২০০৬ সাল। তখন সবচেয়ে জনবহুল দেশ চীন কৃষিক্ষেত্রে এক অসাধারণ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলেছে। খাদ্যের চাহিদা যেমন বিশাল, তেমনি উৎপাদনেও তাদের সাফল্য ছিল চোখে পড়ার মতো। এই সাফল্যের পেছনে কাজ করেছে একটি সুশৃঙ্খল বাজারব্যবস্থা, যেখানে উৎপাদন থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াকরণ, প্যাকেজিং, পরিবহন, স্থানীয় বাজারে সরবরাহ এবং রপ্তানি—সবই নির্দিষ্ট কাঠামোর ভেতরে পরিচালিত হতে দেখেছি।১৯৭৮ সালে বাজারব্যবস্থা পুনর্গঠনের পর থেকে চীনের কৃষকরা নতুন উদ্যমে উৎপাদনে ঝুঁকে পড়েন। তখনই চীনে কৃষিক্ষেত্রে শুরু হয় এক ‘নীরব বিপ্লব’। আমি গিয়েছিলাম চীনের ইউনান প্রদেশের রাজধানী কুনমিংয়ে। ভেষজ উদ্ভিদের জন্য বিখ্যাত এই শহরে ২০ থেকে ২৫ বছর ধরে সবজি উৎপাদনে ঘটেছে অবিশ্বাস্য উন্নতি।
চীনে এখন একসময়ের অব্যবহৃত জমিও কাজে লাগানো হচ্ছে। হুনান প্রদেশের রাজধানী চাংশায় গিয়ে আমি দেখেছিলাম, নগর এলাকার ভেতরেই ছোট ছোট প্লটে সবজি চাষ করছে সাধারণ মানুষ। অনেক দরিদ্র বাসিন্দা সবজি আবাদকেই জীবিকার প্রধান উৎস বানিয়েছে। ক্ষেত থেকে সবজি তুলে তা ধুয়ে স্থানীয় বাজারের চাহিদা অনুযায়ী বিক্রি করছে তারা।
এরপর গেলাম চাংশা শহরের এক পাইকারি
বাজারে। অনেকটা আমাদের কারওয়ান বাজারের মতো। কিন্তু সেখানে গিয়ে যেটা সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ল, তা হলো মূল্য ব্যবধানের অনুপস্থিতি।
বাংলাদেশে যেখানে কৃষক ও ভোক্তার দামের মধ্যে ব্যবধান বিশাল, সেখানে চীনে এই ব্যবধান প্রায় নেই বললেই চলে। সরকার সরাসরি নজর রাখে কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য ও মূল্য নির্ধারণে। ফলে উৎপাদক ও ভোক্তা, দুই পক্ষই থাকে সন্তুষ্ট।
চাংশার সবচেয়ে বড় কাঁচাবাজার মাওয়াংদই। সেখানে আশপাশের গ্রাম থেকে কৃষকরা নিজেরাই সবজি নিয়ে আসেন বিক্রির জন্য। বেশির ভাগই একই সঙ্গে উৎপাদক ও ব্যবসায়ী। ফলে তাঁদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হয়। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, ওই বাজারে ৯০ শতাংশ সবজি আসে ধোয়া ও প্যাকেটজাত অবস্থায়।
পেং নামে এক কৃষক-বিক্রেতা আমাকে বলেছিলেন, ‘এখানে কৃষকরা কখনো বঞ্চিত হন না। বাজারে মধ্যস্বত্বভোগী আছে, কিন্তু তারা একচেটিয়া ব্যবসা করতে পারে না। কারণ কৃষকরাই এখানে সবচেয়ে শক্তিশালী।’
জাং নামে আরেক কৃষক বলেন, ‘আমরা সরকার থেকে নানা সুবিধা পাই। উৎপাদন ও বিক্রির সিদ্ধান্ত নিজেরাই নিতে পারি। কেউ আমাদের ওপর চাপিয়ে দেয় না। আর বাজার মূল্যের বাইরে কিছু চাওয়াও অযৌক্তিক মনে করি।’ সাওসাও কাউন্টি থেকে ৩০০ কিলোমিটার দূরের বৃদ্ধ কৃষক গাং চি বলেন, ‘লাভ না হলে আমি অনেক আগেই কৃষি ছেড়ে দিতাম। কিন্তু এখানে ক্ষতির প্রশ্নই আসে না। কারণ আমরা উৎপাদন থেকে বিক্রি পর্যন্ত সব কিছুর নিয়ন্ত্রণে আছি।’
সত্যিই, চীনের কৃষকের কাছে ক্ষেতের সবজি যেন কাঁচা সোনার মতো। কারণ সেখানে মূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত। কৃষক, ব্যবসায়ী, ক্রেতা—কেউই হতাশ নন। সবাই নিজেদের অবস্থানে তৃপ্ত।
চীনের এই সফলতার পেছনে রয়েছে সরকারের ইতিবাচক নীতি, স্থানীয় বাজারের একক নিয়ন্ত্রণ না থাকা, কৃষিপণ্যের বিপণনে রাষ্ট্রীয় সহায়তা এবং কৃষকদের সংগঠিত ভূমিকা।
আর এখানেই বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের মূল পার্থক্য। আমাদের দেশে উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছাতে পণ্যের দামে যে বিশাল ফারাক সৃষ্টি হয়, তা অনেক সময়ই কৃষকের হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আজও মনে হয়, ২০০৬ সালে দেখা সেই চীনের বাজারব্যবস্থা যেন এক বাস্তব শিক্ষা। যেখানে ন্যায্যমূল্য কেবল সরকারি স্লোগান নয়, বাস্তব জীবনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। আমাদের দেশেও যদি কৃষিপণ্যের মূল্য নির্ধারণে কৃষকদের মতামতকে প্রাধান্য দেওয়া যায়, যদি বাজারব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও সংগঠন তৈরি করা যায়, তবে আমরাও একদিন কৃষকের মুখে সেই একই সাফল্যের হাসি দেখতে পাব।