সমুদ্রের ঢেউয়ের তালে দৌড়ে বেড়ানো কিংবা সবুজ ঘাসের বিছানায় আলতো পায়ে হাঁটছে ছোট্ট দুটি চরণ–গায়ে জড়ানো রঙিন এক শাড়ি; যেন প্রকৃতির কোলে নেমে আসা কোনো ছোট্ট পরি, যার হাসিতে মিশে আছে নির্ভেজাল আনন্দ আর শাড়ির ভাঁজে লুকিয়ে আছে শৈশবের রূপকথা। এ শাড়িগুলোয় ঐতিহ্য যেমন আছে, তেমনি রয়েছে আধুনিক ফ্যাশনের ছোঁয়া। একেকটা ডিজাইন যেন একেকটা গল্প–রং,
নকশা আর থিমে ফুটে থাকে যেন রঙিন অভিব্যক্তি। শাড়ি যে শুধু উৎসবে পরতে হবে তা নয়, যে কোনো আটপৌরে দিনকেও রাঙানো যেতে পারে। রঙ বাংলাদেশের স্বত্বাধিকারী সৌমিক দাস বলেন, ‘কটন, হাফসিল্ক ও ডিজিটাল প্রিন্টে শিশুর জন্য নানা ধরনের শাড়ি তৈরি করা হয় এবং আরাম-স্বাচ্ছন্দ্যের দিকে মূল লক্ষ্য থাকে। শিশুর শাড়ি মূলত উৎসবকেন্দ্রিক তৈরি করা হয়। সে ক্ষেত্রে প্রতি ইভেন্টেই বিভিন্ন থিমের শাড়ি তৈরি করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে মা কিংবা বড় বোনের সঙ্গে ম্যাচিং শাড়ি তৈরি করা হয়। এই ব্র্যান্ডের শিশুর শাড়িতে বয়স অনুযায়ী সাইজ হয়ে থাকে। সে ক্ষেত্রে চার থেকে শুরু হয়ে ১২-১৩ বছর পর্যন্ত হয়ে থাকে। এখানে শিশুর শাড়ির দাম ৯৯০ টাকা থেকে শুরু হয়ে কোয়ালিটি, ফেব্রিকস ইত্যাদির ওপর নির্ভর করে এক হাজার ৯৯০ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে।
ঢাকার বিভিন্ন শপিংমল বা অনলাইন স্টোরগুলোর বিক্রেতারা জানাচ্ছেন, ছোটদের জন্য সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে কটন, মসলিন, হালকা জর্জেট ও সফট সিল্কের শাড়ি। কারণ এ বয়সে শিশুরা দীর্ঘ সময় ধরে ভারী পোশাক পরতে পারে না। সে কারণে শাড়ির কাপড় এমন হতে হয়, যাতে ত্বকে জ্বালাপোড়া না করে, বাতাস চলাচল করতে পারে আর সহজে ধোয়া যায়। অনেকে এখন ‘সফট হ্যান্ডল লন’ বা ‘মাল-মসলিন’ কাপড়ও বেছে নিচ্ছেন; যা গরমে ঠান্ডা, শীতে উষ্ণতার অনুভূতি দেয়।
রেডি টু ওয়্যার
অভিভাবকদের সবচেয়ে বড় চিন্তা–শাড়ি কীভাবে পরাব। সে কারণে এখন বাজারে মিলছে ‘প্রি-স্টিচড’ বা ‘রেডি টু ওয়্যার’ শাড়ি–যেগুলোয় পেটিকোট ও শাড়ি একসঙ্গে সেলাই করা থাকে। শুধু ব্লাউজের চেইন টানলেই কাজ শেষ। এ সুবিধা বাচ্চাদের স্বাচ্ছন্দ্য দেয়, মা-বাবাদের সময় বাঁচায়। শিশুর প্রতিটি কাপড়ের মধ্যে লুকিয়ে থাকে ভিন্ন ভিন্ন থিম। একেকটা থিম যেন ফুটিয়ে তোলে গল্প।
কার্টুন থিম
ছোটদের প্রিয় চরিত্রগুলো এখন শাড়ির নকশায়। ‘ফ্রোজেন’-এর এলসা, ‘ডোরেমন’, ‘পেপা পিগ’, ‘মিনিয়ন’ কিংবা ‘বার্বি’–এই জনপ্রিয় কার্টুন বা এনিমেশন চরিত্রগুলো শাড়ির প্রিন্টে আসছে উজ্জ্বল রঙে। হালকা কটন বা জর্জেট কাপড়ে তৈরি এসব শাড়ি সহজে পরা যায়।
ফুলে ফুলে সাজানো শৈশব
ফুল মানেই কোমলতা আর হাসি, যা ছোট মেয়েদের সঙ্গে পুরোপুরি মানিয়ে যায়। এই থিমে শাড়িগুলোয় থাকে বড় বড় গোলাপ, জুঁই বা সূর্যমুখীর ছাপ। কাপড়ে ব্যবহৃত হয় কটন, মসলিন বা লন, যাতে রঙের ঔজ্জ্বল্য ঠিক থাকে আবার ত্বকেও আরাম লাগে। প্যাস্টেল পিঙ্ক, লেমন ইয়েলো, মিন্ট গ্রিন বা ল্যাভেন্ডার–এই থিম সবচেয়ে জনপ্রিয়।
প্রকৃতির ছোঁয়া
এই থিমের শাড়িগুলোয় থাকে প্রকৃতির প্রতীক। যেমন–প্রজাপতি, পাতা, আকাশ, পাখি কিংবা রংধনু। কাপড়ের ওপর আঁকা থাকে উড়ন্ত প্রজাপতি বা নরম মেঘের ছাপ, যা শৈশবের স্বাধীনতা আর আনন্দকে তুলে ধরে। সাধারণত সফট অরগাঞ্জা বা হালকা সিল্কে তৈরি হয় এসব শাড়ি। উৎসবের দিন বা বিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে এ থিমের শাড়ি এখন খুবই জনপ্রিয়।
উৎসবের রঙে ঐতিহ্য
প্রতিটি উৎসবের জন্য তৈরি হচ্ছে বিশেষ থিম শাড়ি। বৈশাখে লাল-সাদা জামদানি মোটিফ, ঈদে গোল্ডেন জরি, পূজায় লাল-বেগুনি সিল্কের মিশ্রণ–সবই ছোটদের জন্য হালকা ও আরামদায়কভাবে তৈরি। অনেক ডিজাইনার আবার ‘মা-মেয়ে টুইনিং সেট’ বানাচ্ছেন, যাতে মা আর মেয়ে একসঙ্গে মিলিয়ে সাজতে পারেন।
ট্র্যাডিশনাল মিনি-জামদানি থিম
যারা ঐতিহ্য পছন্দ করেন, তাদের জন্য অনেকে তৈরি করছে জামদানি মোটিফের শাড়ি। এ শাড়িতে থাকে জামদানির মতো ডিজাইন। তবে এগুলো হালকা কটন-সিল্কে তৈরি। এতে শিশুরা আরামে থাকতে পারে, আবার ঐতিহ্যের অংশও হতে পারে। রঙে থাকে লাল, সাদা, হালকা নীল বা গোল্ডেন টোন। এটি এখন বিয়ের আয়োজনে ছোট ফুলকন্যাদের জন্য সবচেয়ে জনপ্রিয়। v
ছবি: রঙ বাংলাদেশ