নারীরা যে ক্যান্সারে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হন, সেটি স্তন বা ব্রেস্ট ক্যান্সার। বিশ্বে প্রতি আটজন নারীর মধ্যে একজন জীবনের কোনো এক পর্যায়ে স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হতে পারেন। বাংলাদেশেও এই হার দ্রুত বাড়ছে। যদি প্রাথমিক পর্যায়ে সেটি শনাক্ত করা যায়, তাহলে সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে এটি সম্পূর্ণভাবে নিরাময় সম্ভব।সচেতন হলে, নিয়মিত পরীক্ষা করিয়ে সময়মতো চিকিৎসা নিলে এই রোগ থেকে পরিত্রান পাওয়া সম্ভব।
কেন হয় স্তন ক্যান্সার
স্তন ক্যান্সারের সুনির্দিষ্ট কারণ সব সময় জানা যায় না। তবে কিছু ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক থাকা প্রয়োজন—
♦ পারিবারিক ইতিহাস—মা, বোন বা ঘনিষ্ঠ আত্মীয়র ব্রেস্ট ক্যান্সার হয়ে থাকলে।
♦ বয়স ৪০ পার হলে স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ে।
♦ সন্তান না হলে, বা অধিক বয়সে গর্ভধারণ করলে।
♦ হরমোনজাত ওষুধের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহার।
♦ স্থূলতা, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও নিষ্ক্রিয় জীবনযাপন।
প্রাথমিক লক্ষণ
প্রাথমিক পর্যায়ে স্তন ক্যান্সার সাধারণত ব্যথাহীন চাকা হিসেবে অনুভূত হয়। নিচের লক্ষণগুলোর যেকোনোটি দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি—
♦ স্তনে বা বগলে কোনো চাকা বা কঠিন অংশ অনুভব হওয়া।
♦ স্তনের আকৃতি বা আকারে পরিবর্তন।
♦ স্তনের ত্বকে টান, লালচে ভাব, পুরু হয়ে যাওয়া, গর্ত বা ভাঁজ পড়া।
নির্ণয় পদ্ধতি
তিনটি পরীক্ষার মাধ্যমে স্তন ক্যান্সার প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা সম্ভব।
♦ ক্লিনিক্যাল ব্রেস্ট এক্সামিনেশন: প্রশিক্ষিত চিকিৎসক বা সার্জন এই পরীক্ষার মাধ্যমে সহজেই ক্যান্সারের লক্ষণ শনাক্ত করতে পারেন। ২০ বছর বয়সের পর থেকে প্রতিবছর এই পরীক্ষা করানো উচিত।
♦ ম্যামোগ্রাম: এটি স্তনের গভীরে থাকা অতি ক্ষুদ্র টিউমারও শনাক্ত করতে পারে। বয়স ৪০ পেরোলেই প্রতি ১২ বছর অন্তর প্রত্যেক নারীর ম্যামোগ্রাম করা উচিত। পরিবারের কারো স্তন ক্যান্সার হয়ে থাকলে ৩০ বছর বয়স থেকেই চিকিৎসা শুরু করা যেতে পারে।
♦ আলট্রাসনোগ্রাম: যুবতী নারীদের স্তন টিস্যু সাধারণত ঘন (dense) হয়, তাই ম্যামোগ্রামে সব সময় স্পষ্টভাবে দেখা যায় না। গর্ভবতী বা স্তন্যদানকারী মায়েদের জন্যও এটি নিরাপদ।
চিকিৎসা
স্তন ক্যান্সারের চিকিৎসা নির্ভর করে রোগের ধরন, পর্যায়, বয়স ও রোগীর সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ওপর। চিকিৎসার প্রধান ধাপগুলো হলো—
♦ সার্জারি : প্রাথমিক পর্যায়ের ক্যান্সার হলে শুধু ক্যান্সারযুক্ত অংশটি কেটে ফেলে দেওয়া হয়, স্তন অক্ষত থাকে, এর নাম লাম্পেকটমি। তবে কিছু রোগীর মাস্টেকটমি বা সম্পূর্ণ স্তন অপসারণ প্রয়োজন হতে পারে।
♦ কেমোথেরাপি : ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করতে এই থেরাপি দেওয়া হয়।
♦ রেডিওথেরাপি : রেডিয়েশন ব্যবহার করে ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করা হয়।
♦ হরমোন ও টার্গেটেড থেরাপি : হরমোননির্ভর ক্যান্সারের জন্য ব্যবহার করা হয় বিশেষ ওষুধ। আধুনিক টার্গেটেড থেরাপিতে শুধু ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করা হয়। এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কম।
প্রতিরোধ
♦ স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া।
♦ ব্যায়ামের মাধ্যমে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা।
♦ ধূমপান ও মদ্যপান পরিহার করা।
♦ সন্তান নেয়া ও সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ানো।
♦ নিয়মিত স্তন পরীক্ষা করানো [নিজে ও বছরে একবার চিকিৎসকের মাধ্যমে]। বয়স অনুযায়ী প্রয়োজনে ম্যামোগ্রাম করাতে হবে।
স্তন আত্মপরীক্ষা
প্রতি মাসে মাসিক শেষ হওয়ার সাত থেকে ১০ দিনের মধ্যে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বা শুয়ে নিজের স্তন হাতে পরীক্ষা করুন। কোনো চাকা, ত্বকের পরিবর্তন বা নিপল নিসঃরণ লক্ষ করলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।