চীনের হুনান প্রদেশের রাজধানী চাংশা থেকে প্রায় ৬০০ কিলোমিটার দক্ষিণে, পাহাড়ঘেরা এক জেলা শও ইয়েনি। ২০০৬ সালে হাইব্রিড ধানের জনক ইয়ন লং পিংয়ের সাক্ষাৎকার নিতে আমার চীন ভ্রমণের সুযোগ হয়। শও ইয়েনির পাহাড়ি এলাকার ধানক্ষেতের ভেতর দিয়ে হাঁটছিলাম। যত দূর চোখ যায়, সবখানেই হাইব্রিড ধানের বীজের ক্ষেত।
গোটা চীনের হাইব্রিড ধানবীজ উৎপাদনের সূতিকাগার বলা হয় এই শও ইয়েনিকে।
এই জেলার প্রায় ছয় হাজার হেক্টর জমিতে হাইব্রিড ধানের বীজ উৎপাদন হয়, যা চীনের মোট চাহিদার বিরাট অংশ পূরণ করে। এখান থেকেই বহু দেশে বীজ রপ্তানি হয়। পুরো এলাকাটি পাহাড়বেষ্টিত, ফলে বাইরের ধানগাছের পরাগ এই অঞ্চলের ফসলকে দূষিত করতে পারে না।
তারা তখনই ঘোষণা করেছিল, তাদের খাদ্য নিরাপত্তা শতভাগ নিশ্চিত। তখন মনে হয়েছিল, আমাদেরও ভাবার সময় এসেছে, আমরা কিভাবে নিজেদের জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা পূরণ করব।
চীনে ১৯৭৬ সাল থেকে বাণিজ্যিকভাবে হাইব্রিড ধান উৎপাদন শুরু। সরকার প্রথমে কৃষকদের ভর্তুকি দেয়, গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ায়, আর কৃষকদের প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ দেয়। গত শতকের আশির দশকে বেসরকারি কম্পানিগুলোর অংশগ্রহণে এক নতুন কৃষি বিপ্লব শুরু হয়।
আমার দেখা শও ইয়েনির কৃষকরা ছিলেন আশ্চর্য পরিশ্রমী এবং প্রযুক্তি সচেতন। গ্রামের এক চাষি হো, যিনি চুক্তিভিত্তিক ইয়ান লং পিং হাই-টেক অ্যাগ্রিকালচার কম্পানির জন্য বীজ উৎপাদন করতেন। আমাকে বলেছিলেন, ‘আমি আগে ধান আবাদ করতাম, পরে বীজ উৎপাদন শুরু করি। এখন আয় অনেক বেড়েছে। ইয়ান লং পিং কম্পানির প্রযুক্তি সহায়তা পেয়ে আমাদের কৃষকরা এখন উন্নতমানের বীজ উৎপাদন করছেন। কয়েক বছর ধরে আমার উৎপাদিত বীজ বাংলাদেশেও যাচ্ছে।’
আমি তখন চাষির ক্ষেতের পাশে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম। ধান কেটে ফেলার পরই নারীরা হাতে চালনি নিয়ে বীজ ঝাড়ছেন, আবার পুরুষরা কাঠের বাক্সে বীজ ভরছেন। চীনের কৃষিতে নারীদের উপস্থিতি আমাকে মুগ্ধ করেছিল।
গ্রামের এক নারী কৃষক দিপাফ। তিনি বলেছিলেন, ‘আগে স্থানীয় জাতের ধান চাষ করতাম। পরে ইয়ান লং পিং কম্পানির সঙ্গে চুক্তি করি। এখন আমরা দুই লাইন, তিন লাইন পদ্ধতিতে হাইব্রিড বীজ উৎপাদন করি। আমাদের এলাকার সব নারী-পুরুষ এখন হাইব্রিড বীজের চাষ করছেন।’
চীনের হুনান প্রদেশের হাইব্রিড বীজ উৎপাদন ব্যবস্থা এখন সারা বিশ্বে বিস্তৃত। ১৯৯১ সালে যেখানে চাহিদা ছিল দুই লাখ ৩৮ হাজার টন, ২০০৩ সালে তা প্রায় আড়াই লাখ টনে পৌঁছে। বর্তমানে চীন শুধু নিজেদের চাহিদাই মেটায় না, বরং প্রায় ৫০টি দেশে হাইব্রিড ধানের বীজ রপ্তানি করে, এর মধ্যে বাংলাদেশও আছে।
২০০৫-০৬ মৌসুমে বাংলাদেশ প্রাইভেট সেক্টরে দুই হাজার ৫০০ মেট্রিক টন হাইব্রিড ধান বীজ আমদানি করেছিল, স্থানীয়ভাবে উৎপাদন হয়েছিল প্রায় ৮০০ মেট্রিক টন। পরের বছরই আমদানি বেড়ে ছয় হাজার মেট্রিক টনে পৌঁছে। চীনের ইয়ান লং পিং হাইটেক অ্যাগ্রিকালচার কম্পানি লিমিটেড বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ হাইব্রিড বীজ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। তাদের আন্তর্জাতিক প্রকল্প ব্যবস্থাপক আমাকে বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশে আমরা প্রতি হেক্টরে দুই থেকে তিন টন পর্যন্ত হাইব্রিড এফ-১ বীজ উৎপাদন করতে পারছি।’
চীন তাদের খাদ্য নিরাপত্তাকে দীর্ঘ মেয়াদে টিকিয়ে রাখার জন্য হাইব্রিড ধানকে ‘প্রেসক্রিপশন’ হিসেবে গ্রহণ করেছে। নিজেদের দেশকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার পাশাপাশি তারা বিশ্বের ধান উৎপাদনকারী দেশগুলোতে হাইব্রিড বীজ রপ্তানির বাজার গড়ে তুলেছে।
আজ, ২০২৫ সালে দাঁড়িয়ে যখন আমি পেছনে তাকাই, ২০০৬ সালের শও ইয়েনি সফরের দৃশ্যগুলো নতুন করে মনে পড়ে। চীন তখন হাইব্রিড ধান উৎপাদনে বহুদূর এগিয়েছে, বাংলাদেশে তখনো হাইব্রিড ধান উৎপাদন ছিল শূন্যের কোঠায়। তবে আজ বাংলাদেশে হাইব্রিড ধান যেমন চাষ হচ্ছে, উচ্চফলনশীল ধান উৎপাদনেও দেশ এগিয়ে যাচ্ছে।