বাংলাদেশ জনসংখ্যা ও স্বাস্থ্য জরিপ এবং অন্যান্য গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের প্রায় অর্ধেক ডায়াবেটিক রোগীই জানে না তারা আক্রান্ত। জটিলতা দেখা না দেওয়া পর্যন্ত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয় না অনেকেই। ডায়াবেটিস বড় একটি অর্থনৈতিক বোঝাও। ওষুধ, পরীক্ষা, চিকিৎসা এবং হাসপাতালে ভর্তি খরচের পাশাপাশি কর্মক্ষমতা হ্রাস ব্যক্তি ও জাতীয় পর্যায়ে প্রভাব ফেলে। অনেক পরিবারকেই ডায়াবেটিসের চিকিৎসা ব্যয়ে আর্থিক সংকটে পড়তে হয়।
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশে ডায়াবেটিস ব্যবস্থাপনায় এখনো অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যেমন—
► সচেতনতার অভাব : সাধারণ জনগণ, বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলে ডায়াবেটিস প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান রাখে না।
► স্ক্রিনিং ও প্রাথমিক শনাক্তকরণে ঘাটতি : নিয়মিত রক্তে শর্করা পরীক্ষা বা ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের স্ক্রিনিং ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়।
► স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা : উপজেলা বা ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ডায়াবেটিস সেবার জন্য পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি ও প্রশিক্ষিত জনবল নেই।
► অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন : অতিরিক্ত চিনি, তেল-চর্বিযুক্ত খাবার ও জাংক ফুড গ্রহণ এবং শারীরিক পরিশ্রমের অভাব ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।
► সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাধা : ইনসুলিন ব্যবহারের ভয়, রোগ সম্পর্কে ভুল ধারণা এবং পারিবারিক সহায়তার অভাবও চিকিৎসা বাধাগ্রস্ত করে।
উত্তরণের উপায়
ডায়াবেটিস এখন বাংলাদেশে এক নীরব মহামারিতে রূপ নিয়েছে, যা জাতীয় উৎপাদনশীলতা ও জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি। এটি মোকাবেলায় প্রতিরোধই হতে হবে প্রধান কৌশল। জনসচেতনতা বৃদ্ধি, প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তকরণ, স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং সরকার-বেসরকারি খাতের যৌথ প্রচেষ্টার মাধ্যমে এই সংকট মোকাবেলা সম্ভব।
জাতীয় নীতিমালা ও পরিকল্পনা বাস্তবায়ন: ডায়াবেটিস প্রতিরোধ ও চিকিৎসাকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
জনসচেতনতা বৃদ্ধি: গণমাধ্যম, স্কুল, কর্মক্ষেত্র ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সচেতনতা কর্মসূচি পরিচালনা করা উচিত। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম, ধূমপান পরিহার এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে উৎসাহিত করতে হবে।
স্ক্রিনিং: অতিরিক্ত ওজন, পরিবারে ডায়াবেটিসের ইতিহাস আছে এমন ব্যাক্তিদের নিয়মিত ডায়াবেটিস পরীক্ষা করা জরুরি।
জীবনধারা পরিবর্তনের উদ্যোগ: ব্যায়াম ক্লাব, স্বাস্থ্যকর খাবারের প্রয়োজনীতা সম্পর্ৎকে প্রচার এবং অফিসে স্বাস্থ্যবান্ধব নীতিমালা গ্রহণ করা যেতে পারে।
ডায়াবেটিক রোগীর করণীয়
► রক্ত পরীক্ষা : ডায়াবেটিস শনাক্তে নিয়মিত গ্লুকোজ পরীক্ষার বিকল্প নেই। এতে সঠিক সময়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।
► সুষম খাবার : সঠিক পরিমাণে সুষম খাবার গ্রহণ ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সহায়ক। পর্যাপ্ত শাক-সবজি, স্বাস্থ্যকর প্রোটিন অন্তর্ভুক্ত করুন খাদ্যতালিকায় এবং শর্করার পরিমাণ কমান।
► নিয়মিত ব্যায়াম : প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট ব্যায়াম করলে রক্তে শর্করার মাত্রা কমবে। হাঁটা, সাঁতার বা সাইক্লিং করা যেতে পারে।
► পর্যাপ্ত পানি পান : রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি থাকলে শরীর থেকে পানি দ্রুত নিঃসৃত হয়। তাই পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে।
► ওজন নিয়ন্ত্রণ : দেহের সঠিক ওজন ধরে রাখা ডায়াবেটিসের ঝুঁকি এবং এর জটিলতা কমাতে সাহায্য করে। সঠিক ডায়েট ও ব্যায়ামের মাধ্যমে ওজন নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
► পর্যাপ্ত ঘুম : অনিয়মিত বা কম ঘুম রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে। প্রতিদিন সাত-আট ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন ঘুম প্রয়োজন।
► ওষুধ : চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ইনসুলিন বা অন্যান্য ওষুধ গ্রহণ করা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
► মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ : অতিরিক্ত মানসিক চাপ রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়ায়। ধ্যান, যোগব্যায়াম বা শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম করে মানসিক চাপ কমানোর চেষ্টা করুন।
► পায়ের যত্ন : ডায়াবেটিক রোগীদের প্রতিদিন পা পরীক্ষা করা জরুরি। কোনো ক্ষত বা সংক্রমণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিন।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক
এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ
বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়