একজন পণ্ডিত বলেছিলেন, শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো একটি ঘোড়াকে নদীর পারে নিয়ে যাওয়া এবং তাকে তৃষ্ণার্ত করা। বর্ণপরিচয়ের শিক্ষার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এটি জ্ঞানের তৃষ্ণা তৈরি করে না। ফলে মৌলিক দক্ষতা তৈরি হতে পারে না। একটি ঔপনিবেশিক শক্তি তাদের উপনিবেশে যে শিক্ষা দিত, তার লক্ষ্যই ছিল শাসনকাজ চালানোর মতো কিছু স্বল্প দক্ষ কর্মী তৈরি করা।
লর্ড ওয়াভেল যখন তাঁর প্রতিবেদন পাঠিয়েছিলেন, তার দুই বছরের মধ্যে ভারতবর্ষ স্বাধীনতা পায়। এর দুই দশকের কম সময়ের মধ্যেই পৃথিবীর প্রায় সব উপনিবেশই স্বাধীনতা পেয়ে যায়। একটি ঔপনিবেশিক শক্তির প্রধান ব্যক্তি তাঁর কলোনির অধিবাসীদের প্রতি যে কাজের জন্য অনুতাপ অনুভব করেছিলেন, সেই কাজের পুনরাবৃত্তি যে স্বাধীন হওয়া উপনিবেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা করবেন না, সেটিই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু স্বাভাবিক কাজটিও কখনো কখনো হয় না।
উপনিবেশ থেকে স্বাধীন রাষ্ট্র হয়ে যাওয়ারও প্রায় অর্ধশতাব্দী পরও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিচালিত কিছু র্যানডোমাইজড কন্ট্রোল ট্রায়ালের ভিত্তিতে দেখা যায়, শিক্ষাব্যবস্থা এখনো বর্ণপরিচয়ের শিক্ষার গণ্ডি থেকে খুব বেশি অগ্রসর হতে পারেনি। অভিজিৎ ব্যানার্জি তাঁর ‘Poor economics’ বইয়ে লিখেছেন, অনুন্নত/উন্নয়নশীল দেশের শিক্ষাব্যবস্থা দুটি মূল কাজ করতে ব্যর্থ হয়েছে। প্রথমটি হলো তাঁর সব ছাত্রের মধ্যে কিছু মৌলিক দক্ষতা তৈরি করতে পারেনি এবং দ্বিতীয়ত, এটি তাঁর ছাত্রদের মেধা চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হয়েছে।
শিক্ষাব্যবস্থা যদি মেধা চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে এর সুবিধা পাবে সমাজের প্রিভিলেজড গোষ্ঠীর কিছু মানুষ। কেননা তাদের মেধা চিহ্নিত করার জন্য উপর্যুপরি চেষ্টা করার মতো সময় এবং অর্থ আছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আরো ভয়ংকর রূপ নেয় একটি ভিন্ন ধরনের সামাজিক প্রবণতা, যা প্রায় দেড় দশক আগে শুরু হয়েছিল; যেখানে বলা হতে থাকে ‘রেজাল্ট দিয়ে কিছু যায় আসে না’, ‘সিজিপিএ কম মানে তুমি ফেল না’। পরীক্ষার ফলাফল বা সিজিপিএ দিয়ে মেধা যাচাই করা যায় না, খারাপ ফলাফল মানেই ব্যর্থতা নয়, বরং তা অন্য রকম সম্ভাবনার ইঙ্গিত—এই জাতীয় বক্তব্যকে মোটিভেশনাল আলাপ হিসেবে ব্যাপকভাবে উপস্থাপন করা হতে থাকে।
এ ধরনের বক্তব্য আপাতদৃষ্টিতে কোমল ও উৎসাহব্যঞ্জক মনে হতে পারে, বিশেষ করে যারা পরীক্ষায় ভালো করতে পারেনি তাদের জন্য। কিন্তু গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যায়, এই বক্তব্যগুলো একটি বিপজ্জনক সামাজিক অসুস্থতার ইঙ্গিত দেয়, যার প্রভাব দীর্ঘ মেয়াদে শিক্ষাব্যবস্থা, সামাজিক মূল্যবোধ এবং জাতির মেধাভিত্তিক কাঠামোকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়টি ছিল, এই কথিত উৎসাহমূলক বার্তাগুলো শুধু খারাপ ফল করা শিক্ষার্থীদের সান্ত্বনা নয়, বরং পরোক্ষভাবে ভালো ফল করা শিক্ষার্থীদের শ্রম, অধ্যবসায় এবং অর্জনকে খাটো করে দেখানো হয়েছে।
এখানে ‘গ্রেসাম’স ল’-এর প্রাসঙ্গিকতা গভীরভাবে অনুভব করা যায়। এই সূত্রটি বলে, ‘খারাপ মুদ্রা ভালো মুদ্রাকে বাজার থেকে বিতাড়িত করে।’ একইভাবে যখন মেধা, শৃঙ্খলা ও অধ্যবসায়ের মূল্যায়ন না করে শুধু ব্যতিক্রমী উদাহরণ দিয়ে ব্যর্থতাকে বৈধতা দেওয়া হয়, তখন প্রকৃত মেধাবীরা সমাজে গুরুত্ব হারায়। ভালো ফল বা জ্ঞানভিত্তিক সাফল্যকে যখন অবজ্ঞা করা হয়, তখন সে সমাজে জ্ঞানচর্চা ও মানসম্মত শিক্ষার আকর্ষণ কমে যায়। ফলাফল হিসেবে গড়ে ওঠে এক প্রজন্ম, যারা অধ্যবসায়ের চেয়ে তাৎক্ষণিক জনপ্রিয়তাকে বেশি গুরুত্ব দেয়।
এরিস্টোফেন তাঁর নাটক ‘দ্য ফ্রগস’-এ এথেন্সের অবক্ষয় নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করে বলেছিলেন, সমাজে যখন যোগ্য ও অভিজ্ঞদের পরিবর্তে চটকদার ও শব্দবাজ লোকদের গুরুত্ব দেওয়া হয়, তখন সেই সমাজ ধ্বংসের দিকে যায়।
অতএব এই কথিত ‘মোটিভেশনাল’ বয়ানগুলো শুধু ব্যক্তি পর্যায়ে নয়, সমাজজুড়ে এক ধরনের গভীর অসুখের জন্ম দিয়েছে, যার পরিণতিতে আমরা দেখছি ইউটিউব বা ফেসবুক নির্ভর একটি শ্রেণির উত্থান, যাদের অনেকেরই নেই কোনো বিশেষায়িত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, গবেষণা বা জ্ঞানের ভিত্তি, কিন্তু তবু তাঁরা শিক্ষা, প্রশাসন, নীতি ও রাষ্ট্রকাঠামো নিয়েও মতামত দেন, সমালোচনা করেন, এমনকি কাজের ধরনও নির্ধারণ করতে চান। এতে প্রকৃত জ্ঞানচর্চাকারী পেশাজীবীদের প্রতি শ্রদ্ধা কমে যায়, আর অযোগ্যদের কণ্ঠ উচ্চকিত হয়। সোশ্যাল মিডিয়ার এই যুগে যখন একটি ইউটিউব ভিডিও বা ফেসবুক পোস্ট একটি গবেষণাগারের রিপোর্ট বা দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার চেয়েও বেশি মানুষকে প্রভাবিত করে, তখন ‘রেজাল্ট জরুরি নয়’ জাতীয় বক্তব্যগুলো আমাদের সামাজিক মূল্যবোধের ভিত নাড়িয়ে দেয়।
এর ধারাবাহিকতায় বিগত ১৪-১৫ বছরে আমরা একটি বিপজ্জনক প্রবণতা দেখেছি, যেখানে খেলা, গান, বিনোদনকে অতিমূল্যায়ন করা হচ্ছে, অথচ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, পাঠাভ্যাস, ও বিশ্লেষণধর্মী চিন্তাকে অবজ্ঞা করা হচ্ছে।
হ্যাঁ, দক্ষ খেলোয়াড়, সংগীতজ্ঞ, বক্তার মতো প্রতিভার প্রয়োজন আছে সমাজে। শরীরে যেমন দামি অলংকার থাকে, তাঁরা রাষ্ট্রের সেই অলংকার। কিন্তু একটি রাষ্ট্র টিকে থাকে সেই লাখো শিক্ষিত, দক্ষ, চিন্তাশীল ও দায়িত্ববান নাগরিকের কাঁধে, যাঁরা নানা পেশায় জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যান, তাঁরা হলেন রাষ্ট্রের সেই শরীর। শরীর না থাকলে শুধু অলংকার কি কাজে আসবে?
জীবনের জন্য খেলা বা সংগীত অত্যাবশ্যক না হলেও জীবনকে অর্থবহ করে তোলার উপাদান। এগুলো মূলধারার শিক্ষার বিকল্প নয়। যদি আমরা এই পার্থক্যকে বিলীন করে দিই এবং সবাইকে এক পাল্লায় মাপতে থাকি, তবে একদিন হয়তো প্রকৃত শিক্ষিত ও মেধাবীরা এই সমাজে ঠাঁই পাবেন না। তখন শুধু জনপ্রিয়তা আর চটকদার বক্তব্যই সামাজিক নেতৃত্বের মানদণ্ড হয়ে উঠবে, যার ফলাফল হবে ভয়াবহ।
এই প্রেক্ষাপটে আমাদের সমাজকে পুনরায় মূল্যায়ন করতে হবে কিভাবে আমরা সফলতাকে সংজ্ঞায়িত করি, মেধা ও প্রজ্ঞাকে কিভাবে শ্রদ্ধা জানাই এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে কী ধরনের অনুপ্রেরণার বার্তা পৌঁছে দিই। উৎসাহ দেওয়া প্রয়োজন আছে, তবে সেটি যেন হয় জ্ঞানের পথকেই আলোকিত করে, আত্মপ্রবঞ্চনার চোরাগলিকে উৎসাহিত না করে।
লেখক : প্রাবন্ধিক