় ভিজে ভিজে কলসি ভরে পানি বয়ে এনেছেন। আবার পরিবার ও সমাজের নেতৃত্বে থেকেছেন; সন্তানের শিক্ষা-দীক্ষার প্রশ্নে সবচেয়ে সোচ্চার থেকেছেন; রাজনৈতিক প্রয়োজনে রাজপথেও আওয়াজ তুলেছেন। হাজার নদীর এই দেশে নারীর মর্যাদা কাপড়ের মাপ বা রঙ দিয়ে বিচার করা হয়নি। অথচ এখন নারীর জন্য ‘হিজাব’ আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে হাজির হয়েছে। শুরুতে যেটা ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের প্রতীক ছিল, তা এখন কারও কারও ক্ষেত্রে চাপিয়ে দেওয়া নিয়মে রূপান্তরিত হয়েছে।

ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের ক্ষেত্রে পবিত্র কোরআনে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে শালীনতা রক্ষার কথা বলা হয়েছে। বিশ্বাসীদের দৃষ্টি সংযত রাখতে, নিজেদের সম্মান রক্ষায় সচেষ্ট হতে এবং এমনভাবে পোশাক পরতে বলা হয়েছে, যাতে অবাঞ্ছিত মনোযোগ আকৃষ্ট না হয়।

বস্তুত সুনির্দিষ্ট ছাঁচে বাঁধা হিজাব অপেক্ষাকৃত সাম্প্রতিক উদ্ভাবন; মূলত বিশ শতকে সৌদি আরবে উদ্ভূত ওয়াহাবি ধ্যান-ধারণায় প্রভাবিত। পোশাকের এই প্রবণতা কখনও কখনও কারও কারও ক্ষেত্রে মনের ভক্তির চেয়ে ধার্মিকতার বাহ্যিক প্রকাশকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকে। আর ওয়াহাবি ধ্যান-ধারণায় পোশাকের যে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়, সেটার সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে চর্চিত বহুত্ববাদী ইসলামের সহজাত সম্পর্ক নেই।

এদিকে বাংলার নারীরা ঐতিহাসিকভাবেই তাদের ভৌগোলিক ও সামাজিক ঐতিহ্যের পথ ধরে শাড়ি কিংবা সালোয়ার-কামিজ পরে ওড়না বা শাড়িরই আঁচল বাড়তি আচ্ছাদন হিসেবে ব্যবহার করেছেন স্বাচ্ছন্দ্যে ও সমহিমায়। তাদের পোশাক ছিল আবহাওয়া উপযোগী, নান্দনিক ও শালীন, যা সমাজে তাদের অংশগ্রহণকে কখনও ম্লান করেনি। বাংলায় নারীর ধর্মবিশ্বাস ছিল একান্তই ব্যক্তিগত। শালীনতা মাপা হতো আচরণ, সদিচ্ছা ও শ্রদ্ধাবোধে– কাপড় বা পোশাকের ভিত্তিতে নয়। হিজাবও সেই ক্ষেত্রে কারও কারও পছন্দ হতেই পারে। কিন্তু এটাকে সর্বজনীন বাধ্যবাধকতা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার মানে হলো, এ দেশের মুসলিম নারীর শত শত বছরের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে অবজ্ঞা করে আরবীয় অনমনীয় দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রতিস্থাপন করা।

বাংলাদেশের ইসলাম সব সময়ই বহুমাত্রিক ও বহুআয়তনিক; সুফি-সাধকদের দরগাহ ও খানকাহ সংস্কৃতি, লোকজ আচার, মরমি সংগীত ও কবিতা এবং স্থানীয় প্রথাগুলোর মাধ্যমে এখানকার মানুষ যে ধর্মকে যাপন বা অনুধাবনের পথ বেছে নিয়েছে। স্রষ্টার সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের অগণিত পথ রয়েছে। কেবল এক ধরনের পরিচ্ছদই মুসলিম নারীর পরিচয় বহন করে– এমন দাবি এদেশীয় ধর্ম পালনের গভীর ও মৌলিক বৈচিত্র্যকে নাকচ করে। এটি একটি জীবন্ত, প্রাণবন্ত ঐতিহ্যকে একদর্শী মতাদর্শে পরিণত করার নামান্তর।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে নারীর পোশাকের বিষয়টি রাজনৈতিক হয়ে উঠেছে। বিশেষত বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্রীদের হিজাব বা স্কার্ফ পরাকে কেন্দ্র করে বিতর্ক এবং কখনও কখনও বৈরীতা দেখা দিচ্ছে। কর্তৃপক্ষও এমন পোশাকবিধি জারি করছে, যা সূক্ষ্ম ও প্রচ্ছন্নভাবে পোশাকের ব্যাপারে নারীর পছন্দ-অপছন্দকে অগ্রাহ্য করে নির্দিষ্ট ধারার পোশাক বাধ্যতামূলক করে তোলে। এমনকি জনপরিসরে হিজাবকে নৈতিকতা বা ধর্মীয় নিষ্ঠার মাপকাঠি হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। এর নেপথ্যে একটি রাজনৈতিক মডেলের বিস্তার রয়েছে বলেও মত আছে। এতে প্রকাশ্য আনুগত্যকে ধার্মিকতা এবং বাধ্যতাকে আধ্যাত্মিকতার প্রতীক মনে করা হয়। আরোপিত শালীনতা পরিমাপক হয়ে ওঠে; আর পছন্দের স্বাধীনতা হয়ে দাঁড়ায় অপরাধ।

পোশাকের শালীনতা কখনোই অগ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু নিজের শালীনতার বিশ্বাসকে অপরের ওপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়া যায় না এবং পোশাক নির্বাচনের ক্ষেত্রে নারীর স্বাধীনতা আপসযোগ্য নয়। যখন কোনো নারী নিজস্ব বিশ্বাস থেকে তাঁর চুল বা মুখ আবৃত করেন, তা পবিত্র। কিন্তু যখন তাঁকে চাপিয়ে দেওয়া হয় বা নজরদারি করা হয়, তা হয়ে ওঠে নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার।

আমাদের নারীরা ঐতিহাসিকভাবেই প্রতিরোধ, সৃজনশীলতা ও বহুত্ববাদী সংস্কৃতির উত্তরাধিকারী। বেগম রোকেয়া থেকে সুফিয়া কামাল পর্যন্ত বাঙালি নারীরা লিখেছেন, শিখিয়েছেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং বিদ্রোহ করেছেন। তারা বুঝেছিলেন, শালীনতা বিবেচিত হয় সাহস, কর্ম ও মর্যাদাবোধের ভিত্তিতে; সুনির্দিষ্ট বস্ত্রের ভিত্তিতে নয়।

কথা হচ্ছে, একজন নারী হিজাব বা ওড়না বেছে নিতে পারেন অথবা না-ও নিতে পারেন এবং উভয় পছন্দই তাঁর বিশ্বাসের বৈধ অভিব্যক্তি। শালীনতা পরিমাপের ভিত্তি হলো সদিচ্ছা ও আন্তরিকতা; চাপিয়ে দেওয়া নির্দিষ্ট ধরনের পোশাক নয়। এই বাংলাদেশে আমাদের নিজস্ব ঐতিহ্য, বহুত্ববাদী চেতনা এবং নারীর সাহসকে অবশ্যই সম্মান জানাতে হবে। প্রত্যেক নারী নিজে সিদ্ধান্ত নিন, কীভাবে তিনি তাঁর বিশ্বাসকে যাপন করবেন, কীভাবে বিশ্বে বিচরণ করবেন এবং কীভাবে তার আত্মমর্যাদা প্রকাশ করবেন। এই নীরব অথচ সুদূরপ্রসারী স্বাধীনতাই হলো আত্মসম্মানের শ্রেষ্ঠতম রূপ। এটাই সেই বাংলাদেশের ভিত্তি, যেখানে বিশ্বাস ও স্বাধীনতা সহাবস্থান করে; যেখানে হৃদয়ই শালীনতার উৎস। যেখানে নারীর কণ্ঠস্বর বাঁধনমুক্ত, জবরদস্তিহীন ও নির্ভীকভাবে বদ্বীপের সমাজ, সংস্কৃতি, প্রকৃতি ও আবহাওয়ার চিরায়ত আখ্যান বর্ণনা করে যেতে থাকে।

আনুশেহ আনাদিল: সংগীতশিল্পী ও সমাজকর্মী

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com