ব্যবসা আলোর মুখ দেখলে কয়েক দিন আগে মাচসিং চালু করেছেন এক মানবিক উদ্যোগ। ‘স্টুডেন্ট বক্স’ নামে তাঁর এই ছোট্ট কিন্তু মহৎ উদ্যোগ সাড়া ফেলেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। মাচসিং বললেন, ‘ঢাকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পড়ুয়া অনেক শিক্ষার্থী আর্থিক সংকটে ভোগেন। কেউ কেউ বাজার করতে পারেন না, কেউ আবার প্রয়োজনীয় খাবার ঠিকমতো জোগাড় করতে হিমশিম খান। সেই শিক্ষার্থীরা বিনামূল্যে সবজি নিতে পারবেন তংসা বাজার থেকে। এ জন্য স্টুডেন্ট বক্স নামে একটা কর্নারে সবজি-ফল রেখে দিচ্ছি। যাঁদের প্রয়োজন, তাঁরা যেন নিয়ে যেতে পারেন।’
বান্দরবান থেকে উঠে আসা মাচসিং নিজেও শিক্ষার্থী। রাজধানীর গভর্নমেন্ট কলেজ অব অ্যাপ্লায়েড হিউম্যান সায়েন্সে চাইন্ড ডেভেলপমেন্ট বিষয়ে স্নাতক করছেন। ‘অভাবের কারণে একজন শিক্ষার্থীকে কতটা কষ্টের মধ্যে চলতে হয় তা আমার চেয়ে ভালো কে জানে। তাই ঠিক করেছি, সবজি, ফলের একটা অংশ স্টুডেন্ট বক্সে রেখে দেব।’ বললেন মাচসিং। এই উদ্যোগের পেছনে আছে এক করুণ গল্প।
মা-বাবা আবার এক হোক
তিন ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোট মাচসিং। দুরন্তপনায় পাড়া মাতাতেন। প্রথম শ্রেণিতে পড়ার সময় একদিন দেখলেন, মা-বাবা আলাদা হয়ে যাচ্ছেন। অতটুকু মাচসিং বুঝতেন না, ডিভোর্স আসলে কী। অবশ্য বাস্তবতা বুঝতে বেশিদিন লাগেনি। শৈশব কেটেছে এমন এক টানাপড়েনে, যেখানে বাবার আদর পেলে মায়েরটা হারাতেন, আবার মায়ের স্নেহ পেলে দূরে সরিয়ে দিতেন বাবা। দাদা-দিদিরা একটু বড় ছিলেন বলে বুঝে চলতেন। কিন্তু মাচসিং শুধু চাইতেন, মা-বাবা আবার এক হোক। আগের সময়গুলোর কথা মনে পড়লেই কান্না পেত। মা-বাবার আত্মীয়-স্বজনও তখন তাঁকে ভিন্ন চোখে দেখতে শুরু করল। বাবার আত্মীয়রা বলত, মেয়েটা মায়ের মতো হয়েছে; আবার মায়ের আত্মীয়রা বলত, সে বাবার মতো। সুন্দর, গোছানো সংসার একনিমেষে ভেঙে গেল। মা-বাবা দুজনই পরে তাঁদের দ্বিতীয় সংসারে জড়ালেন। শেষ পর্যন্ত মায়ের কাছেই ছিলেন মাচসিং।
মায়ের দোকান সামলাতেন
তেলের দোকান, খাবারের হোটেল, মুদির দোকান—তিনটি ব্যবসা একাই চালাতেন মাচসিংয়ের মা। তিনি পড়াশোনা জানতেন না। তাই দোকানের হিসাব-নিকাশ থেকে শুরু করে বাজার করা পর্যন্ত সবকিছুই করতে হতো মাচসিংকে। ফলে ছোটবেলাই বাস্তবতার সঙ্গে পরিচিত হলেন। মানসিক পরিপক্বতাও সমবয়সীদের তুলনায় বেশি। তাঁর বয়সী ছেলেমেয়েরা যেখানে ঘুরে বেড়াত, তিনি তখন দোকান সামলাতেন। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত বাবার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ ছিল না মাচসিংয়ের। এদিকে মা তাঁর দ্বিতীয় স্বামীকে বিদেশে পাঠান ব্যবসার টাকায়। কিন্তু তিনিও বিদেশে গিয়ে বিয়ে করেন। এদিকে ঋণগ্রস্ত হয়ে ব্যবসা লাটে ওঠে মাচসিংয়ের মায়ের। হতাশায় এক পর্যায়ে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। তখন মাচসিং তাঁর মাসির কাছে চলে যান। এই কঠিন সময়েও কোনো আত্মীয়-স্বজনের সহযোগিতা মেলেনি। পূজা-পার্বণেও কেউ খোঁজ নিত না।
চায়ের দোকানে
নবম শ্রেণিতে ওঠার পর বছরের প্রথম ছয় মাস স্কুলে যেতে পারেননি। মাসির চায়ের দোকানে কাজ করতেন। চা বানানো থেকে শুরু করে গ্লাস ধোয়া—সবই করতে হতো। মাকে খুব মনে পড়ত। কিন্তু মা মেয়েকে চিনতে পারতেন না।
একদিন বাবা এসে তাঁকে মাসির কাছ থেকে নিয়ে মেসে ভর্তি করে দেন। তবে প্রতি বৃহস্পতিবার বাড়িতে গিয়ে কাজ করতে হতো। না গেলে বাবা রাগ করতেন। বাড়িতে ৯ জন মানুষের রান্না একাই করতেন মাচসিং। বাবা প্রতি মাসে ১৫০ টাকা বাজার খরচ দিতেন। চাল বাড়ি থেকে আনতেন। এমনও দিন গেছে, এক কেজি আলু কিনে দু-তিন সপ্তাহ চালিয়েছেন। এভাবেই এসএসসি পাস করেন। এরপর বাবা তাঁকে বিয়ের জন্য চাপ দিতেন। কিন্তু মাচসিং চেয়েছিলেন পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড়াবেন। চট্টগ্রাম বন্দর মহিলা কলেজে ভর্তির সুযোগ পেলেন। এ সময় তাঁর মা কিছুটা সুস্থ হলেন। যতটুকু পারতেন, পড়াশোনার খরচ দিতেন। পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ দেখে এক শুভাকাঙ্ক্ষী সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। সব জানার পর কলেজের প্রিন্সিপাল বিনা পয়সায় পড়ার সুযোগ করে দেন। টিউশনি করে মাসে দুই হাজার টাকা পেতেন। মা দিতেন আরো দুই হাজার। কলেজে কেয়া নামের এক সহপাঠীর পরিবারও মাচসিংকে নিজের মেয়ের মতো ভালোবাসত।
সুপারশপের স্বপ্ন
এইচএসসি পাস করার পর ঢাকায় এসে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বড় ভাই মনোবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র মংসচা মারমা বিনামূল্যে তাঁকে গাইড করতেন। শেষ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে গভর্নমেন্ট কলেজ অব অ্যাপ্লাইড হিউম্যান সায়েন্সে চাইল্ড ডেভেলপমেন্ট বিষয়ে ভর্তি হলেন মাচসিং। সেখানে আরেক শুভাকাঙ্ক্ষীর সঙ্গে দেখা, যিনি একজন ফ্রিল্যান্সার। মূলত তাঁর অনুপ্রেরণায় উদ্যোক্তা হলেন মাচসিং। খুললেন তংসা বাজার। উদ্দেশ্য ঢাকাবাসী যেন পাহাড়ে না গিয়েও রাসায়নিকমুক্ত সতেজ খাবার পান। আর নিজের জীবনের সংগ্রাম থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে ঢাকায় থাকা অসচ্ছল ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য কিছু করার চিন্তা মাথায় আসে। সেই ভাবনা থেকেই শুরু করলেন ‘স্টুন্ডেন্ট বক্স’। ভবিষ্যতে একটি সুপারশপ খোলার স্বপ্ন দেখছেন মাচসিং। আর চান আরো বড় পরিসরে তাঁর মতো অভাবের সঙ্গে লড়ে বড় হওয়া শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াতে।