দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। মৃতের সংখ্যাও দ্রুত বেড়েছে। পুরো পরিস্থিতিই উদ্বেগজনক। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) তথ্য অনুযায়ী, এ বছর এখন পর্যন্ত ৬৩ হাজার ৬৩৮ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে, ২৫৯ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। মৃতের সংখ্যাও দ্রুত বেড়েছে। পুরো পরিস্থিতিই উদ্বেগজনক। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) তথ্য অনুযায়ী, এ বছর এখন পর্যন্ত ৬৩ হাজার ৬৩৮ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে, ২৫৯ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
বিশ্বের অন্যান্য দেশের চিত্র
বিশ্বের যেসব দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ আছে, সেসব দেশের তুলনায় আমাদের দেশে মৃত্যুহার বেশি। সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গুতে আক্রান্তের হার ব্রাজিলে। সেখানে মৃত্যুর হার মাত্র ০.১২ শতাংশ।আক্রান্তের হারে বাংলাদেশের সঙ্গে আছে ইন্দোনেশিয়া, সেখানেও মৃত্যুর হার ০.৪১ শতাংশ। এরপর কলম্বিয়া ০.১২ শতাংশ, ভারতে ০.০৮ শতাংশ, থাইল্যান্ডে ০.০৯ শতাংশ এবং ইকুয়েডরে ০.১৭ শতাংশ। [সূত্র : বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থ্যা]চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত ব্রাজিলে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে ১৩ লাখ ৩৮ হাজার ৪৬৮ জন এবং মৃত্যু হয়েছে এক হাজার ৬৩৫ জনের। ইন্দোনেশিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে এক লাখ ১০ হাজার ৮২৮ জন এবং মৃত্যু হয়েছে ৪৫৭ জনের, কলম্বিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে ৬৬ হাজার ৫০০ জন এবং মৃত্যু হয়েছে ৮৪ জনের, ভারতে আক্রান্ত হয়েছে ৪৯ হাজার ৫৫৩ জন এবং মৃত্যু হয়েছে ৪২ জনের, থাইল্যান্ডে আক্রান্ত হয়েছে ৪৩ হাজার ৯৬৯ জন এবং মৃত্যু হয়েছে ৪০ জনের, ইকুয়েডরে আক্রান্ত হয়েছে ৩৩ হাজার ৩২২ জন এবং মৃত্যু হয়েছে ৫৭ জনের।
বাংলাদেশে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর হার বেশি থাকার মূল কারণ আক্রান্তের সঠিক সংখ্যা অজানা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আওতাধীন ঢাকার ৭৭টি হাসপাতাল এবং জেলার সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্যই সংরক্ষিত হয়। এর বাইরে বিপুলসংখ্যক রোগী বাড়িতেই চিকিৎসা নেয়, যাদের হিসাব ডেটায় আসে না। দেশে বহু ছোট-বড় বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক রয়েছে, বেশিরভাগই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে তথ্য পাঠায় না। তাই এসব রোগীরা পরিসংখ্যানের বাইরে থেকে যাচ্ছে।
একাধিকবার আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও এ বছর বেড়েছে। ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি ধরন বা সেরোটাইপ রয়েছে—ডেন-১, ডেন-২, ডেন-৩ ও ডেন-৪। একবার আক্রান্ত হলে সেই সেরোটাইপের বিরুদ্ধে শরীরে আজীবন প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হয়। কিন্তু অন্য সেরোটাইপে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। দ্বিতীয়বার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। প্রথমবার সংক্রমণে তৈরি অ্যান্টিবডি অন্য সেরোটাইপকে পুরোপুরি নিস্তেজ করতে পারে না, বরং ভাইরাসকে কোষে প্রবেশ করতে সাহায্য করে, যার ফলে মারাত্মক রক্তক্ষরণ ও শক হতে পারে। সম্প্রতি আইইডিসিআরের এক তথ্যে জানা গেছে, প্রায় তিন বছর ধরে ডেঙ্গুর চারটি সেরোটাইপের মধ্যে ডেন-২-এ বেশি মানুষ আক্রান্ত হতো। চলতি বছর এর সঙ্গে ডেন-৩-এ আক্রান্ত বেড়ে যাচ্ছে। এ ধরনে বেশি আক্রান্তের ঘটনা ঘটছে রাজধানীতে।
উপসর্গ
হঠাৎ উচ্চ জ্বর, মাথা ব্যথা, বিশেষ করে চোখের পেছনে ব্যথা, শরীর ব্যথা ও জয়েন্ট পেইন, বমি, বমি বমি ভাব, ত্বকে ফুসকুড়ি, গুরুতর ক্ষেত্রে নাক বা মাড়ি থেকে রক্তপাত, কালশিটে দাগ ও পেট ব্যথা।
এই লক্ষণগুলো থাকলে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে—
♦ তীব্র পেট ব্যথা ও বারবার বমি।
♦ অস্থিরতা বা অবসন্নতা।
♦ নাক-মুখে রক্তপাত।
♦ লিভার বড় হওয়া।
♦ হঠাৎ করে দেহের তাপমাত্রা কমে যাওয়া।
মনে রাখতে হবে, আগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগী, শিশু, বয়স্ক, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা আছে এমন ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।কখন করবেন ডেঙ্গু পরীক্ষা
জ্বরের প্রথম বা দ্বিতীয় দিনে, এমনকি তৃতীয় দিন পর্যন্ত এনএস-১ পরীক্ষায় ডেঙ্গু রোগ ধরা পড়ে। আরটি-পিসিআর মেশিনে সাধারণত প্রথম থেকে পঞ্চম দিন পর্যন্ত রোগটি শনাক্ত করা হয়। ডেঙ্গু রোগের উপসর্গ রয়েছে, কিন্তু এনএস-১ নেগেটিভ এলে পঞ্চম দিন থেকে আইজিএম পরীক্ষা করে রোগটি শনাক্ত করা যায়। এ ছাড়া দ্বিতীয় আইজিজি পরীক্ষা করে শনাক্ত করা যেতে পারে।
প্রতিরোধ করণীয়ডেঙ্গুর এখনো কোনো নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ নেই। পর্যাপ্ত পানি ও তরল গ্রহণ করা, জ্বর কমানোর জন্য প্যারাসিটামল ব্যবহার করা এবং প্রয়োজনে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে রোগ ম্যানেজমেন্ট করাই চিকিৎসা।ডেঙ্গু প্রতিরোধে মশার প্রজনন নিয়ন্ত্রণ জরুরি। বাড়ির আশপাশে কোথাও পানি জমতে দেবেন না (টব, ক্যান, টায়ার, বোতল, ফুলদানি ইত্যাদি)। সপ্তাহে একবার জমে থাকা পানির পাত্র ফেলে দিন বা ভালোভাবে পরিষ্কার করুন। পানির ট্যাংক, ড্রাম বা বালতি ঢেকে রাখুন। ডাস্টবিন ও নালা পরিষ্কার রাখুন। বাড়ির চারপাশের ঝোপঝাড় পরিষ্কার রাখুন। আশপাশে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সবাইকে সচেতন করুন।
মশার কামড় থেকে সুরক্ষার জন্য দিনের বেলায় (বিশেষত সকাল-বিকালে) ফুলহাতা জামা, লম্বা প্যান্ট পরুন। মশারি ব্যবহার করুন। শুধু রাতে নয়, দিনে ঘুমানোর সময়ও। মশা প্রতিরোধক ক্রিম বা স্প্রে ব্যবহার করুন। জানালা ও দরজায় মশারি বা জালি লাগান।