পুরনো দিনের পোশাক প্রায়ই ফিরে ফিরে আসে, নতুন ঢঙে। এখনকার আধুনিক নারীর পোশাকে ঘুরেফিরে আসছে মনরো-হেপবার্নদের দেখানো ফ্যাশন। লিখেছেন অলকানন্দা রায়
কালো টুপির ছায়ায় ঢাকা মুখ, লেসের গ্লাভসে ঢাকা আঙুলে হালকা আভা, ঠোঁটে লালচে গাঢ় রং, চুলে কোমল ঢেউ—দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন পুরনো সিনেমার নায়িকা দাঁড়িয়ে আছেন কোনো আধুনিক শহরের ব্যস্ত রাস্তায়। অথচ এই দৃশ্য প্রায়ই দেখা যায় এখন। ‘রেট্রো ফ্যাশন’ বারবার ফিরে আসে ফ্যাশন দুনিয়ায়—এক নতুন প্রাণে, নতুন আত্মবিশ্বাসে।
এই ফিরে আসাটা শুধু সাজ-পোশাকে নয়, এক ধরনের মানসিক অবস্থায়ও।
আজকের মেয়েরা নিজেদের প্রকাশ করছে এমনভাবে, যেখানে অতীতের সৌন্দর্য আর বর্তমানের আত্মবিশ্বাস মিলে তৈরি হচ্ছে এক অসাধারণ সামঞ্জস্য। তারা জানে গ্ল্যামার কেবল সাজপোশাকে নয়, এক ভিন্ন উপস্থিতি, ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি।
অফশোল্ডার গাউনের সঙ্গে পরিমিত সাজ, স্টাইল ও ফ্যাশনে আনে ভিন্নমাত্রা। মডেল : নীহা পোশাক : ভেলোর সাজ : সাজ্জাদ ছবি : মঞ্জুরুল আলম
অতীতের রূপ বর্তমানে
‘রেট্রো’ শব্দটি এসেছে রেট্রোসপেক্টিভ থেকে।
মানে, অতীত ফিরে দেখা। ফ্যাশনের ভাষায় এটি হলো পুরনো যুগের সাজসজ্জা ও পোশাকের স্টাইল ফিরিয়ে আনা। বিশেষ করে গত শতাব্দীর পঞ্চাশ থেকে সত্তরের দশকের যে ফ্যাশন-গ্ল্যামার একসময় সারা দুনিয়া মাতিয়ে রেখেছিল, এখন সেটিই নতুন করে জায়গা করে নিচ্ছে র্যাম্পে, বিনোদনের পর্দায়, অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠান আর সোশ্যাল মিডিয়ার ট্রেন্ডে। সে সময়ের নারীদের সৌন্দর্যে ছিল একটা রাজকীয় ভাব, সঙ্গে পরিমিতিবোধ।
উজ্জ্বল কিন্তু অতিরিক্ত নয়, সাহসী কিন্তু সংযত। সেই ধারা এখন নতুন করে মুগ্ধ করছে তরুণ প্রজন্মকে। আজকের ইনফ্লুয়েন্সার, ফ্যাশন ফটোগ্রাফার কিংবা ডিজাইনাররাও পুরনো হলিউড যুগ থেকে নিচ্ছেন প্রেরণা।
সময়ের আবেদেনে পুরনো ফ্যাশন বারবারই ফিরে এসেছে, আসে, আসবে
মনরো থেকে হেপবার্ন : রেট্রো আইকন
রেট্রো গ্ল্যামারের নাম এলে প্রথমেই যাঁর মুখ ভেসে ওঠে, তিনি মেরিলিন মনরো। তাঁর রক্তিম ঠোঁট, মোটা উইং আইলাইনার, চকচকে ত্বক, আর উজ্জ্বল হাসি যেন নারীত্বের এক সাহসী ঘোষণা।
তিনি শিখিয়েছিলেন, নিজেকে ভালোবাসা মানেই নিজেকে সুন্দরভাবে প্রকাশ করা। অন্যদিকে অড্রে হেপবার্ন ছিলেন আরেকটু ভিন্ন। আচরণে সরল, সাজ-পোশাকে পরিমিত। তাঁর কালো পোশাক, মুক্তার মালা আর নরম হেয়ারবান—এসবেই অমোঘ আকর্ষণ তৈরি করেছিলেন তিনি। ‘ব্রেকফাস্ট অ্যাট টিফানিস’ ছবির তাঁর সেই লুক এখনো অনুকরণের শীর্ষে। আরেক অভিনেত্রী গ্রেস কেলি রাজকীয় সৌন্দর্যের প্রতীক, এলিজাবেথ টেলর বা রিটা হেওয়ার্থরা ছিলেন সাহসী চোখ আর নাটকীয় সাজের প্রতিনিধি। এই তারকারা মিলে তৈরি করেছিলেন এমন এক সৌন্দর্যের যুগ, যেখানে নারীর ফ্যাশন ছিল তাঁদের শক্তি ও আত্মবিশ্বাসের প্রতীক।
কালো টুপি, লেসের গ্লাভসে এই সময়ের নারীর সাজও সমান স্বতঃস্ফূর্ত
নতুন প্রজন্মের রেট্রো ভালোবাসা
আজকের মেয়েরা সেই ঐতিহ্যকেই নিজের মতো করে ফিরিয়ে আনছে। কেউ অড্রে হেপবার্নের মতো সাদা শার্টে পার্ল ইয়ার রিং পরছে, কেউ মেরিলিন মনরোর মতো করে লাল লিপস্টিক পরে ক্যামেরার সামনে দাঁড়াচ্ছে। আবার কেউ রেট্রো চুলের স্টাইলে মিলিয়ে নিচ্ছে আধুনিক জাম্পস্যুট বা ডেনিম। এই মিশ্রণটিই নতুন রূপে ফের ফিরে এসেছে এখনকার স্টাইলে। পুরনো
রূপকে হুবহু অনুকরণ নয়, বরং নতুন করে ব্যাখ্যা করছে তরুণীরা। তাই রেট্রো কেবলই নস্টালজিয়া নয়, এক ধরনের নয়া স্টেটমেন্ট।
অ্যাকসেসরিজ : হ্যাট, গ্লাভস, পার্ল নেকলেস, সানগ্লাস, যা লুককে করে তোলে আরো পরিশীলিত। এই সাজে জ্বলে উঠতে অতিরিক্ত আর কিছুই লাগে না। এই সাজের সৌন্দর্য তার সূক্ষ্মতায়, আপনার অঙ্গভঙ্গি আর আত্মবিশ্বাসে।
রং বদলায়, গ্ল্যামার নয়
ফ্যাশনের ইতিহাস বলে প্রায় সবকিছুই ফিরে ফিরে আসে। যেমন—একসময় মিনিমালিজম ছিল ট্রেন্ড, এখন আবার ভিনটেজ সাজে দেখা যাচ্ছে সেই লাল ঠোঁট, সেই কালো টুপির নান্দনিকতা। পার্থক্য হলো এখনকার মেয়েরা তা মেশাচ্ছে নিজেদের ব্যক্তিত্বের সঙ্গে। আজকের নারীরা আর সাজের আতিশয্যে হারিয়ে যান না, বরং নিজের আলাদা চরিত্র ফুটিয়ে তোলেন সাজে।
ফ্যাশনের ভাষায় আত্মবিশ্বাস
একসময় হয়তো এই সাজ ছিল সেলিব্রিটিদের গ্ল্যামারজগতে সীমাবদ্ধ। কিন্তু এখন তা ছুঁয়ে যাচ্ছে সব শ্রেণিকে—ফটো শুট, পার্টি, এমনকি সাধারণ দিনেও। একটু হালকা রেট্রো টাচ আপনাকে অন্যভাবে অনুভব করার সুযোগ করে দেবে। অতীতের সেই নরম, রাজকীয় সৌন্দর্য আর বর্তমানের আত্মবিশ্বাস মিলে তৈরি হয় স্টাইলের নতুন ভাষা।
রেট্রো মুডে দেশ-বিদেশের তারকারা
সোহান খানের ডিজাইনে অভিনেত্রী সামিরা খান মাহি। ছবি—সাজ্জাদ হোসেন পিয়াস