আজকের বাংলাদেশে নারীর কর্ম ও পদচারণ সমাজের প্রতিটি অঙ্গনে। সরকারি-বেসরকারি অফিস, ব্যাংক-বীমা, গণমাধ্যম, তথ্য-প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, পোশাকশিল্প, এমনকি মাঠ পর্যায়ের শ্রমেও নারী এখন সমানভাবে অবদান রাখছেন। এককথায় চাষের জমি থেকে বিমান চালনা পর্যন্ত অর্থনীতির চাকায় নারীর সমান গুরুত্ব।
অর্থনীতির চাকা সমান তালে ঘোরানোর কর্মে নারীর অংশগ্রহণ এখন আর ব্যতিক্রম নয়, বরং অপরিহার্য।তবু এক অদৃশ্য ভয়, এক অস্বস্তিকর বাস্তবতা প্রতিদিনই নারীর দুর্বার গতিকে থামিয়ে দিতে চায়, সেটি হলো অনিরাপদ কর্মস্থল। অনেকেই মনে করেন ‘নিরাপদ কর্মস্থল’ মানেই শুধু যৌন হয়রানি বা সহিংসতা থেকে মুক্ত থাকা, কিন্তু বিষয়টি অনেক বিস্তৃত। নিরাপত্তা মানে মানসিক শান্তি, স্বস্তি, সম্মান, সমান সুযোগ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণের নিশ্চিয়তা। নারী যেন কাজের জায়গায় যোগ্যতা ও মেধা প্রকাশে স্বাধীন থাকে, এটিই প্রকৃত নিরাপত্তা।
আজকের যুগে কর্মস্থল মানে শুধু অফিসরুম নয়, ডিজিটাল স্পেসও কর্মস্থলের অংশ। অনলাইন মিটিং, অফিস চ্যাটগ্রুপ, ই-মেইল—সব জায়গায়ই সম্মান বজায় রাখতে হয়। কিন্তু সাইবার হয়রানি এখন নতুন চ্যালেঞ্জ। নারীরা অফিস সম্পর্কিত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বা ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মেও অবমাননাকর বক্তব্যের শিকার হচ্ছেন। তাই নিরাপত্তার সংজ্ঞা সম্প্রসারিত করে ডিজিটাল নিরাপত্তাকেও কর্মস্থলের নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। নিরাপদ কর্মস্থল মানে শুধু দুর্ঘটনা বা হয়রানি থেকে সুরক্ষা নয়, বরং নারী যেন সমান সুযোগ পান, সেটিও নিরাপত্তার অংশ। অনেক প্রতিষ্ঠানেই পদোন্নতি, প্রশিক্ষণ বা দায়িত্ব বণ্টনে নারীরা পিছিয়ে থাকেন কেবল পারিবারিক দায়িত্ব বা সন্তান পালনের যুক্তিতে। এই বৈষম্যও কমিয়ে আনতে হবে।
নারী যেন সন্তান জন্মের পর কর্মজীবন হারিয়ে না ফেলেন, সেটি নিশ্চিত করাও একটি বড় নিরাপত্তা। কারণ কর্মজীবনের ধারাবাহিকতা ভেঙে গেলে নারীর আত্মবিশ্বাস ও আর্থিক স্বাধীনতা দুটিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
কর্মস্থলে নিরাপত্তা শুধু নারীর দায় নয়, এটি তাঁর পুরুষ সহকর্মীদেরও দায়িত্ব। পুরুষ যদি নারীকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, সহযোদ্ধা হিসেবে দেখতে শেখেন, তবেই কাজের পরিবেশ হবে সুস্থ ও সৃজনশীল। অফিসে নিয়মিত নারী-পুরুষের কর্মস্থলের নিরাপত্তা, নারীর প্রতি সহমর্মিতা, সমান সুযোগ প্রাপ্তি বিষয়ক কর্মশালা নিয়মিত করলে বোঝা সহজ হবে কিভাবে আচরণ করলে পরিবেশ আরো সহজ ও শ্রদ্ধাশীল হবে। যেকোনো প্রতিষ্ঠানে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় সচেতন ও সংবেদনশীল নারী থাকলে নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার বাড়ে।
নারী নেতৃত্ব মানে নারী উন্নয়ন নয়, বরং এটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি। গবেষণায় দেখা গেছে যে নারী নেত্রীরা সাধারণত বেশি সহমর্মী, নিরাপদ ও মানবিক কর্মসংস্কৃতি তৈরি করতে পারেন। তাই শুধু নীতিমালা কাগজে-কলমে নয়, বাস্তবে প্রয়োগ হতে হবে।
নারীর জন্য নিরাপদ কর্মস্থল নির্মাণ এবং টেকসই করার জন্য সমাজের প্রতিটি স্তরে সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। পরিবার থেকে রাস্ট্র, সর্বত্র।
পরিবারে ছেলে ও মেয়েকে ছোটবেলা থেকেই সমান মর্যাদা দেওয়া, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নারী-পুরুষ বৈষম্যমুক্ত শিক্ষা দেওয়া, কর্মস্থলে ন্যায় ও নীতিমালা প্রয়োগ—এই তিনটি স্তম্ভই প্রাথমিকভাবে নারীর জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশের কার্যকর ভিত্তি হতে পারে।
একজন নারী ভয়ের মধ্যে নয়, আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কাজ করতে পারলে তাঁর উৎপাদনশীলতা, সৃজনশীলতা এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতি আনুগত্য বহুগুণে বেড়ে যায়। নিরাপদ কর্মস্থল তাই শুধু নারীর জন্য প্রয়োজন নয়, পুরো অর্থনীতির স্বার্থেও অপরিহার্য।
বর্তমান শতাব্দীর বাংলাদেশ যদি সত্যি সর্বক্ষেত্রে এগিয়ে যাওয়ার বাংলাদেশ হতে চায়, তবে তাকে এ ব্যাপারে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ‘নিরাপদ কর্মস্থলের বাংলাদেশ’ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে নারী-পুরুষ উভয়ে সমান মর্যাদায়, সমান নিরাপত্তায় কাজ করতে পারেন। নারীর নিরাপত্তা মানেই মানবতার নিরাপত্তা।
লেখক : চেয়ারম্যান, প্রশিকা