ছেলেমেয়েরা তাঁকে তারই এক ফ্ল্যাটে তুলে, জমি-বাড়ি বিক্রি করে হাওয়া হয়ে গেছে।খোরপোশের ভালো ব্যবস্থা অবশ্য করেছে। দেখাশোনারও। ছেলেসমেত এক বুয়া আছেন তার সঙ্গে। কিন্তু চাচার শরীর দুর্বল।
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম
ছেলেমেয়েরা তাঁকে তারই এক ফ্ল্যাটে তুলে, জমি-বাড়ি বিক্রি করে হাওয়া হয়ে গেছে।খোরপোশের ভালো ব্যবস্থা অবশ্য করেছে। দেখাশোনারও। ছেলেসমেত এক বুয়া আছেন তার সঙ্গে। কিন্তু চাচার শরীর দুর্বল।
অদিতিকেই সেই দায়িত্বটা দিলাম। এতে কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা হবে। সে বুঝতে পারল না, কেন এই ইনভেন্টরি। নিঃস্বটাইপ পরিবারের পড়াশোনা জানা মেয়ে। কিন্তু অভাব বলে কথা।
সারা দিন খেটে ইনভেন্টরিয়াটা চাচার হাতে তুলে দিল অদিতি। সাড়ে পাঁচ পাতা। হাতের লেখাটা নিখুঁত। কাজটা আমাকে অবাক করল। প্রথমেই চোখ গেল চাচার বাথরুমের বস্তু তালিকায়। বাথরুমটা বড়, বেসিনের দুই পাশে প্রচুর জায়গা, দেয়ালে আয়না লাগানো শেলফ। বস্তুতে ঠাসা। অদিতির ইনভেন্টরিটা এ রকম :
টুথব্রাশ : ওরাল বি ১২ (৩ নতুন), ক্লিনিক শেভিং ক্রিম, জেল ২, একুয়াফ্রেশ, চার্লি টুথপেস্ট ৩, ফিলিপস ইলেকট্রিক শেভার ১, জিলেট রেজর ২, ওরাল বি ডেন্টাল ফ্লস ২, অর্গানিক নিম, হেড অ্যান্ড শোল্ডার শ্যাম্পু ৩, এভিনো ময়েশ্চারাইজার, স্কিন রিলিফ লোশন ২, হ্যারি ব্রুক ময়েশ্চার স্প্রে ১, হ্যান্ড সোপ ২, ডাভ, স্যান্ডালিন সাবান ৩, মিচাম এন্টি পার্সপিরেন্ট ১, টেড বেকার বডিওয়াশ ১, বডি স্প্রে ফগ ২, ডগ ডে ২, অডি কোলন ৪৭১১ ২, ডাবুর হানি ১, পারফিউম —বস, আজারো, গিভেন্সি, ভিটালি, পাকো রাবান, গুচি গিল্টি মোট ৫। অর্গানিক কটন টাওয়েল ৫…
অধৈর্য হাতে পাতা ওল্টালাম। এবার চাচার শোবারঘর। বিছানা লাগোয়া নাইট টেবিলের সুরতহাল : আইকিয়া টেবিল ল্যাম্প ১, ওষুধের বাক্স, শিশি, স্ট্রিপ মোট ৭, পানির গ্লাস ২ …
তারপর বিছানায় থাকা বহনযোগ্যের তালিকায় আছে মাস্ক ২, ইংরেজি-বাংলা বই ৩, সিটিজেন ঘড়ি ১, খোন্দকার আরশাদ সাহেব ১, চশমা ১, কলিং বেল ১।
ইনভেন্টরিটা আমাকে চমকে দিল। পাকা কাজ, আমার মতলব হাসিলে মেয়েটাকে হাতে আনতে হবে।
মধুর হেসে বললাম, কাজটা কার থেকে শিখেছ?
অদিতি বলল, নিজের থেকে।
আচ্ছা?
জি। বাবার কাপড়চোপড়, ঘড়ি-চশমার ইনভেন্টরি করেছি তো। মা নেই, কাজটা আমাকেই করতে হয়। শুনুন সেই ইনভেন্টরি :
শার্ট ৩, ট্রাউজার ২, পাজামা ২, পাঞ্জাবি ২— কেচে ধুয়ে বালিশের নিচে চেপে ইস্তিরি করা ভালোটা পরে জুমায় যান, ঈদের জামাতেও— লুঙ্গি ২, গামছা ১, গেঞ্জি ২, চশমা ১, অচল ঘড়ি ১, চটি জুতা ১ জোড়া। এই তো।
বাবা কী করেন?
একটা দৈনিকে প্রুফ দেখতেন।
দেখতেন মানে?
কাগজটা আর নেই।
ও, আমি বললাম, তো তোমার ইনভেন্টরিতে বাবাকে রাখোনি কেন, যেমন রেখেছ চাচাকে, তার ইনভেন্টরিতে, তাও তার ঘড়ি-চশমার মধ্যিখানে?
অদিতি হাসল। ইনভেন্টরির বস্তুগুলো আপনার চাচাকে যেভাবে চেপে ধরেছে, তিনি কি আর সেসব থেকে আলাদা কিছু?
আমার রাগ হলো। কিন্তু রাগে ক্ষতি। বললাম, কাল থেকে কাজ শুরু করো। আর এই নাও ইনভেন্টরির কাজের টাকাটা।
অদিতির হাতে ২০০ টাকার পাঁচটি নোট দিলাম। সে নিল, কিন্তু তিনটি ফিরিয়ে দিল। বলল, আমি ঘণ্টায় যে মজুরি পাই, তাতে এটুকুই আসে। আচ্ছা চলি।
রাগ চেপে তাকে বললাম, তাহলে কাল ১০টায় চলে এসো।
দুঃখিত, কাজটা করব না।
কেন?
বাবা করতে মানা করবেন।
অদিতি চলে গেল।