সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১২:৩৫ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

কৃষিতে কাঠামোগত পরিবর্তন ও অর্থায়ন

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: শুক্রবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৪০ বার পড়া হয়েছে
‘স্মল ইজ বিউটিফুল’ বা ছোট্টই সুন্দর। ছোট বাচ্চাদের মতো সুন্দর, ঝামেলাহীন। জার্মান বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ ই এফ সুমাখারের শিক্ষক লিওপোন্ড কোর (১৯০৯-১৯৯৪) ‘বড় হলে ভালো’ এই নীতির বিকল্প হিসেবে ছোট, উপযুক্ত প্রযুক্তি এবং রাজনীতিকে এগিয়ে নিয়েছিলেন। ১৯৭৩ সালে ওই শিরোনামে একটি বই প্রকাশ করেন সুমাখার।

তিনি ইন্টারমিডিয়েট টেকনোলজি বা মধ্যবর্তী প্রযুক্তি ব্যবহারের পক্ষে জোরালোভাবে মতামত উপস্থাপন করেছেন। ১৯৬৫ সালে সুমাখার এবং আরো কয়েকজন পরিবেশবিদ লন্ডনে ইন্টারমিডিয়েট টেকনোলজি ডেভেলপমেন্ট গ্রুপ নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন।কৃষি খাতে সুমাখারের ‘ছোট ভালো’ তত্ত্ব অনেকটা খাপ খেয়ে যায়। ষাটের দশকের গোড়ার দিকে একটি অভিমত জোরালো হয়ে ওঠে যে ছোট কৃষি খামারগুলো অধিক উৎপাদনশীল।

কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও ধারণের পর ‘শ্রমিকভিত্তিক যুক্তি’ অনেকটা ফিকে হয়ে আসে। কৃষি অর্থনীতির গবেষকরা খুঁজে পান এক ধরনের ‘পজিটিভ রিলেশনশিপ’ বা ইতিবাচক সম্পর্ক। 

কৃষিতে কাঠামোগত পরিবর্তন ও অর্থায়ন ১৯৬১-৬২ সালে ভারতে পরিচালিত খামারভিত্তিক সমীক্ষা থেকে প্রতীয়মান হয় যে অপেক্ষাকৃত বড় খামারগুলোতে আধুনিক কৃষি উপকরণ ও প্রযুক্তির ব্যবহার বেশি হয় এবং তাতে প্রতি ইউনিট জমিতে বেশি ফসল পাওয়া যায়। বড় খামারের মালিকদের আর্থিক সক্ষমতা বেশি। তাঁরা উৎপাদনের আধুনিক উপকরণ বেশি প্রয়োগ করেন এবং বেশি ফসল পান। ঝন ডব্লিউ মেলর (১৯৬৯) এবং কে গ্রিফিন (১৯৭৪) এই মতবাদের বড় প্রবক্তা। বাংলাদেশে ছোট এবং অপেক্ষাকৃত বড় খামারের উৎপাদন দক্ষতার বিষয়ে অনেক সমীক্ষার ফলাফল আছে। তবে মাঝারি খামারের উৎপাদন দক্ষতা বিষয়ে নজির বেশি। এই খামারগুলো চাষাবাদে প্রয়োজনীয় মাত্রায় আধুনিক উপকরণ প্রয়োগ করতে পারে। কৃষি শ্রমিকের ব্যবহারও পর্যাপ্ত। খামার ব্যবস্থাপনায় তারা দক্ষ। তাই তারা অধিক ফসল ফলায়। ১৯৭৪ সালে ময়মনসিংহের খাকভবে এবং ১৯৮২ সালে অন্যান্য এলাকায় পরিচালিত আমার সমীক্ষা থেকে এমন ফলাফল পাওয়া যায়।

উন্নত দেশগুলোতে খামারের আকার বড়। ছোট খামারগুলো জমি বিক্রি করে যোগ দিয়েছে কৃষিবহির্ভূত কর্মকাণ্ডে, শিল্পে ও সেবামূলক খাতে। বড় খামারগুলো যন্ত্রনির্ভর। আধুনিক চাষাবাদ সেখানে উৎপাদন দক্ষতা নিশ্চিত করছে। বাংলাদেশে বর্তমানে খামারের আকার উল্টো পথে এগিয়ে যাচ্ছে। বড় ও মাঝারি খামারগুলো ভেঙে ছোট হচ্ছে। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক খামারের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। মূলত উত্তরাধিকার আইনে জমি বিভাজন হচ্ছে। তা ছাড়া কৃষি উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি এবং নিট আয় কমে যাওয়ার কারণেও বড় কৃষকরা তাঁদের কিয়দংশ জমি বিক্রি করে পরিণত হচ্ছেন ছোট কৃষকে। বর্তমানে প্রায় ৯২ শতাংশ কৃষকই ছোট। বড় ও মাঝারি কৃষকের সংখ্যা মাত্র ৮ শতাংশ। ছোট কৃষকদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে প্রায় ৬৯ শতাংশ জমি। ২০০৮ সালের তুলনায় ২০১৯ সালে বড় খামারগুলোর নিয়ন্ত্রণে থাকা জমি কমেছে ৪৬.১৮ শতাংশ। মাঝারি খামারগুলো খুইয়েছে ৩৬.০৬ শতাংশ জমি। পক্ষান্তরে ছোট খামারগুলো ৩২.২৪ শতাংশ জমি বেশি দখলে নিয়েছে। তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে ৮৪.৩৯ থেকে ৯১.৭০ শতাংশে। মাঝারি খামারগুলোর সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে ১৪.০৭ থেকে ৭.৭০ শতাংশে। উৎপাদনের দক্ষতা এবং আধুনিক উপকরণ ব্যবহারের বিচারে খামারের আকৃতির এই স্খলন সম্ভাবনাময় কিছু নয়। এতে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ ব্যাহত হতে পারে। খামারগুলোর আকার ছোট থেকে ছোট হওয়ায় কৃষিজমির চরম অভাবই প্রকাশ পায়। এ দেশে ভূমি দারিদ্র্য প্রকট। সময়ের ব্যবধানে তা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ১৯৭৪ সালে গড় খামারের আকার ছিল ২.৮ একর। ২০০৮ সালে তা ১.৪৭ একরে এবং ২০১৯ সালে ১.২৯ একরে হ্রাস পায়। বর্তমানে জনপ্রতি জমির পরিমাণ গড়ে মাত্র ০.১১ একর।

কৃষিজমির মালিকানার ধরনে যেমন পরিবর্তনে এসেছে, তেমনি কৃষি খাতের গঠনেও ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। কৃষি খাতের উপখাতগুলো হচ্ছে শস্য, মৎস্য, পশুসম্পদ ও বনসম্পদ। স্বাধীনতার পর ১৯৭২-৭৩ সালে কৃষি খাতের মোট উৎপাদনে ফসলের শরিকানা ছিল ৭৭.০৬ শতাংশ। মৎস্য, পশুসম্পদ ও বনসম্পদের শরিকানা ছিল যথাক্রমে ৯.৯৩, ৭.৫৪ ও ৫.৪৭ শতাংশ। এখন তা পরিবর্তন হয়ে ফসল খাত নেমে এসেছে ৪৬.৯২ শতাংশে। শস্যবহির্ভূত কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধির হার বেশি। বাণিজ্যিকীকরণের গতি ভালো। চাষকৃত মৎস্য খামারগুলোতে আধুনিকায়ন, বাণিজ্যিক দুগ্ধ এবং পোলট্রি খামারের উন্নয়ন এবং কৃষি বনায়ন সম্প্রসারণের ফলে শস্যবহির্ভূত কৃষি খাতের শরিকানা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

কৃষি খাতে পুঁজি সঞ্চারের একটি প্রধান উপায় হচ্ছে কৃষিঋণ। এবার কৃষিঋণের মোট পরিমাণ ধরা হয়েছে ৩৯ হাজার কোটি টাকা। গত বছর ছিল ৩৮ হাজার কোটি টাকা। বিতরণ করা হয়েছিল ৩৭ হাজার ৩২৬ কোটি টাকা। এটি ছিল লক্ষ্যমাত্রার ৯৮.২৩ শতাংশ। গত বছরের তুলনায় এবার কৃষিঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ২.৬৩ শতাংশ। দেশে মূল্যস্ফীতির হার যেখানে ন্যূনপক্ষে ছিল ৯ শতাংশ, সেখানে কৃষিঋণের প্রবৃদ্ধির হার ২.৬৩ শতাংশ খুবই অপ্রতুল। এবার কৃষিঋণ নীতিতে মোট ঋণের ৫৫ শতাংশ শস্য উৎপাদন খাতে, ২ শতাংশ সেচ ও কৃষি যন্ত্রপাতি খাতে, ২০ শতাংশ প্রাণিসম্পদ খাতে, ১৩ শতাংশ মৎস্য খাতে এবং ১০ শতাংশ পল্লী অঞ্চলের উৎপাদন ও সেবা খাতসহ অন্যান্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বৈষম্য আছে। এই হার মোট কৃষি জিডিপিতে সংশ্লিষ্ট উপখাতের হিস্যা অনুসারে নির্ধারণ করা উচিত। ডাল, তৈলবীজ, মসলাজাতীয় ফসল ও ভুট্টা উৎপাদনের জন্য ৪ শতাংশ রেয়াতি সুদ হারে কৃষিঋণ প্রদানের ব্যবস্থা আছে। কিন্তু এ বিষয়ে ব্যাংকগুলোর আগ্রহ খুবই কম। গত বছর মোট বিতরণকৃত ঋণের ১ শতাংশেরও কম অর্থাৎ ০.৭৫ শতাংশ ঋণ রেয়াতি সুদ হারে প্রদান করা হয়েছে। বর্তমানে ব্যাংকগুলো যে কৃষিঋণ দেয়, তার বেশির ভাগ যায় বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) মাধ্যমে। এতে সুদহার বেশি। অনেক ঋণ চলে যায় কৃষিবহির্ভূত গ্রামীণ সেবা খাতে। ফলে বেশির ভাগ কৃষি খামার তাদের উৎপাদনব্যবস্থায় যথাযথভাবে পুঁজি বিনিয়োগ করতে পারে না। এতে তারা কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন পায় না।

কৃষি খাতে উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য মধ্যবর্তী বা লাগসই প্রযুক্তির ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অসংখ্য ছোট খামারের উপযোগী করে প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও ধারণ করা এখন সময়ের দাবি। সত্তর ও আশির দশকে লাগসই কৃষি প্রযুক্তি সম্পর্কে বেশ আলোচনা হতো। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলে গঠন করা হয়েছিল একটি ‘অ্যাপ্রোপ্রিয়েট টেকনোলজি সেল’। সময়ের বিবর্তনে ওই সেলটি এখন আর নেই। তবে এ বিষয়ে গবেষণা ও উন্নয়নের কাজ থামিয়ে রাখলে চলবে না। দেশের প্রায় প্রতিটি কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কৃষি প্রকৌশল বিভাগ আছে। যথাযথ প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণের কাজে তারা ভালো ভূমিকা নিতে পারে।

অসংখ্য ছোট ও প্রান্তিক কৃষক নির্ভর একটি দেশের কৃষি খাতে পুঁজির সঞ্চার ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য বেশি দায়বোধ সরকারের। প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ, অনুদান, প্রশিক্ষণ ও ভর্তুকি দিয়ে সরকার ছোট কৃষকদের উৎপাদনে দক্ষ করে তুলতে পারে। তা ছাড়া পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে গড়ে তোলা যায় লাগসই যন্ত্রপাতি উৎপাদনের কারখানা। সার, বালাইনাশক ও অন্যান্য উপকরণ উৎপাদনের জন্যও অভ্যন্তরীণ সুযোগ-সুবিধা কাজে লাগানো যেতে পারে। এতে পরনির্ভরতা হ্রাস পাবে। কৃষির উৎপাদনে স্বয়ম্ভর হবে দেশ।

লেখক : কৃষি অর্থনীতিবিদ

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com