সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০৬:৪৪ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন জাতীয় নীতিমালা

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: বৃহস্পতিবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৫
  • ১০ বার পড়া হয়েছে
বাংলাদেশে ডেঙ্গু এখন আর মৌসুমি সংক্রমণ নয়, এটি বছরব্যাপী জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিয়েছে। গত এক দশকে ডেঙ্গুর মহামারিবিদ্যাগত ধরন (epidemiological pattern) উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। একসময় জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সীমাবদ্ধ সংক্রমণ বিদ্যমান থাকলেও এখন অক্টোবর-জানুয়ারি পর্যস্ত বিস্তৃত হচ্ছে।

২০২৫ সালের সর্বশেষ সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে মোট ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ৬৯ লাখ ৮৬২, মৃত্যুবরণ করেছে ২৭৮ জন।

এ থেকে স্পষ্ট, সংক্রমণ এখনো নিয়ন্ত্রণে নয় এবং নভেম্বর মাসেও ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব অব্যাহত থাকবে বলে বৈজ্ঞানিকভাবে অনুমেয়। 

ডেঙ্গুর জীববিজ্ঞান সরাসরি আবহাওয়াগত উপাদানের সঙ্গে সম্পর্কিত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৃষ্টিপাতের ধরনে মৌসুমি শিফট দেখা যাচ্ছে। আগের তুলনায় এখন অক্টোবরের শেষ পর্যন্ত বৃষ্টি হচ্ছে, যা এডিস মশার প্রজননচক্রকে দীর্ঘায়িত করছে।

এডিস মশা সাধারণত পরিষ্কার, অল্প পরিমাণে জমে থাকা পানিতে ডিম পাড়ে; যেমন—ফুলের টব, প্লাস্টিকের পাত্র, পুরনো টায়ার, পানির মিটারের গর্ত, বেইসমেন্টে জমা পানি ও নির্মাণাধীন ভবনের জলাধার। অক্টোবরে বৃষ্টির ফলে এই স্থানগুলো পুনরায় পানিতে ভরে যায় এবং ডিম থেকে লার্ভা ও পূর্ণাঙ্গ মশা বিকশিত হয়। ফলে বৃষ্টি বিলম্বিত হলেও ভেক্টর জনসংখ্যা বৃদ্ধি পায়। 

ড. কবিরুল বাশারএ ছাড়া নভেম্বর মাসেও বাংলাদেশের গড় তাপমাত্রা ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা এডিস মশার প্রজনন, ভাইরাস ইনকিউবেশন এবং বেঁচে থাকার জন্য আদর্শ।

তাই জলবায়ুর এই পরিবর্তিত প্রেক্ষাপট ডেঙ্গুর ‘seasonal spillover effect’ সৃষ্টি করছে। 

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কার্যকর প্রশাসনিক কাঠামোর অভাব একটি বড় প্রতিবন্ধকতা। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো, বিশেষ করে সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা প্রায়ই মৌসুমি তৎপরতা চালালেও তা ধারাবাহিক নয়।

বেশির ভাগ ক্ষেত্রে লার্ভা পর্যবেক্ষণ ও উৎস হ্রাস (source reduction) কার্যক্রম অপ্রতুল। অনেক সময় ফগার মেশিন অকার্যকর কীটনাশক দিয়ে, ভুল সময়ে বা ভুল স্থানে ব্যবহার করা হয়, যা মূল ভেক্টর জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ।

এ ছাড়া কীটতত্ত্ববিদ ও প্রশিক্ষিত ভেক্টর বিশেষজ্ঞের ঘাটতি, ডোজ ও প্রয়োগ কৌশলের ত্রুটি এবং তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনার অভাব মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমকে দুর্বল করেছে। এই দুর্বল ব্যবস্থাপনা এডিস মশার residual breeding ঘটাচ্ছে, যার ফলে সংক্রমণ অব্যাহত থাকে। 

গবেষণায় দেখা গেছে, এডিস মশার ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ প্রজনন স্থানই আবাসিক বা ব্যক্তিমালিকানাধীন ভবনে অবস্থিত। অথচ নাগরিকদের অনেকেই মনে করে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কেবল সরকারের দায়িত্ব। বাসা, বারান্দা, ছাদ, গ্যারেজ, নির্মাণাধীন স্থাপনা বা ফুলের টবে জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার করার অভ্যাস এখনো সাধারণ নাগরিক জীবনে গড়ে ওঠেনি। অথচ বৈজ্ঞানিকভাবে জানা যায়, এডিস মশার জীবনচক্র মাত্র পাঁচ থেকে সাত দিনে সম্পন্ন হয়, অর্থাৎ এক সপ্তাহের মধ্যে ডিম থেকে পূর্ণাঙ্গ মশা জন্ম নিতে পারে।

অনেকে ধারণা করে, শীত এলে ডেঙ্গুর সংক্রমণ থেমে যাবে। কিন্তু বাস্তবে আরবান ইকোলজি অনুযায়ী ঢাকা শহরের বহুতল ভবনের বেইসমেন্ট, গাড়ি ধোয়ার স্থান, নির্মাণাধীন ভবন এবং পানির সংকটে থাকা এলাকাগুলোর ড্রাম বা বালতিতে জমা পানি—সবই এডিস মশার ‘dry season refuge’ হিসেবে কাজ করে। এই পানির উৎসগুলোর সঙ্গে বৃষ্টির সরাসরি সম্পর্ক নেই। তাই শুষ্ক মৌসুমেও মশার প্রজনন বজায় থাকে। পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ঢাকা শহরের অনেক ভবনের নিচতলায় শীতকালেও সক্রিয় এডিস মশা থাকে, যা ডেঙ্গু ভাইরাস সংক্রমণ টিকিয়ে রাখে। ফলে চলতি সংক্রমণ ডিসেম্বর-জানুয়ারি পর্যন্ত স্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা প্রবল।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের প্রথম পদক্ষেপ হওয়া উচিত বৈজ্ঞানিকভাবে সংগৃহীত ডেটার ওপর ভিত্তি করে সারা বছরের লার্ভা ও অ্যাডাল্ট সার্ভেইল্যান্স কার্যক্রম পরিচালনা করা। প্রতিটি সিটি করপোরেশন ও পৌরসভায় নিয়মিতভাবে ওয়ার্ডভিত্তিক লার্ভা সার্ভে চালিয়ে ‘হটস্পট ম্যাপিং’ করতে হবে। এভাবে কোথায় মশার ঘনত্ব বেশি, কোন মাসে সংক্রমণ ঝুঁকি বেশি, তা নির্ধারণ করে সময়োপযোগী পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে। প্রতিটি ওয়ার্ডে মাসিক লার্ভা সূচক (Breteau Index, House Index, Container Index) নির্ধারণ বাধ্যতামূলক করা উচিত।

বৃষ্টিপাতের ধরন ও তাপমাত্রার পরিবর্তন ডেঙ্গুর মৌসুমি প্রকৃতিকে পাল্টে দিয়েছে। তাই ভবিষ্যতে প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ পরিকল্পনার সময় আবহাওয়া পূর্বাভাস, বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার ট্রেন্ড বিশ্লেষণ অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। আবহাওয়া অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মধ্যে সমন্বিত ‘ডেঙ্গু আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম’ চালু করা গেলে বৃষ্টিপাত বা তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অগ্রিম অভিযান পরিচালনা করা যাবে।

মশা নিয়ন্ত্রণ কেবল ‘কীটনাশক স্প্রে’ নয়, এটি একটি সমন্বিত ভেক্টর ম্যানেজমেন্ট (IVM) প্রক্রিয়া। এ জন্য সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোর মশা নিয়ন্ত্রণ বিভাগে পর্যাপ্ত জনবল, প্রশিক্ষণ এবং আধুনিক সরঞ্জাম সরবরাহ জরুরি। প্রতিটি ওয়ার্ডে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ টাস্কফোর্স গঠন করে স্বাস্থ্যকর্মী, পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা, সমাজসেবক ও স্থানীয় প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। নিয়মিত মূল্যায়ন, জবাবদিহি এবং কার্যকর কর্মদক্ষতা নির্ধারণের ব্যবস্থা থাকলে এই কার্যক্রম আরো ফলপ্রসূ হবে।

জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। প্রতিটি পরিবারকে সপ্তাহে অন্তত একবার নিজেদের বাড়ির ভেতর ও বাইরে পানি জমা স্থান পরীক্ষা ও পরিষ্কার করতে হবে। ‘প্রতি শনিবার ১০ মিনিট’ উদ্যোগের মতো জাতীয় সচেতনতা কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মসজিদ, মন্দির ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে এই কার্যক্রমে যুক্ত করা উচিত।

ডেঙ্গু সম্পর্কে ভুল ধারণা ভাঙতে স্কুল পর্যায় থেকেই বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা প্রবর্তন করা দরকার। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পাঠ্যক্রমে ডেঙ্গু প্রতিরোধ, মশার জীবনচক্র ও স্বাস্থ্যবিধি বিষয়ক অধ্যায় অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। পাশাপাশি টেলিভিশন, রেডিও, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বছরব্যাপী প্রচারণা চালাতে হবে, যেন এটি শুধু মৌসুমি সচেতনতা নয়, বরং একটি নিয়মিত সামাজিক অভ্যাসে পরিণত হয়। ডেঙ্গুর মৌসুমে হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বহুগুণে বেড়ে যায়। তাই প্রতিটি জেলা ও উপজেলা হাসপাতালে ডেঙ্গু কর্নার বা বিশেষ ওয়ার্ড, পর্যাপ্ত বেড, প্রশিক্ষিত চিকিৎসক ও নার্স নিশ্চিত করতে হবে।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে টেকসই সমাধান পেতে জিনেটিক, ভাইরোলজিক্যাল ও ইকোলজিক্যাল গবেষণা জোরদার করা জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের যৌথ উদ্যোগে এডিস মশার জিনেটিক বৈচিত্র্য, ভাইরাসের সারোটাইপ পরিবর্তন ও কীটনাশক প্রতিরোধক্ষমতা বিশ্লেষণ করতে হবে। একই সঙ্গে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে বাংলাদেশে পরীক্ষামূলকভাবে প্রয়োগের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।

পরিত্যক্ত টায়ার, বোতল, কাপ, নির্মাণাধীন স্থাপনার পানি ইত্যাদি এডিস মশার প্রজননস্থল। তাই নগর কর্তৃপক্ষকে সমন্বিত কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নীতি বাস্তবায়ন করতে হবে। প্রতিটি নির্মাণ প্রকল্পে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা উচিত এবং বিল্ডিং কোডে ‘মশা প্রতিরোধ নির্দেশিকা’ অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি ড্রেনেজ সিস্টেমের উন্নয়ন ও নিয়মিত পরিষ্কার নিশ্চিত করা জরুরি।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহার অপরিহার্য। জনগণ যেন মোবাইল অ্যাপ বা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে তাদের এলাকার ঝুঁকিপূর্ণ স্থান, মশা দেখা দেওয়া বা ডেঙ্গুতে আক্রান্তের তথ্য দিতে পারে। এতে দ্রুত প্রতিক্রিয়া ও এলাকাভিত্তিক পরিকল্পনা সহজ হবে। একই সঙ্গে সিটি করপোরেশনগুলোর সব তথ্য কেন্দ্রীয় ডেটাবেইসে সংরক্ষণ করা উচিত।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণকে এককালীন প্রকল্প নয়, বরং জাতীয় জনস্বাস্থ্য নীতির অংশ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। বার্ষিক বাজেটে সুনির্দিষ্ট অর্থ বরাদ্দ রাখতে হবে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ, গবেষণা, সচেতনতা ও হাসপাতাল প্রস্তুতির জন্য। কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে জবাবদিহি ও মূল্যায়নের কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে প্রতিটি সিটি করপোরেশনকে ‘ডেঙ্গুমুক্ত শহর কর্মপরিকল্পনা’ বাস্তবায়নে বাধ্য করতে হবে।

ডেঙ্গু আজ বাংলাদেশের নগরজীবনের এক স্থায়ী সংকট। এটি মোকাবেলায় প্রয়োজন বিজ্ঞাননির্ভর পরিকল্পনা, নাগরিক অংশগ্রহণ এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে আমাদের প্রতিরোধ কৌশলও হতে হবে বছরব্যাপী, সমন্বিত ও তথ্যভিত্তিক।

লেখক : পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, অধ্যাপক প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com