মরমি কবি, দার্শনিক ও মানবতাবাদী লালন সাঁইয়ের আধ্যাত্মিক দর্শন লাভের আশায় প্রতিবছরের মতো এবারও ফকির লালনের তিরোধান দিবস উপলক্ষে কুষ্টিয়ার কালীগঙ্গার তীরে লাখো ভক্তের সমাগম ঘটেছে। এখানে এসে ভক্তরা গুরু স্মরণে সাধন-ভজনে যোগ দিয়েছেন। লালনের দর্শন, গান ও মানবতার টানে ছুটে আসা এসব ভক্ত একতারা, দোতারা, ঢোল ও বাঁশির সুরে মুখর করে তুলেছেন ছেঁউড়িয়ার লালন মাজার ও আশপাশের এলাকা।
সাধক ফকির লালনের ১৩৫তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে এবার সাংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে শিল্পকলা একাডেমি ও কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসন জাতীয়ভাবে তিন দিনের উৎসবের আয়োজন করেছে।
এবারও উৎসবে আসা দেশ-বিদেশের লাখো লালনভক্ত, অনুসারী, সাধু, বাউল ও দর্শনার্থীরা মূল মাজার চত্বরে খণ্ড খণ্ডভাবে আসন পেতে বসে লালনের সুর সাধনা করে চলেছেন। ভক্তদের কণ্ঠে লালনের আধ্যাত্মিক গানে কণ্ঠ মেলাচ্ছেন দর্শক-শ্রোতারাও। ‘করি মনা কাম ছাড়ে না মদনে…প্রেম রশিকা হব কেমনে…’; ‘মানুষ ছাড়া ক্ষ্যাপারে তুই মূল হারাবি…মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি…’; ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়…’; ‘পার কর হে দয়াল চাঁদ আমারে…’ ইত্যাদি গানের সুরে লালন মাজার মুখরিত।
সরকারি অনুষ্ঠানের বাইরে ১৩৫তম তিরোধান দিবসে লালনের আখড়ায় আগত
হাজার হাজার বাউল-সাধু লালনের আরাধনায় মেতে আছেন। গতকাল প্রথম দিন সন্ধ্যায় রাখাল সেবার মধ্য দিয়ে শুরু হয় বাউল সাধুদের মূল অনুষ্ঠান। এরপর আজ শনিবার সাধু বাউলদের জন্য রয়েছে পুণ্য সেবার আয়োজন। আগামীকাল রবিবার বিকেলে অষ্ট প্রহরে সাধুসংঘ বা পুণ্য সেবার মধ্য দিয়ে শেষ হবে তাঁদের আরাধনা। অনুষ্ঠানে সদ্যঃপ্রয়াত লালনশিল্পী ফরিদা পারভীনের ওপর একটি প্রামাণ্য চিত্র প্রদর্শিত হয়।
প্রতিবারের মতো এবারও আত্মশুদ্ধি ও পাপাচার থেকে মুক্তির আশায় সাঁইজির সমাধিতে ছুটে এসেছেন দৌলতপুরের লালনভক্ত ফকির আজিরুদ্দিন শাহ। তিনি বলেন, ‘জাত, কুল, ধর্ম, গোত্র ভুলে আমরা একে অপরের সঙ্গে ভাবের আদান-প্রদানে যুক্ত হয়েছি, তিন দিন এভাবে অতিবাহিত করে আমরা আবার যার যার গন্তব্যে ফিরে যাব।’
কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে উৎসব ঘিরে লালনের মূল মাজারের বাইরে বসেছে বিশাল বাউল মেলা। সেখানে বিভিন্ন পসরা সাজিয়ে বসেছেন শতাধিক ব্যবসায়ী। তাঁরা ঐতিহ্যবাহী বাউল বাদ্যসহ হরেক রকম পণ্য ও খাদ্যসামগ্রী বিক্রি করছেন। সেই সঙ্গে গান গেয়ে দেশের খ্যাতিমান ও স্থানীয় জনপ্রিয় শিল্পীরা বাউল গানে মাতিয়ে রাখছেন হাজারো দর্শক-শ্রোতাকে।
লালন একাডেমির সভাপতি ও কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক আবু হাসনাত মোহাম্মদ আরেফীন জানান, লালন অনুসারীরা মূল মাজারের ভেতরে অবস্থান নিয়ে সেখানে চিরনিদ্রায় শায়িত তাঁদের গুরুর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করছেন। এবার জাতীয়ভাবে উদযাপিত তিরোধান উৎসব ঘিরে বাউলদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে। উৎসব ঘিরে কালীগঙ্গার তীরে যে মিলনমেলা শুরু হয়েছে তা গুরু-শিষ্যের মহা মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।